চাকরীজীবীর আয়কর বৃত্তান্ত

দেউড়ি ডেস্ক
girl

আপনি কি চাকরীজীবী? চাকরী থেকেই আপনার মূল আয় আসে? এবং গত আয় বছরে অর্থাৎ ২০১৬-১৭ আয় বছরে আপনার করযোগ্য আয় কি ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা অতিক্রম করেছে? যদি তাই হয় তাহলে ২০১৭-১৮ কর বর্ষে আপনাকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে আয়কর বিবরণী জমা দিতে হবে।
গত করবর্ষ পর্যন্ত সব করদাতাগণই ‘আইটি-১১গ’ আয়কর রিটার্ন ফর্ম পূরণ করে তাদের রিটার্ন জমা দিয়েছেন। তবে চলতি করবর্ষ থেকে যেসব করদাতাদের আয় শুধুমাত্র বেতন থেকে আসে তাদের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড মাত্র তিন পৃষ্ঠার একটি নতুন আয়কর বিবরণী ফর্ম ‘আইটি-১১ঙ’ চালু করেছে। এটা পূরণ করা খুবই সহজ এবং অনেক কম সময় লাগে। এই বিষয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছেন পেশায় চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট জসীম উদ্দিন রাসেল।
আইটি-১১গ রিটার্ন ফর্মটির মূল রিটার্ন ফর্মই ছিল তিন পৃষ্ঠার। এবং সঙ্গে প্রয়োজন মতো সংযুক্ত করতে হত তফসিল ও বিবরণী। যার কিছুই নতুন রিটার্ন ফর্ম আইটি-১১ঙ তে লাগবে না।
এখন প্রশ্ন হল এই আয়কর বিবরণী কোথায় পাবেন?
সকল আয়কর অফিসে এই ফর্ম পাওয়া যাবে। অথবা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ওয়েবসাইট থেকেও ফর্ম ডাউনলোড করে তা পূরণ করতে পারেন। আয়কর মেলা শেষ হয়ে যাওয়ার পরও নভেম্বর মাস জুড়ে করদাতাগণ তাদের আয়কর বিবরণী জমা দিতে পারবেন। অর্থাৎ নভেম্বর মাসের ৩০ তারিখ পর্যন্ত জমা দেওয়া যাবে।
আইটি-১১ঙ ট্যাক্স রিটার্ন ফর্মটি মোট চার ভাগে বিভক্ত। প্রথম পাতায় আয়করদাতার সাধারণ তথ্য, দ্বিতীয় পাতায় আয়ের বিবরণ, তৃতীয় পাতায় পরিসম্পদ, দায় এবং ব্যয় বিবরণী। এই তিনটি পাতা আয়করদাতা পূরণ করবেন। আর চতুর্থ পাতা আয়কর কর্মকর্তার জন্য যেখানে প্রাপ্তি স্বীকারপত্র থাকে।
বাংলাদেশে ক্রমাগত ব্যবসার পরিধি বেড়েই চলেছে। তার সঙ্গে বাড়ছে চাকরিজীবীর সংখ্যা। সে কথা মাথায় রেখেই এই রিটার্ন ফর্ম চালু করা হয়েছে। আপনি যদি চাকরিজীবী হয়ে থাকেন তাহলে তিনটি পাতায় আপনাকে কী কী তথ্য দিতে হবে এবং কীভাবে পূরণ করতে হবে সেসব নিচে থেকে জেনে নিতে পারেন।

সাধারণ তথ্য
এই পাতায় উপরে ডান দিকে আপনার ছবি লাগাতে হবে। আর বাম দিকে কর বর্ষ লিখতে হবে। যেহেতু আপনি ২০১৬-১৭ আয় বর্ষের কর দিতে যাচ্ছেন তাই আপনার কর বর্ষ হবে ঠিক এর পরের বছর অর্থাৎ ২০১৭-১৮।
এর ঠিক নিচে বক্সের মধ্যে আপনার নাম, টিন, জাতীয় পরিচয় পত্রের নম্বর, জন্ম তারিখ, ই-মেইল, স্বামী/স্ত্রীর টিন অথবা নাম লিখতে হবে।
ক্রম অনুযায়ী এই তথ্যগুলোর পর আপনি যে সার্কেল এবং কর অঞ্চলের অধীন তা লিখতে হবে। এই তথ্যটা পাবেন আপনার টিন থেকে। সেখান থেকে দেখে দেখে পূরণ করে নিন।
আবাসিক মর্যাদার ঘরে আপনি নিবাসি না অ-নিবাসি তা টিক চিহ্ন দিয়ে উল্লেখ করুন। এবার আপনি যে কোম্পানিতে চাকরি করেন সে কোম্পানির নাম এবং ঠিকানা লিখতে হবে। এর নিচে আপনার বর্তমান ঠিকানা, অফিসের টেলিফোন নাম্বার এবং আপনার মোবাইল নাম্বার লিখতে হবে। এই তথ্যগুলো পূরণ করলেই আপানার প্রথম পাতা পূরণ করা হয়ে যাবে। বুঝতেই পারছেন অনেক সহজ।

আয়ের বিবরণ
যেদিন আপনার আয় বর্ষ শেষ হচ্ছে সেদিনসহ মাসের নাম এবং বছর উপরে লিখতে হবে। এর নিচে প্রথমেই আপনার বেতন থেকে সারা বছর ধরে কত আয় হয়েছে যেটা করযোগ্য তা উল্লেখ করতে হবে। আইটি-১১গ ফর্মে বেতন থেকে আয়ের জন্য আলাদা একটা ফর্ম পূরণ করলেও এখানে আপনাকে তা করতে হবে না। যেহেতু আপনি এখানে আর কোনো কাগজ সংযুক্ত করছেন না তাই আলাদা একটা কাগজে হিসেব করে বেতন থেকে মোট করযোগ্য আয় এখানে লিখবেন।
এর নিচে আপনার যদি বাড়ি ভাড়া, কৃষি বা অন্য কোনো খাত থেকে আয় থাকে তাহলে লিখতে হবে। অনেক সময় দেখা যায় কোনো করদাতা চাকরি করছেন ঠিকই কিন্তু গ্রামের বাড়িতে কিছু কৃষিজমি রয়েছে যেখান থেকেও বছরে কিছু আয় হয়ে থাকে। আবার কেউ কেউ চাকরির পাশাপাশি হয়ত একটা ফ্ল্যাট কিনেছেন যেখান থেকেও ভাড়া বাবদ আয় হয়। এর বাইরেও আমাদের সবারই কম-বেশি বিনিয়োগ থাকে যেখান থেকে লভ্যাংশ বা ব্যাংক থেকে কোনো রকমের সুদ পেয়ে থাকি। সেই জন্যই এই খাতগুলো রাখা হয়েছে। যদি এইসব খাত থেকে আপনার আয় না থাকে তাহলে তা পূরণ করতে হবে না।
উপরোক্ত খাতে আপনার আয় লেখার পরে পেয়ে যাবেন আপনার সারা বছর ধরে মোট করযোগ্য আয়। তার উপর নির্ধারিত হারে কর নির্ণয় করে এর নিচে লিখতে হবে। আপনার যদি বিনিয়োগ থেকে থাকে তাহলে তার উপর কর রেয়াত পাবেন এবং তা সাত নাম্বার ক্রমিকে লিখতে হবে। মোট করযোগ্য আয় থেকে কর রেয়াত বাদ দিলেই এ বছরের কর দায় বেরিয়ে আসবে। এর পর আপনি যেখানে চাকরি করেন সেখান থেকে প্রতি মাসে বেতন দেওয়ার সময় উৎসে কর্তনকৃত কর বাদ দিলেই আপনি পেয়ে যাবন আপনার নীট কর; যেটা আপনাকে চালান/পে অর্ডার/ ব্যাংক ড্রাফট এর মাধ্যমে আয়কর রিটার্নের সঙ্গে জমা দিতে হবে।
আপনার যখন উপরের সব তথ্য পূরণ হয়ে যাবে তার নিচেই একটা প্রতিপাদন দিতে হয় এবং তার নিচে আপনার স্বাক্ষর দিতে হয়। এখানে মূলত অঙ্গীকার করা হয় যে আপনার দেওয়া যাবতীয় তথ্য, দরকারি কাগজপত্র আপনার জানা মতে সম্পূর্ণ এবং সঠিক।
এর ঠিক নিচেই রয়েছে সংযুক্তি। আপনি রিটার্নের সঙ্গে যে কাগজপত্র জমা দেবেন তা উল্লেখ করতে হবে এখানে। যেমন: বেতন বিবরণী, ব্যাংক বিবরণী, বিনিয়োগজনিত প্রমাণপত্র, ট্যাক্স জমা দেওয়ার চালান এবং অন্যান্য দরকারি কাগজপত্র।

পরিসম্পদ, দায় এবং ব্যয় বিবরণী
এই ফর্মটি সবার জন্য বাধ্যতামূলক নয়। যদি নিচের যে কোনো একটি শর্ত পূরণ হয় কেবল তাহলেই আপনাকে এই বিবরণী পূরণ করতে হবে।
ক) আয় বছরের শেষ তারিখে মোট পরিসম্পদ এর পরিমাণ ২৫ লাখ টাকার অধিক হলে; অথবা
খ) আয় বছরের শেষ তারিখে মোটর গাড়ি (জীপ বা মাইক্রোবাসসহ) এর মালিকানা থাকলে; অথবা
গ) আয় বছরে কোনো সিটি কর্পোরেশন এলাকায় কোনো গৃহ-সম্পত্তি বা অ্যাপার্টমেন্টের মালিক হলে অথবা গৃহ-সম্পত্তি বা অ্যাপার্টমেন্টে বিনিয়োগ করলে।
তাহলে দেখা যাচ্ছে, উপরে বর্ণিত তিনটি শর্তের একটিও যদি প্রযোজ্য না হয় তাহলে আপনাকে এই বিবরণী পূরণ করতে হচ্ছে না। অর্থাৎ এর সঙ্গে আপনার আরও একটি পাতা পূরণ করার প্রয়োজন হবে না। তবে কোনো করদাতা চাইলে স্ব-প্রণোদিতভাবে এই বিবরণী জমা দিতে পারবেন। যদি আপনার জন্য এই ফর্ম পূরণ করা বাধ্যতামূলক হয় বা স্ব-প্রণোদিতভাবে পূরণ করতে চান তাহলে এই ফর্মে আপনার কৃষি-অকৃষি সম্পদ, বিনিয়োগ, মোটর গাড়ি, আসবাবপত্র, সোনা, নগদ টাকা এবং ব্যাংকে জমা টাকাসহ অন্যান্য সম্পদ উল্লেখ করতে হবে।
এবং আপনার যদি কোনো দায় থাকে যেমন যদি কারো কাছ থেকে ঋণ নিয়ে থাকেন বা ব্যাংকের কাছে থেকে যদি ঋণ নিয়ে থাকেন তা বাদ যাবে। বাদ দেওয়ার পরেই বেরিয়ে আসবে আপনার নীট সম্পদের পরিমাণ।

আয়কর রিটার্ন প্রাপ্তিস্বীকার পত্র
আপনি এতক্ষণ ধরে যে ফর্মটি পূরণ করলেন তা যখন কর অফিসে জমা দেবেন তখন কর কর্মকর্তা এই প্রাপ্তিস্বীকার পত্রে স্বাক্ষর করে সীল দিয়ে আপনাকে ফেরত দেবেন। এটাই হল প্রমাণ যে আপনি রিটার্ন ফর্ম জমা দিয়েছেন।