চাকসু নির্বাচন নিয়ে সরব আলোচনা

রায়হান উদ্দিন, চবি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের পর এবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) নির্বাচন নিয়েও আশার সঞ্চার হয়েছে। দীর্ঘ ২৯ বছর অচল থাকা নেতৃত্ব তৈরির এ প্লাটফর্মটিকে তাই সচল করতে সোচ্চার হয়ে উঠেছে প্রতিটি ছাত্র সংগঠন। নেতারা নিজ নিজ সংগঠন গোছানোর কাজও করছেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও চাকসু নির্বাচন নিয়ে ‘পজিটিভ’ অবস’ানে রয়েছে।
ইতোমধ্যে চাকসু নির্বাচনের নীতিগত সিদ্ধান্তের পর পাঁচ সদস্যের নীতিমালা রিভিউ কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। গঠিত কমিটিকে ডাকসুর নীতিমালা বিশ্লেষণ করে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে একটি যুগোপযোগী নীতিমালা প্রণয়নের সুপারিশ করতে বলা হয়েছে। প্রশাসনের দাবি, বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে শিগগিরই আলোচনা করা হবে। শিক্ষার্থীরা চাইলে চাকসু নির্বাচনে কোনো আপত্তি নেই।
চাকসুর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতিবছর নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ৫৩ বছরে চাকসু নির্বাচন হয়েছে মাত্র ছয়বার। সর্বশেষ নির্বাচন হয় ১৯৯০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। ১৯৬৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর প্রথম চাকসু নির্বাচন হয় ১৯৭০ সালে। ওই নির্বাচনে সহসভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন যথাক্রমে মো. ইব্রাহিম ও মো. আবদুর রব। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু সরকারের আমলে ১৯৭১-৭২ এবং ১৯৭২-৭৩ সালে চাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর জিয়াউর রহমানের আমলে দু’বার এবং এরশাদের আমলে একবার নির্বাচন হয়। এরশাদের পতনের পর থেকে আর নির্বাচন হয়নি।
দীর্ঘদিন কমিটি না থাকায় ২৯ বছর ধরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) বন্ধ থাকলেও ছাত্রদের কাছে চাঁদা নেওয়া বন্ধ থাকে নি। এর আগে বিভিন্ন সময় চাকসু নির্বাচন নিয়ে ছাত্র সংগঠনগুলো আন্দোলন করে আসলেও নির্বাচনের বিষয়ে কোনও পদক্ষেপ নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তবে সমপ্রতি ডাকসু নির্বাচনের
পর নতুন করে এ বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
ছাত্রলীগের একক আধিপত্য
বিশ্ববিদ্যালয় ও হলগুলোতে বর্তমানে সরকারি দলের ছাত্রসংগঠনের একক আধিপত্য রয়েছে। ১০ বছর যাবৎ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সুবাদে তাদের ছাত্রসংগঠনটির আধিপত্য আরও প্রকট হয়ে উঠেছে দিনে দিনে। যারা ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত তারাই শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারে। এর বাইরে ভিন্ন মতের অথবা প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্র সংগঠনের কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক কোনো কর্মকাণ্ড পরিচালনা করলেই বাধার সৃষ্টি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সময় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপে সংঘর্ষে উত্তাল থাকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস।
সহাবস’ানের অভাব
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাসীন হবার পর থেকে বিএনপির ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত। গত ১০ বছরে এ ছাত্র সংগঠনের প্রকাশ্য কোন তৎপরতা নেই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। ছাত্রদলের দাবি, সাংগঠনিক যেকোনো কাছে বাধা দেয় ছাত্রলীগ। তাই চাকসু নির্বাচনের আগে সবগুলো ছাত্র সংগঠনের মধ্যে সহাবস’ান তৈরির কথা জানান তারা। ক্যাম্পাসে বিভিন্ন বামপনি’ ছাত্র সংগঠনও তৎপর রয়েছে। তবে আওয়াামী লীগের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ রাজনীতির মাঠে তাদের খুব একটা প্রতিযোগী মনে করে না। ফলে বামপনি’দের রাজনৈতিক তৎপরতায় খুব একটি প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে না ছাত্রলীগ। কিন’ বিভিন্ন সময় ছাত্রলীগ বামপনি’ ছাত্র সংগঠনগুলোর উপরও চড়াও হয়- এমন অভিযোগও রয়েছে।
প্রভাবমুক্ত নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা
বিশ্ববিদ্যালয়টির কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন ছত্রদল, প্রগতিশীল ছাত্রনেতা ও শিক্ষকরা। তাদের দাবি, ডাকসুর মত যদি চাকসু নির্বাচন হয় তাহলে নির্বাচনের প্রয়োজন নেই।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক খ. আলী আর রাজী সুপ্রভাতকে বচলেন, চাকসু নির্বাচন নিয়ে প্রশাসন ইতিবাচক থাকায় সাধুবাদ জানাচ্ছি। তবে তফসিল ঘোষণার আগ পর্যন্ত নির্বাচন হবে কি-না তা বলা যাচ্ছে না।
সব ছাত্র সংগঠনের জন্যে সমান পরিবেশ রয়েছে কি-না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যারা ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছাত্র সংগঠন এবং তারা যাদেরকে গ্রহণ করছে তারাই শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক কর্মকণ্ড পরিচালনা করতে পারে। এর বাইরে ভিন্ন মতের অথবা প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্র সংগঠনের কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক কোনো কর্মকণ্ড পরিচালনা করতে গেলে বাধার সম্মুখীন হয়। কিছুদিন আগেই ক্যাম্পাসে বামপনি’ ছাত্র সংগঠনের কর্যক্রমে ক্ষামতাসীন ছাত্র সংগঠনগুলো হামলা চালিয়েছে। আমি মনে করছি এই মুহূর্তে ছাত্র সংগঠনগুলো মত প্রকাশের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা পাচ্ছে না।
একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হতে হলে প্রশাসন কী করতে হবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নির্বাচন হওয়ার জন্যে অনেক রাজনৈতিক-সামাজিক ছাত্র সংগঠন আছে। তাছাড়া, সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা রয়েছে। এই নির্বাচনের সঙ্গে তারা সবাই সম্পৃক্ত। সুতরাং তাদের জন্যে ভোটাধিকার প্রয়োগ করা অথবা ভোটে দাঁড়ানোর মতো যথাযথ পরিবেশ প্রশাসনকে নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচন ঘিরে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া মেনে নিয়ে প্রশাসনকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শিক্ষার্থীদের হলে অবস’ান, ছাত্রসংগঠনগুলোর সভা-সভাবেশ, মিছিল ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা দিতে হবে।
ছাত্রসংগঠনের বক্তব্য
ছাত্রলীগের সাবেক উপ-গ্রন’না ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক ইকবাল হোসেন টিপু বলেন, ‘চাকসু নির্বাচনা উদ্যোগ নেয়ায় প্রশাসনকে সাধুবাদ জানাই। স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি ছাড়া অন্য সব বৈধ ছাত্র সংগঠনগুলো নিয়ে চাকসু নির্বাচন হোক সেটি আমাদের প্রাণের দাবি। তবে বর্তমানে ছাত্রলীগের এ ইউনিটে কোনো কমিটি নেই। যার কারণে ক্যাম্পাসে প্রায় সময় সংঘর্ষ ও মারামারির ঘটনা ঘটে। তাই কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ যেন চাকসু নির্বাচনের আগে দ্রুত কমিটি করে এই ইউনিটটিকে সচল করেন।
ছাত্রদল সভাপতি খোরশেদ আলম বলেন, ছাত্রলীগের একক সেচ্ছ্বাচারিতায় এ মুহূর্তে প্রশাসনের চাকসু নির্বাচনের উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। তবে নির্বাচনের নীতিমালা প্রণয়নে যে কমিটি গঠন করা হয়েছে তা এক পক্ষীয়। আমরা জাতীয় ও ডাকসুর মতো প্রহসনমূলক নির্বাচন হোক তা চাই না। আমরা চাই একটি সুষ্ঠু, সুন্দর ও নিরপেক্ষ চাকসু নির্বাচন।
ছাত্রইউনিয়ের সাধারণ সম্পাদক গৌরচাঁদ ঠাকুর বলেন, চাকসু নির্বাচন হওয়ার জন্য আমাদের আন্দোলন বহু দিনের। আমরাও চাই চাকসু নির্বাচন হোক। কিন’ নির্বাচনের জন্য ক্যাম্পাসে যে গণতান্ত্রিক পরিবেশ দরকার তা নেই। বিভিন্ন সময় বামপনি’ ছাত্র সংগঠনগুলো তাদের কার্যক্রম চালাতে গিয়ে ক্ষামতাসীন ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের হামলার শিকার হয়েছে। তাই নির্বাচনের আগে ক্যাম্পাসে যত ধরনের গণতান্ত্রিক সংগঠন আছে তারাসহ যারাই নির্বাচনে অংশ নিতে চায় তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রশাসনের বক্তব্য
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘চাকসু নির্বাচন যাতে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পারি সেজন্য পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করে দিয়েছি। এই কমিটি সদ্য অনুষ্ঠিত হওয়া ডাকসু সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালার সাথে সামঞ্জস্য রেখে নতুন নীতিমালা তৈরি করবে।’
কখন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে উপাচার্য বলেন, ‘দ্রুততম সময়ের মধ্যে আমরা নির্বাচন অনুষ্ঠানের চেষ্টা করবো।’
হঠাৎ করে চাকসু নির্বাচন নিয়ে প্রশাসনের এ প্রদক্ষেপ কেন জানতে চাইলে উপাচার্য বলেন, ‘আগে চাকসু নিবার্চনের পরিবেশ ছিল না। ডাকসু নিবার্চনের মাধ্যমে কিছুটা পরিবেশ আসছে। এছড়াও সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের সুবর্ণজয়ন্ত্রী অনুষ্ঠানে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ চাকসু নির্বাচন দেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানিয়েছেন। কারণ নেতৃত্ব বিকাশে ছাত্র সংসদের বিকল্প নেই। বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনগুলোরও দীর্ঘ দিনে দাবি ছিল চাকসু নির্বাচন। আমিও ব্যক্তিগতভাবে মনে করি চাকসু নির্বাচন এখন সময় উপযোগী একটি সিদ্ধান্ত। তাই সে লক্ষ্যে কাজ চলছে। প্রধানমন্ত্রীর সদয় নির্দেশনার মাধ্যমে মূল কাজ শুরু করবো। এখন শুধু প্রাথমিক কাজ শুরু করছি।’