চমেক হাসপাতাল বিনা মূল্যের সেবায় পদে পদে টাকা

সিফায়াত উল্লাহ

কয়েকদিন ধরে জ্বর ও শ্বাসকষ্টে ভুগছে এক বছর বয়সী শিশু মেহেরিমা সুলতানা। শনিবার রাত দুটোর দিকে তাকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে ৯ নম্বর শিশু মেডিসিন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন সে। ভর্তির পর থেকে গতকাল বিকেল পর্যন্ত চারবার নেবুলাইজ করা হয় তাকে। প্রতিবার নেবুলাইজার দেয়ার বিপরীতে ২০ টাকা করে দিতে হয়েছে বলে তার মা খায়রুন নেসা জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, এখানে সবকিছু ফ্রি; এমনটাই জানতাম। কিন’ বাস্তবে দেখছি টাকা ছাড়া কিছুই হয় না। চিকিৎসক বলেছেন, প্রতিদিন চারবার করে নেবুলাইজার দিতে। প্রতিবার ২০ টাকা না দিলে নেবুলাইজার করানো হচ্ছে না।
বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন এক রোগী জানান, পোড়া স’ানে ড্রেসিং করতে ২শ টাকা দাবি করে এক আয়া। একশ টাকা দিয়েছি বলে দ্বিতীয়বার ডাকলে আর আসেনি। পরে ২শ টাকা দিব বলার পর এসেছে। অথচ বিনা মূল্যে ড্রেসিং সেবা পাওয়ার কথা।
শুধু কি এই দুজন! চমেক হাসপাতালে সেবা নিতে আসা সব রোগীকে পদে পদে টাকা গুনতে হয়। টাকা নেওয়ার অভিযোগ মূলত হাসপাতালের ওয়ার্ড বয়, আয়াদের বিরুদ্ধে। কিছু কিছু নার্সও টাকা নেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে, নিয়ম অনুযায়ী ড্রেসিং ও প্লাস্টার করার কাজটি মূলত সিনিয়র স্টাফ নার্সদের দায়িত্ব। কিন’ এসব কাজ আয়া-ওয়ার্ডবয় থেকে সুইপারও পর্যন্ত করে থাকেন। হাসপাতালের এক কর্মকর্তা জানান, নার্স সংকট। তাই অনেক সময় অন্যরা এসব কাজ করে। তবে তিনি আয়া-ওয়ার্ডবয়দের এসব কাজে অভিজ্ঞতা আছে বলে দাবি করেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যেসব নার্স, আয়া-ওয়ার্ড বয়রা টাকা লেনদেনের সঙ্গে জড়িত, প্রমাণ পেলে তাদের থেকে ছাঁটাই করা হয়। প্রয়োজনে নেওয়া হয় বিভাগীয় ব্যবস’া। তবে একই জায়গায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করার সুযোগের কারণে এমনটাই হচ্ছে বলে কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন। তবে তারা নাম প্রকাশ করেননি।
গতকাল রোববার হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হৃদরোগ বিভাগে ইসিজি করাতে টাকা গুনতে হয় ৫০ থেকে একশ টাকা। বার্ন ইউনিটে ড্রেসিংয়ের জন্য একশ থেকে দুইশ টাকা পর্যন্ত রোগীর কাছ থেকে নিতে দেখা গেছে। শিশু ওয়ার্ডে একবার নেবুলাইজার দিতে ২০ টাকা করে নিচ্ছে। অর্থোপেডিক্স ও নিউরো সার্জারি ওয়ার্ডেও একই চিত্র চোখে পড়েছে। সবচেয়ে নাজুক অবস’া গাইনি ওয়ার্ডে। ওয়ার্ডটিতে পদে পদে টাকা গুনতে হয় রোগী-স্বজনদের। শুরুতে ওয়ার্ডে ভর্তি হতে অলিখিত নিয়মে নিচ্ছে ৫০ টাকা। এ টাকা সরাসরি ওয়ার্ডের সর্দারের পকেটে যাচ্ছে। লেবার রুমে ডেলিভারি শেষে ৩শ থেকে চারশ টাকা বাধ্যতামূলক দিতে হচ্ছে। নবজাতক পরিচর্যা কেন্দ্রে ফ্রি যন্ত্রপাতি টাকার বিনিময়ে বিক্রি হচ্ছে। পুলিশ কেইসের ক্ষেত্রে ফ্রি মেডিক্যাল সনদের জন্য টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া রোগী মারা গেলে ডেথ সার্টিফিকেট নেয়ার বিপরীতে টাকা নিচ্ছে ওয়ার্ড মাস্টারের অফিসের কয়েকজন কর্মচারী।
সেবা গ্রহীতারা বলেন, যেসব সেবা বিনা মূল্যে পাওয়ার কথা, অর্থ খরচ না করলে এর সামান্যটুকুও মেলে না। বলতে গেলে অর্থের বিনিময়ে সেবা। তাই বিনা মূল্যে সেবা কথাটা না বলা উচিৎ। নতুবা যারা টাকা নিচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস’া নেয়া হোক।
সুপ্রভাতকে প্রসূতি জেসমিন আকতার বলেন, টাকা আর টাকা। একটু ছুঁয়ে দিলে টাকা দিতে হয়। নয়তো দুর্ব্যবহার। অত্যাচার। যা মুখ দিয়ে আসে তাই বলে। আমাদের মানুষ মনে করে না তারা। সবকিছু টাকার বিনিময়ে পাওয়া যায়।
এ বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জালাল উদ্দিন সুপ্রভাতকে বলেন, হাসপাতালে সব সেবাই বিনা মূল্যে পাওয়া যায়। কেবল এক্স-রে, প্যাথোলজি এবং ফিজিওথেরাপির জন্য সরকার নির্ধারিত ফি দিতে হয়।
পরিচালক জালাল উদ্দিন বলেন, স্পেশাল আয়া-ওয়ার্ডবয়দের বিরুদ্ধে আমরা অহরহ অভিযোগ পাচ্ছি। তাই এদের হাসপাতাল থেকে বের করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে বিকল্প জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কয়েকদিনের মধ্যে নিয়োগ শেষ হবে। পহেলা সেপ্টেম্বর থেকে আর কোনো স্পেশাল আয়া-ওয়ার্ডবয় হাসপাতালে থাকবে না এবং থাকতে পারবে না।