চবিতে গ্রন্থাগারবিমুখ হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা

রায়হান উদ্দিন, চবি

প্রায় সাড়ে তিন লাখ গ্রন’ থাকলেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) কেন্দ্রীয় গ্রন’াগারটির সদ্ব্যবহার হচ্ছে না। নানা কারণে শিক্ষার্থীরা লাইব্রেরিতে পড়াশুনা করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে দিন দিন। ফলে প্রতিদিনই গ্রন’সমৃদ্ধ গ্রন’গারটি থাকছে ফাঁকা ।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৬৬ সালে মানবিক ও সমাজবিজ্ঞানের প্রায় ১৪ হাজার বই নিয়ে প্রশাসনিক ভবনের (মল্লিক ভবনের) দক্ষিণ পাশে ক্ষুদ্র স্বতন্ত্র একটি ভবনে যাত্রা শুরু হয়েছিল চবির গ্রন’াগারটির। দুষ্প্রাপ্য বই, বৈচিত্র্যময় দেশি বিদেশি বই, জার্নাল ও রেফারেন্স বইসহ বর্তমানে সংগ্রহ সংখ্যা সাড়ে ৩ লক্ষেরও অধিক। চেয়ার টেবিল সাজানো। পাঠের জন্য নীরব পরিবেশ। তবুও গ্রন’গারবিমুখ শিক্ষার্থীরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, পাঠকক্ষের অধিকাংশ চেয়ার খালি পড়ে আছে। হাতেগোনা ১৫ থেকে ২০ জন শিক্ষার্থী বিভিন্ন কোণায় পড়ালেখা করছেন। কয়েকজন লাইব্রেরি কর্মকর্তা অলস সময় কাটাচ্ছেন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায়ও একই অবস’া। এদিকে বই ধার নেয়ার অবস’াও খুব নগন্য। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার। এর মধ্যে আবাসিক হলগুলোতে অবস’ানকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ছয় হাজার।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সাদিয়া তুন নেসা উপমা বলেন ‘আসলে লাইব্রেরি থেকে বই নেয়া জটিল ও সময়সাপেক্ষ। ভিতরে নোট খাতা ও বই নিয়ে প্রবেশ করা যায় না। আবার অনেক সময় কম্পিউটার ক্যাটালগে বই থাকলেও শেলফে পাওয়া যায় না। তাই এতো বিড়ম্বনার কারণে লাইব্রেরিতে যেতে ইচ্ছা করে না।’
উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মাসুম বিল্লাহ বলেন, ‘লাইব্রেরিতে নেই কোনো এসি। কিছু পাখা থাকলেও সেগুলোর অচলাবস’া। তীব্র গরমের মধ্যে পড়ালেখার পরিবেশ থাকে না। এছাড়া প্রায় সময়ে একাডেমিক বই খোঁজ করলে পাওয়া যায় না।’
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী রেজাউল ইসলাম আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘১ম বর্ষ থেকে আমরা ট্র্যাডিশনাল নোটের প্রতি আসক্ত ছিলাম। বিভাগের বড় ভাই-বোনদের নিকট থেকে ট্রাডিশনাল নোট নিয়ে সেগুলো পড়ে পরীক্ষা দিতাম। আমার বিশ্বাস বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সব বিভাগের হাতেগোনা কয়েকজন শিক্ষার্থী ছাড়া সবাই আমার মত ট্র্যাডিশনাল নোট পড়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। ফলে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি থাকে অনেকটা শিক্ষার্থীশূন্য।’
লাইব্রেরি সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত লাইব্রেরিতে শিক্ষার্থীদের উপসি’তি ছিল চোখে পড়ার মতো। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি বিভাগের বই ক্রয় হতো কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির অধীনে। সেই সময় শিক্ষার্থীরা তাদের নিজ নিজ বিভাগের রেফারেন্স বই পেতো লাইব্রেরিতে। কিন’ ২০০০ সালের পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন নিয়ম করে দেয় প্রতিটি বিভাগ তাদের প্রয়োজনীয় প্রতিটি বইয়ের দুই কপি ক্রয় করে এক কপি কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে পাঠাবে ও অপর কপি বিভাগের সেমিনারে রাখবে। কিন’ এই নিয়ম অগ্রাহ্য করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগ এখন প্রতিটি বই এক কপি করে ক্রয় করে নিজেদের সেমিনারেই রাখে। এ কারণে এখন আর লাইব্রেরিতে শিক্ষার্থীদের বিভাগের রেফারেন্স বই পাওয়া যায় না। ফলে শিক্ষার্থীদের কাছেও লাইব্রেরির গুরুত্ব কমে গেছে।
লাইব্রেরির শিক্ষার্থী রেজিস্ট্রির দায়িত্বে থাকা এক কর্মকর্তা সুপ্রভাতকে বলেন, ‘আগে প্রতিদিন কমপক্ষে ৪০০ থেকে ৫০০ শিক্ষার্থী উপসি’ত হতেন লাইব্রেরিতে। ২০০০ সালের পর থেকে কমে গেছে এই সংখ্যা। এখন সেই রিডিং রুমে শিক্ষার্থীর উপসি’তি ১৫০-১৬০ জন।’
লাইব্রেরির রিডিং রুম রেজিস্ট্রি খাতা সূত্রে জানা যায়, জানুয়ারি মাসে প্রতিদিনের শিক্ষার্থী উপসি’তির গড় সংখ্যা ১৫০-২০০ জন। এ মাসের শুরুর দিকে সেই সংখ্যা একই রকম।
গ্রন’গার বিমুখতার কারণ সম্পর্কে ভারপ্রাপ্ত লাইব্রেরিয়ান এ কে এম মাহফুজুল হক সুপ্রভাতকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার অভ্যাস দিন দিন কমে যাচ্ছে। এতোই কমছে যে, আগামীতে লাইব্রেরিতে শিক্ষার্থীই পাওয়া যাবে কিনা সেই আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া জীবনযাত্রার ধরন পরিবর্তন হওয়ায় প্রাইভেট-টিউশন, ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কাটে শিক্ষার্থীদের সময়।’
লাইব্রেরিতে পড়ার পরিবেশ সমস্যা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমাদের বাজেটের অর্থ দিয়ে লাইব্রেরির পর্যাপ্ত অবকাঠামো উন্নয়ন সম্ভব নয়। তার পরেও ভিসি স্যারের আন্তরিকতায় শিক্ষার্থীদেরকে সুন্দর পড়ার পরিবেশ উপহার দিতে লাইব্রেরিতে বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হচ্ছে।