চবি রণক্ষেত্র

চবিতে ছাত্রলীগের দু’ গ্রুপের সংঘর্ষের এক পর্যায়ে অস্ত্র নিয়ে এক পক্ষের অ্যাকশন-সুপ্রভাত
চবিতে ছাত্রলীগের দু’ গ্রুপের সংঘর্ষের এক পর্যায়ে অস্ত্র নিয়ে এক পক্ষের অ্যাকশন-সুপ্রভাত
চবিতে ছাত্রলীগের দু’ গ্রুপের সংঘর্ষের এক পর্যায়ে অস্ত্র নিয়ে এক পক্ষের অ্যাকশন-সুপ্রভাত

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষার্থীদের শুভেচ্ছা জানানোর জন্য লাইনে দাঁড়ানোকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের অনুসারী চবি ছাত্রলীগের সভাপতি ও নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী সাধারণ সম্পাদকের গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের এ ঘটনা ঘটে। এতে হাটহাজারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এবং দুই পুলিশ সদস্যসহ ছাত্রলীগের উভয় পক্ষের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জিরো পয়েন্টে গতকাল সোমবার সকাল ১১টার দিকে এ সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে। এ ঘটনায় শাহজালাল ও শাহ আমানত হলে তল্লাশি চালিয়ে উভয়পক্ষের ৩০ জনকে আটক এবং দুটি শর্টগান, একটি পিস্তলসহ বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ।
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষার্থীদের শুভেচ্ছা জানাতে ছাত্রলীগের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকের গ্রুপ বিশ্ববিদ্যালয়ের জিরো পয়েন্টে লাইনে দাঁড়ানোকে কেন্দ্র করে উভয় পক্ষের কর্মীরা বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ে। পরে সভাপতি গ্রুপের কর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহজালাল হলে এবং সাধারণ সম্পাদকের গ্রুপের কর্মীরা শাহ আমানত হলে অবস্থান নেয়। এ সময় উভয় পক্ষ পরস্পরের দিকে ইট পাটকেল ছোড়ে। এক পর্যায়ে উভয় পক্ষের কর্মীরা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ প্রায় ২০০ রাউন্ড রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল ছোড়ে। সংঘর্ষের সময় হাটহাজারী থানার ওসি মো. ইসমাইল হোসেন, পুলিশ সদস্য এনামুল হক ও নুরুল আলম আহত হন। সংঘর্ষে ছাত্রলীগ কর্মী পরিসংখ্যান বিভাগের ২০০৬-০৭ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র রেজাউল হক রুবেল, বাংলা বিভাগের ৩য় বর্ষের শিক্ষার্র্থী সফিউল আলম, ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্স এর শিক্ষার্থী আসিক আবু নাঈম, ব্যবস্থাপনা বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী কৌশিক বিশ্বাস, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী ইমন ধর, মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী মো. আব্দুল হান্নান, আইএমএল ১ম বর্ষের শফিকুল ইসলাম, মাসুম খান, সুদীপসহ ছাত্রলীগের দুগ্রুপের প্রায় অর্ধশতাধিক কর্মী আহত হন। আহতদের বিশ্ববিদ্যালয় মেডিক্যাল সেন্টার থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ঘটনার সময় পুলিশ ভর্তি পরীক্ষার্থীদের ওপরও চড়াও হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এ সময় ছাত্রলীগের বগিভিত্তিক সংগঠন বাংলার মুখের সোহেল, প্রবীন দেব ও শৈবাল নামের তিন ছাত্রলীগ কর্মীকে মারধর করে পুলিশ।
অন্যদিকে ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসা অনেক পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সংঘর্ষের কারণে প্রবেশপত্র, রেজিস্ট্র্রেশন কার্ড, ফাইলপত্র, ছবি এমনকি ব্যাগ না নিয়েই ভয়ে হল ছেড়ে চলে যেতে দেখা যায়।
কিশোরগঞ্জ থেকে ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসা শাহ পরান বলেন, ‘ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার জন্য এখানে এসেছি। আজকে পরীক্ষা দিয়ে শাহজালাল হলে ফেরার পর পরিস্থিতি খারাপ দেখে আমিসহ আমরা আট দশজন বন্ধু আগামীকালের পরীক্ষা না দিয়েই বাড়ি ফিরে যাচ্ছি। কোনো রকম নিজের জীবন নিয়ে হল থেকে পাহাড়ের ওপর দিয়ে বের হয়ে এসেছি।’
শাহজালাল হলের ৩৩০ নম্বর কক্ষের বাসিন্দা ছাত্রলীগের একাকার গ্রুপের কর্মী লোকমান হোসেন বলেন, ‘পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার নামে পুলিশ কোনো কথা ছাড়াই হলের প্রায় সব রুমে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করে। এ সময় বেশ কয়েকজন ভর্তি পরীক্ষার্থীকেও তারা মারধর করে।’
পুলিশের অভিযান থেকে বাদ যাননি অনেক সাধারণ শিক্ষার্থীও। ডাইনিং হল থেকে খাবার খেয়ে আসার সময় পুলিশি নির্যাতনের শিকার হন শাহজালাল হলের ৩৩৫ নম্বর রুমের বাসিন্দা ও একাউন্টিং বিভাগের ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষের এমবিএর ছাত্র ছাব্বির হোসেন। তিনি জানান, ‘পুলিশ হঠাৎ করেই আমাকে বেধড়ক মারধর করে আমার হাত মচকে দিয়েছে। ১১ তারিখ থেকে আমার পরীক্ষা, এখন আমি কিভাবে পরীক্ষা দেব?’
চবি ছাত্রলীগের সভাপতি আগমগীর টিপু বলেন, ‘জুনিয়রদের মাধ্যে ভুল বোঝাবুঝির জের ধরে এ ঘটনার সূত্রপাত। আমাদের ১০-১৫ জনের মত আহত ও ২৫ জনের মত আটক হয়েছে। বিষয়টি সমাধানের পথেই ছিল কিন্তু পুলিশই এ ঘটনাটাকে বড় করেছে। বিষয়টি এখন সমাধানের পথে।’
এ কই কথা বললেন সাধারণ সম্পাদক ফজলে রাব্বি সুজন। তিনি বলেন, ‘এটি জুনিয়রদের মাঝে সামান্য ভুল বোঝাবুঝি ছাড়া আর কিছু নয়। আমাদের ৩০-৪০ জনের মত আহত ও ৬ জনের মত আটক হয়েছে। তবে সভাপতির সাথে বসে দোষীদের বের করে তাদের শাস্তি ও বিষয়টি সমাধান করছি।’ তিনি এ সময় সাধারণ শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগ কর্মীদের ওপর হামলার তীব্র নিন্দা জানান।
হাটহাজারী থানার ওসি (তদন্ত) মো. সালাহউদ্দিন জানান, ‘ছাত্রলীগের দু গ্রুপের সংঘর্ষের সময় থানার ওসি মো. ইসমাইল তার দেহরক্ষী এবং দুই পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ফাঁকা গুলি ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করা হয়েছে। এ ঘটনায় ৩০ জনকে আটক করা হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।’
এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আলী আজগর চৌধুরী বলেন, ‘ভর্তি পরীক্ষার্থীদের শুভেচ্ছা জানানোকে কেন্দ্র করে এ ঘটনার সূত্রপাত হয়। পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে তখন আমরা তাদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করি। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যস ছোড়ে। এ সময় পুলিশের ওসিসহ বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছে বলে জানতে পারি। পরে পুলিশ হলে তল্লাশি চালিয়ে বেশকিছু অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার করে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ভর্তি পরীক্ষা যথাসময়ে হবে।’
উল্লেখ্য, এ ঘটনার পরও বিকেলের ভর্তি পরীক্ষা স্বাভাবিকভাবে নেওয়া হয়। বর্তমানে ক্যাম্পাসে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। তবে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।

আপনার মন্তব্য লিখুন