চমেক হাসপাতাল টাকার জন্য রোগী জিম্মি করে আয়া-ওয়ার্ডবয়

সিফায়াত উল্লাহ

রোগী ও স্বজনদের জিম্মি করে টাকা আদায় করছে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের স্পেশাল আয়া-ওয়ার্ডবয়রা। এতে সেবা নিতে এসে অনেকেই হচ্ছেন সর্বস্বান্ত।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, স্পেশাল আয়া-ওয়ার্ডবয়দের সিন্ডিকেট রোগীদের জিম্মি করে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। টাকা না পেলে রোগী ও স্বজনদের করছে নানা হয়রানি।
গত সপ্তাহে অসুস’ মাকে হাসপাতাল ভর্তি করান লোহাগাড়ার বাসিন্দা লুৎফর রহমান। তিনি বলেন, জরুরি বিভাগ থেকে ট্রলিতে করে একজন ওয়ার্ডবয় মা কে ওয়ার্ডে নিয়ে আসে। এরপর সে আমার কাছ থেকে দুইশ টাকা দাবি করে। আমি একশ টাকা দিতে চাইলে সে আমাকে ধমক দেয়। পরে দেড়শ টাকা দিলে সে চলে যায়।
জনবল সংকটের কারণে চমেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এসব স্পেশাল আয়া-ওয়ার্ডবয়দের নিয়োগ দেয়। হাসপাতাল থেকে তাদের কোনো বেতন দেয়া হয় না। রোগীদের দেওয়া টাকা তাদের জীবন চলে। এই সুযোগে তারা হাসপাতালে সিন্ডিকেট করে সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি করছে। অসুস’ মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে হাতিয়ে নিচ্ছে হাজার হাজার টাকা।
বর্তমানে হাসপাতালে স্পেশাল আয়া-ওয়ার্ডবয় রয়েছে প্রায় তিনশ জন। চাহিদানুযায়ী ৩৭টি ওয়ার্ডে এদের নিয়োগ দেয়া হয়। তিন শিফটে তারা ডিউটি করেন। প্রতিজন কর্মচারী সর্বোচ্চ তিনজন রোগীকে সেবা দেয়।
এছাড়াও জরুরি বিভাগে তিন শিফটে ৪০ জন দায়িত্ব পালন করেন। যারা রোগীদের আনা-নেয়া করে। সেবার বিপরীতে প্রতি রোগীর কাছ থেকে সর্বোচ্চ ত্রিশ টাকা নেয়ার নিয়ম বেধে দিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কিন’ নিয়মের তোয়াক্কা না করে যেমন ইচ্ছা তেমন টাকা দাবি করেন এসব কর্মচারীরা।
জানা গেছে, প্রতিদিন হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসা নিতে আসেন পাঁচ থেকে ছয়শ রোগী। জরুরি বিভাগ হয়ে এসব রোগী হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভর্তি হন।
স্পেশাল আয়া-ওয়ার্ডবয়দের একটি অংশ জরুরি বিভাগে ট্রলি চালিয়ে রোগীদের বিভিন্ন ওয়ার্ডে নিয়ে যান। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ টাকা নেয়ার নিয়ম করে দিলেও সুযোগ বুঝে প্রতি রোগী থেকে তারা দুইশ থেকে পাঁচশ টাকা হাতিয়ে নেয়। অনেক সময় টাকা না দিলে রোগী ও স্বজনদের খারাপ ব্যবহার ও মারধর করেন তারা।
এরপর রোগী ওয়ার্ডে ভর্তি হলে শুরু হয় সেখানের কর্মরত আয়া-ওয়ার্ডবয়দের অত্যাচার। কর্তৃপক্ষ এসব কর্মচারীদের সেবা দেয়ার জন্য নিয়োগ দিলেও আদতে তারা টাকা ছাড়া কোনো কাজ করে না।
অন্যদিকে স্বজনরা রোগীর সেবা করতে চাইলে নানা অজুহাতে হয়রানি করেন তারা। রোগীর ওষুধপত্রসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র চুরি করে ফেলেন। এসব কর্মচারীরা দালালদের ওয়ার্ডে ঢুকতে সাহায্য করেন। সিট বাণিজ্য, ওষুধ ও বাচ্চা চুরির মতো অপরাধের সঙ্গে জড়িতের অভিযোগ রয়েছে এদের বিরুদ্ধে। হাসপাতালের যন্ত্রপাতিও চুরি করে নিয়ে যায়।
কিন’ কর্তৃপক্ষ এসব কর্মচারীদের সিন্ডিকেটের কাছে অসহায়। একাধিকবার ব্যবস’া নিয়েও তাদের দাপট কমাতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।
তবে সম্প্রতি এসব আয়া-ওয়ার্ডবয়দের ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এজন্য পরিচালক স্বাক্ষরিত একটি বিভিন্ন ওয়ার্ডে প্রেরণ করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আখতারুল ইসলাম সুপ্রভাতকে বলেন, রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। জনবল সংকটের কারণে স্পেশাল আয়া ওয়ার্ডবয় নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। যাতে রোগীরা নির্বিঘ্নে সেবা পান। কিন’ এসব কর্মচারীদের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত অভিযোগ আসছে।
তিনি বলেন, পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পহেলা জুলাই থেকে হাসপাতালে আর কোনো স্পেশাল আয়া-ওয়ার্ডবয় থাকবে না। এর মধ্যে বিকল্প চিন্তা ভাবনা করা হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, বৃহত্তর চট্টগ্রামবাসীর চিকিৎসার শেষ আশ্রয় এই হাসপাতাল। প্রতিদিন গড়ে দুই থেকে আড়াই হাজার রোগী ভর্তি থাকেন এই হাসপাতালে। বহির্বিভাগে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন কয়েক হাজার রোগী। কিন’ সেবার মান নিয়ে একাধিক অভিযোগ রয়েছে এই হাসপাতালের রোগীদের। উন্নতমানের চিকিৎসা সেবার সুযোগ-সুবিধা থাকলেও হাসপাতালের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সিন্ডিকেটের কারণে সঠিক সেবা পাচ্ছেন না রোগীরা।