চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানো সময়ের দাবি

সাধন সরকার

বর্তমানে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ১৮-৩০ বছর। তবে মানসম্মত চাকরি (১ম-২য় শ্রেণি) পেতে হলে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করতে করতে প্রায় ২৫-২৬ বছর লেগে যায়। গড় আয়ু ৫০ বছর ছাড়িয়ে যাওয়ার পর ১৯৯১ সালে চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩০ করা হয়। বর্তমানে গড় আয়ু প্রায় ৭২ বছর। আবার অবসরের বয়সসীমাও বেড়েছে। গত ২৬ বছরে (১৯৯১ সালের পর) চাকরিতে অবসরের বয়সসীমা কয়েক দফা বাড়ানো হলেও দুঃখের বিষয় প্রবেশের বয়সসীমা আর বাড়েনি।
পৃথিবীর ১৬০টিরও অধিক দেশে (রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, সুইডেন, ভারতসহ অধিকাংশ উন্নত দেশে) চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০এর অধিক। পার্শ্ববর্তী ভারতের পশ্চিমবঙ্গে চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৪০, রাশিয়াতে অবসরের আগের দিনও সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করা যায়। আফ্রিকায় কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় কোনো কোনো ড়্গেত্রে ৫৯ বছরের আগের যেকোনো সময় চাকরিতে প্রবেশ করা যায়।
বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজের একাডেমিক লেখাপড়া শেষ করতে সেশনজট, শিড়্গাপ্রতিষ্ঠানে ড়্গমতার দ্বন্দ্ব প্রভৃতি কারণে প্রায় ২৬ বছর লেগে যাচ্ছে! একাডেমিক পড়াশোনা শেষ করতে করতে এবং চাকরির পড়াশোনা শুরম্ন করতে করতে বয়স ৩০ পার হয়ে যাচ্ছে। তবে কেন চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০ এ থমকে থাকবে ? ফলে লড়্গ লড়্গ তরম্নণ চাকরি না পেয়ে হতাশায় ভুগছেন। বাসত্মবতা হলো, বর্তমানে লড়্গ লড়্গ ছেলেমেয়ের উচ্চশিড়্গা আছে, সনদ আছে কিন’ চাকরি নেই! বয়স ৩০ পার হওয়া মানে অর্জিত সার্টিফিকেটের মেয়াদ শেষ! সহজ কথায়, একজন তরম্নণকে ৩০ এর গন্ডির মধ্যে বেঁধে রাখা হচ্ছে! ফলে বয়স ৩০ এর মধ্যে চাকরি না পাওয়া একজন তরম্নণকে নির্মম বাসত্মবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। অথচ মধ্যম আয়ের ও উন্নত দেশের স্বপ্ন দেখতে হলে সব তরম্নণের মেধা কাজে লাগানো সবচেয়ে বেশি জরম্নরি! তাই সময়ের দাবি চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩৫ করা হোক।
বর্তমানে প্রায় ২৭ লাখ কর্মড়্গম তরম্নণ-তরম্নণী বেকার। এদের প্রায় অর্ধেক অংশই স্নাতক-স্নাতকোত্তর শেষ করা চাকরিপ্র্রত্যাশী। সরকার লাখ লাখ টাকা খরচ করে, ভর্তুকি দিয়ে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে লড়্গ লড়্গ শিড়্গার্থীদের দেশ গড়ার কাজে সুসনত্মান হিসেবে তৈরি করছে। কিন’ সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০ এ বেঁধে রাখার ফলে সরকার এসব শিড়্গার্থীদের মেধা কি আদৌ কাজে লাগাতে পারছে ? সরকারি নিয়ম অনুসরণ করার ফলে বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানও ৩০ বছরের ঊর্ধ্বে জনবল নিয়োগ দিচ্ছে না! আবার ‘যুবনীতি- ২০১৭’ তে যুবাদের বয়স ১৮-৩৫ রাখা হয়েছে। তাহলে কেন চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩০ রাখা হবে ?
উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে শিড়্গিত তরম্নণদের কাজে লাগাতে দেশের উন্নয়নে চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানো প্রয়োজন। এতে করে বেকারত্বের বোঝা কমবে। অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে বেকারদের দ্রম্নত কর্মসংস’ানে নতুন নতুন ড়্গেত্র তৈরি করা দরকার। দেশে এখন বেকারত্বের হার প্রায় ৫ শতাংশের কাছাকাছি। বেকাররা দেশের অভিশাপ নয়, তারাও সুযোগ পেলে দেশের ও পরিবারের জন্য কিছু করতে চায়। নীতিনির্ধারকদের সেই সুযোগ তৈরি করতে হবে। অন্যথায় বড় ধরনের জনশক্তি অপচয় হবে।
বেকারত্বের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে অনেকে সামাজিক অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। অনেক মেধা আবার বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। ২০১১ সালে সরকারি চাকরিতে অবসরের বয়সসীমা ২ বছর বাড়িয়ে ৫৯ বছর করা হয়। আরও বাড়ার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে! এ ছাড়া অন্যান্য কিছু পেশায় কর্মকর্তাদের অবসরের বয়স আরও বেড়েছে, অথচ নিচের দিকে প্রবেশের বয়স বাড়েনি। ফলে ভারসাম্য না রাখার ফলে শুধু বেকারত্ব বেড়েছে, বেড়েছে তরম্নণদের হতাশা। চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানো মানে তো চাকরি দেওয়া নয়। বরং একটি সম্ভাবনাময় শেষ হওয়া জীবনগাড়ির চাকা নতুন করে সচল করা। এতে বাড়তি টাকার অপচয়ও হবে না। যে যার মেধা ও যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পাবে। তাছাড়া একটু বেশি বয়সে চাকরিতে প্রবেশ করলে জ্ঞানের চর্চাও অব্যাহত থাকবে। বিভিন্ন রাষ্ট্রে বেকার তরম্নণদের জন্য বেকার ভাতা চালু আছে। কিন’ আমাদের দেশে বেকার ভাতা না হোক, অনত্মত চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়িয়ে তরম্নণদের বেকারত্বের হাত থেকে তো মুক্তি দেওয়া যেতে পারে!
সব দিক বিবেচনা করে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ বছর করার সুপারিশ করেছে (একাধিকবার) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ‘সম্পর্কিত সংসদীয় স’ায়ী কমিটি’। তরম্নণ সমাজের যুক্তিসংগত, যুগোপযোগী, সময়ের ও প্রাণের দাবি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ করা হোক। এতে করে শিড়্গার্থীরা হয়তো নিজেকে তৈরির এবং মেধা কাজে লাগানোর সুযোগ পাবে। লড়্গ লড়্গ তরম্নণ তাদের হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনা আবার ফিরে পাবে। দেশের প্রত্যেকটি মেধা কাজে লাগবে। দেশ এগিয়ে যাবে।