চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ করা হোক

সঞ্জয় দাস, সাধন সরকার, এম এ আলী, রবিউল হাসান

‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র পরিষদ’ সংগঠনটি দীর্ঘ প্রায় ছয় বছর ধরে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর দাবিতে যৌক্তিক আন্দোলন করে আসছে। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকার জনমত জরিপেও প্রায় ৯০ ভাগের বেশি মানুষ চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে। বলতে দ্বিধা নেই, লক্ষ লক্ষ তরুণ আজ হতাশাগ্রস্ত! তারা এ কথা মানতে পারছে না যে, শুধু পড়তে পড়তে বয়স ৩০ বছর পার হওয়ার কারণে তারা আর চাকরিতে আবেদন করতে পারবে না।
জাতীয় সংসদে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধির বিষয়ে বহুবার দাবিও উঠেছে। সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ সচিব একথাও বলেছিলেন, চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ছে (সেটা ৩২ কিংবা ৩৩ যাই হোক না কেন)। এতে করে তরুণ সমাজ আশাবাদী হয়ে উঠেছিল! তারপর গোচরে-অগোচরে অনেক কথা শোনা গেলেও বাস্তবে কী হচ্ছে কিংবা চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা আদৌ বাড়বে কিনা- তা নিয়ে তরুণ সমাজ উদ্বিগ্ন।
মানসম্মত চাকরি (১ম-২য় শ্রেণি) পেতে হলে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করতে করতে প্রায় ২৫ বছর লেগে যায়। গড় আয়ু ৫০ বছর ছাড়িয়ে যাওয়ার পর ১৯৯১ সালে চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩০ করা হয়। তখন অবসরের বয়সসীমা ছিল ৫৭ বছর। বর্তমানে গড় আয়ু প্রায় ৭২ বছর। আবার অবসরের বয়সসীমাও বেড়েছে। গত ২৬ বছরে (১৯৯১ সালের পর) চাকরিতে অবসরের বয়সসীমা কয়েক দফা বাড়ানো হলেও দুঃখের বিষয় প্রবেশের বয়সসীমা আর বাড়েনি। পৃথিবীর ১৬০টিরও অধিক দেশে (রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, সুইডেন, ভারতসহ অধিকাংশ উন্নত দেশে) চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০এর অধিক। পার্শ্ববর্তী ভারতের পশ্চিমবঙ্গে চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৪০, রাশিয়াতে অবসরের আগের দিনও সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করা যায়। আফ্রিকায় কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৫৯ বছরের আগের যেকোনো সময় চাকরিতে প্রবেশ করা যায়।
বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজের একাডেমিক লেখাপড়া শেষ করতে সেশনজট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব প্রভৃতি কারণে প্রায় ২৫ বছর লেগে যাচ্ছে! একাডেমিক পড়াশোনা শেষ করতে করতে এবং চাকরির পড়াশোনা শুরু করতে করতে বয়স ৩০ পার হয়ে যাচ্ছে। সহজ কথায়, একজন তরুণকে ৩০ এর গণ্ডির মধ্যে বেঁধে রাখা হচ্ছে! ফলে বয়স ৩০ এর মধ্যে চাকরি না পাওয়া একজন তরুণকে নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।তাই সময়ের দাবি চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩৫ করা হোক। তথ্য মতে, বর্তমানে প্রায় ২৭ লাখ কর্মক্ষম তরুণ-তরুণী বেকার। এদের প্রায় অর্ধেক অংশই স্নাতক-স্নাতকোত্তর শেষ করা চাকরিপ্র্রত্যাশী। সরকারি নিয়ম অনুসরণ করার ফলে বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানও ৩০ বছরের ঊর্ধ্বে জনবল নিয়োগ দিচ্ছে না! আবার ‘যুবনীতি- ২০১৭’ তে যুবাদের বয়স ১৮-৩৫ রাখা হয়েছে। তাহলে কেন চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩০ রাখা হবে?
তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ রাষ্ট্রকে তৈরি করে দিতে হবে হবে। অন্যথায় বড় ধরনের জনশক্তির অপচয় হবে। বেকারত্বের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে অনেকে সামাজিক অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন! অনেক মেধা আবার বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে।
২০১১ সালে সরকারি চাকরিতে অবসরের বয়সসীমা ২ বছর বাড়িয়ে ৫৯ বছর করা হয়। আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে! এ ছাড়া অন্যান্য কিছু পেশায় কর্মকর্তাদের অবসরের বয়স আরও বেড়েছে, অথচ নিচের দিকে প্রবেশের বয়স বাড়েনি। ফলে ভারসাম্য না রাখার ফলে শুধু বেকারত্ব বেড়েছে, বেড়েছে তরুণদের হতাশা। একটু বেশি বয়সে চাকরিতে প্রবেশ করলে জ্ঞানের চর্চাও অব্যাহত থাকবে। বিভিন্ন রাষ্ট্রে বেকার তরুণদের জন্য বেকার ভাতা চালু আছে। কিন্তু আমাদের দেশে বেকার ভাতা না হোক, অন্তত চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়িয়ে তরুণদের বেকারত্বের হাত থেকে তো মুক্তি দেওয়া যেতে পারে! সব দিক বিবেচনা করে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ বছর করার সুপারিশ করেছে (একাধিকবার) জনপ্রসাশন মন্ত্রণালয় ‘সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি’। তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আবেদন, তরুণ সমাজের যুক্তিসংগত, যুগোপযোগী ও সময়ের দাবি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ করা হোক।
লেখকগণ : ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র পরিষদ’ এর সদস্য