চাঞ্চল্যকর তিন শিশুহত্যা অধরাই রইলো খুনিরা

মোহাম্মদ রফিক

নগরে এক বছরের ব্যবধানে পৃথকভাবে সংঘটিত চাঞ্চল্যকর ৩ শিশুহত্যার কিনারা করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তারা। নিষ্পাপ এ শিশুগুলোর খুনি কে, কি ছিল খুনিদের উদ্দেশ্য? এক বছরেও তা উদঘাটন করতে পারেনি তদন্ত কর্মকর্তারা। এদিকে মামলার তদন্ত নিয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেনভুক্তভোগী পরিবারগুলো। তাদের দাবি, হারানো সন্তান তো আর ফিরে পাব না। কিন’ খুনিদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হোক।
গত ২৩ জানুয়ারির ঘটনা। নগরের কাট্টলী বেড়িবাঁধ এলাকা। গাড়ি থেকে নির্জন এলাকায় ফেলে দেয়া হয় ১১ বছরের অজ্ঞাত এক শিশুকে। ওড়না দিয়ে হাত-পা এবং মুখবাঁধা অবস’ায় পুলিশ ওই শিশুটিকে উদ্ধার করে। তার শরীরের বিভিন্ন স’ানে জখমের চিহ্ন পায় পুলিশ। তাকে ভর্তি করা হয় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। পাঁচদিন পর চিকিৎসাধীন অবস’ায় মারা যায়
শিশুটি। এ ঘটনায় এসআই নুরুল আলম আকবর শাহ থানায় হত্যা ও ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেন। তার ধারণা, শিশুটিকে ধর্ষণ করা হয়েছিল। এ ঘটনার প্রায় দুমাস পার হয়ে গেলেও শিশুটির মা-বাবা কে, তার বাড়ি কোথায়, কারা তার খুনি, আজও বের করতে পারেনি পুলিশ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আকবরশাহ থানার এসআই বদিউল আলম বলেন, শিশুটির পরিচয় এখনও পাওয়া যায়নি। খুনি শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
২০১৮ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি। ঘটনাস’ল বাকলিয়া থানার ইসহাকের পুল। বাসা থেকে খেলতে বেরিয়েছিল শিশু নুদরাত। অনেকক্ষণ পর্যন্ত বাসায় ফিরে না আসায় তাকে খোঁজাখুঁজি করে পরিবার। না পেয়ে বাকলিয়া থানায় জিডি করেন তার বড়বোন রোজি আক্তার। নিখোঁজের পাঁচদিন পর ৮ ফেব্রুয়ারি রাতে সার্সন রোড এলাকার পাহাড়ি জঙ্গল থেকে শিশুটির গলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় বাকলিয়া থানায় মামলা হয়। এক্ষেত্রেও বছর পার হলেও শিশু নুদরাতের হত্যারহস্য উদঘাটন করতে পারেনি মামলার তদন্তকারী সংস’া সিআইডি।
তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক দেবাশীষ চৌধুরী জানালেন, নুদরাতের খুনিদের এখনও চিহ্নিত করা যায়নি। তবে মামলার তদন্ত চলছে। মামলার বাদি নুদরাতের বড়বোন বলেন, ‘এক বছরেও আমার বোনের খুনি গ্রেফতার হয়নি। হত্যার রহস্যও বের করতে পারেনি সিআইডি। এটা খুবই দুঃখজনক।’
২০১৮ সালের ২৭ জুন। নগরের বাকলিয়া থানার ল্যান্ডমার্ক আবাসিক এলাকা। ঘটনাস’ল এমএস লায়লা ভবনের ছয়তলা। স্কুলছাত্রী শিশু ইলহামকে গলাকেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ইলহামের বাবা নাসির উদ্দিন সৌদিপ্রবাসী। দু’মেয়ের মধ্যে ইলহাম ছিল বড়। ছোটবোনের নাম জারিন।
মায়ের নাম নাসরিন আক্তার খুশবু। ঘটনার দিন সকাল ৮টায় জারিনকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে বাসায় ফিরে খুশবু দেখেন, বিছানায় ইলহামের গলাকাটা লাশ পড়ে আছে। তার চিৎকার শুনে পাশের ফ্ল্যাটে থাকা শিক্ষানবিশ আইনজীবী রিজুয়ান কবির রাজু ইলহামকে উদ্ধার করে চমেক হাসপাতালে নিয়ে যান। খবর পেয়ে সৌদিআরব থেকে দেশে ফিরে আসেন ইলহামের বাবা নাসির উদ্দিন। এ ঘটনায় তিনি বাকলিয়া থানায় মামলা করেন। শিক্ষানবিশ আইনজীবী রাজুকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ঘটনার এক মাস পর (২৬ জুলাই) মামলা তদন্তের দায়িত্ব নেয় সিআইডি। মামলাটি তদন্ত করছেন সিআইডি চট্টগ্রামের পরিদর্শক স্বপন কান্তি বড়-য়া। রাজুকে রিমান্ডে নিয়ে কয়েকদফা জিজ্ঞাসাবাদ করে সিআইডি। কিন’ ইলহাম হত্যার বিষয়ে মুখ খুলছেন না রাজু। তিনি এখন জামিনে আছেন।
সিআইডি চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিশেষ পুলিশ সুপার ড. নাজমুল করিম জানান, স্কুলছাত্রী ইলহাম হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস’ল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছিল সিআইডির ফরেনসিক টিম। এসময় রক্তের একটি স্যাম্পল পাওয়া যায় এ ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া শিক্ষানবীশ আইনজীবী রিজুয়ান কবীর রাজুর বাসার দরজায়। কিন’ ফরেনসিক পরীক্ষায় ‘রক্তের’ ওই স্যাম্পলটি রক্ত হিসেবে নির্ণয় হয়নি। হয়তো রক্তের ওই দাগটি ফরেনসিক টিম সঠিকভাবে সংগ্রহ করতে পারেনি। এটি শুকিয়ে যাওয়ায় পরীক্ষায় রক্ত হিসেবে ধরা পড়েনি। আর ধরা পড়লে ডিএনএ টেস্ট করে সন্দেহভাজন ‘খুনির‘ ডিএনএ’র সাথে মিলিয়ে দেখা যেত। ফলে মামলার তদন্ত এ জায়গায় ওই রক্তের দাগে আটকে আছে বলে জানান তিনি।
এক প্রশ্নের উত্তরে সিআইডির এ কর্মকর্তা বলেন, ‘ইলহাম হত্যায় জড়িত বলে আমরা যাকে সাসপেক্ট করছি তার বিরুদ্ধে একাধিক তথ্য-প্রমাণ আমাদের হাতে আছে। আমরা আরো একটু সময় নিয়ে তার বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দেব।’ সিআইডি জানায়, শিক্ষানবিশ আইনজীবী রিজুয়ান কবীরকে ইলহাম হত্যাকাণ্ডের প্রধান সন্দেহভাজন মনে করা হলেও খুনের দায় স্বীকার তিনি স্বীকার করেননি। পেশায় আইনজীবী হওয়ায় আইনের ফাঁকফোকর তিনি জানেন। এ কারণে নানা কৌশলে হত্যার দায় এড়ানোর চেষ্টা করছেন। এদিকে মামলার তদন্তে অসন্তোষ প্রকাশ করে ইলহামের বাবা নাসির উদ্দিন বলেন, ‘আমার মেয়ের নির্মম হত্যার ৮ মাস পেরিয়ে গেলেও খুনি কে, তা আজও জানাতে পারেনি সিআইডি। আমি মেয়ের খুনির ফাঁসি চাই।’