আমরা তোমাদের ভুলব না

চট্টগ্রাম শহরে পাকসেনাদের আতঙ্ক ছিলেন ৩ পুলিশ কর্তা

মোহাম্মদ রফিক

স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় চট্টগ্রাম শহরে পাক হানাদার বাহিনীর হাতে শহীদ হওয়া পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন তৎকালীন পুলিশ সুপার (এসপি) এম শামসুল হক, কোতোয়ালি থানার ওসি আবদুল খালেক, দামপাড়া পুলিশ লাইনের তৎকালীন আর আই (রিজার্ভ ইন্সপেক্টর) আকরাম আলী । শত্রুর মোকাবেলা করে দেশের স্বাধীনতার জন্যে আত্মোৎসর্গকারী অসম সাহসী তিন শহীদ পুলিশ কর্মকর্তা তাঁরা।
সংসদ অধিবেশন স’গিত করার প্রতিবাদে ২ মার্চ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ধর্মঘটের ডাক দেয়া হয়। ধর্মঘট চলাকালে ঢাকায় সশস্ত্র বাহিনীর গুলিতে বহু হতাহত হয়। প্রতিবাদে ৩ মার্চ জয় বাংলা স্লোগানে একটি মিছিল বের হয় চট্টগ্রামে।
মিছিলটি বিহারী অধ্যুষিত ওয়্যারলেস কলোনি এলাকায় পৌঁছা মাত্রই মিছিলকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ হয়। পার্শ্ববর্তী বাঙালি বস্তিগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে কয়েকজন বাঙালিকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়। খবর পেয়ে ঘটনাস’লে ছুটে যান চট্টগ্রামের তৎকালীন এসপি এম শামসুল হক। তিনি সেখানে গিয়ে দেখলেন পাক বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সেনা সদস্য। পাক সেনারা ১৫০জন বাঙালিকে আটক করে। তাদেরকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করতে একজন পাক মেজরের প্রতি আহ্বান জানান এসপি। কিন’ মেজর এসপি’র কথা না শুনে পাক সেনাদের দিয়ে বাঙালিদের নিয়ে যান ক্যান্টনমেন্টে। ৪ মার্চ বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করে পুলিশ ও ইপিআর বাহিনী নিয়ে ওয়্যারলেস কলোনি এলাকায় যান শামসুল হক। ১৪৫ জন বিহারিকে আটক করে কারাগারে পাঠিয়ে দেন তিনি। এক পর্যায়ে এসপির সাথে আপোষ করতে বাধ্য হন পাক মেজর। পাক সেনারা আটক বাঙালিদের ছেড়ে দেয়। অপরদিকে এসপিও কারাগার থেকে বিহারিদের ছেড়ে দেন। ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ভাষণে স্বাধীনতা সংগ্রামের ঘোষণা দিলে সারাদেশে শুরু হয় গণআন্দোলন।
৮ মার্চ শহরের গুরুত্বপূর্ণ স’ানে পুলিশ মোতায়েন করেন এসপি শামসুল। ২১ মার্চ রাতে নগরের আন্দরকিল্লার সব বন্দুকের দোকানের তালা খুলে দেন তিনি। ছাত্রনেতাদের হাতে তুলে দেন অস্ত্র। একই রাতে রাইফেলস ক্লাব, কোর্টবিল্ডিং লকার, আইস ফ্যাক্টরি রোডের রেলওয়ে গোডাউনে রাখা অস্ত্র সংগ্রহ করে দামপাড়া পুলিশ লাইনে মজুত রাখেন এসপি। চার হাজার বাঙালি পুলিশ নিয়ে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে অবস’ান নেন তিনি। ২৪ মার্চ চট্টগ্রাম শহরের অবস’া থমথমে। পাকসেনাদের মোকাবেলায় প্রস’ত থাকেন এসপি শামসুল। শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করেন তিনি। ঐক্যবদ্ধ করেন ছাত্র-জনতা ও শ্রমিকদের।
একই রাতে বর্তমান সিডিএ মার্কেট এলাকার পুলিশ ফাঁড়ি থেকে বাঙালি পুলিশ সদস্যদের নিয়ে আসেন দামপাড়ায়। তাদের প্রতিরোধ যুদ্ধে পাঠিয়ে দেন এসপি শামসুল। ২৫ মার্চ রাঙামাটি থেকে চট্টগ্রাম শহরে আনেন ২০ পুলিশ সদস্যকে। তারা দামপাড়া পুলিশ লাইনে কর্মরত তৎকালীন আরআই আকরাম হোসেনের অধীনে অবস’ান নেন।
২৫ মার্চ রাতে হালিশহর ক্যাম্পে গিয়ে পাক সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন ইপিআর অ্যাডজুটেন্ট ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম। বন্দি করেন বিপুল সংখ্যক পাকবাহিনীর সদস্যকে। এদিকে দামপাড়া পুলিশ লাইন থেকে বিদ্রোহ করেন এসপি শামসুল।
২৬ মার্চ ভোরে ক্যান্টনমেন্ট থেকে পালিয়ে আসা বেঙ্গল রেজিমেন্টের ২০০ সদস্য আশ্রয় নেন পুলিশ লাইনে। তাদের হাতে অস্ত্র ও গোলাবারুদ তুলে দেন এসপি। পুলিশ লাইন ও আদালত ভবনের অস্ত্রাগারে রাখা অস্ত্রগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে তুলে দেন এসপি শামসুল। ২৬ মার্চ এসপি শামসুল হকের নির্দেশে পাহাড়তলী ক্যাম্পে অবাঙালি পুলিশের ওপর আক্রমণ করে বাঙালি পুলিশ। এতে অনেক অবাঙালি পুলিশ নিহত হয়।
২৮ মার্চ রাতে দামপাড়া পুলিশ লাইন আক্রমণ করে পাক বাহিনী। যুদ্ধ করতে করতে ভোরে গোলাবারুদ শেষ হয়ে আসে বাঙালি পুলিশের। এসময় এগিয়ে আসেন কোতোয়ালি থানার তৎকালীন ওসি আবদুল খালেকের নেতৃত্বে একদল পুলিশ। কিন’ এক পর্যায়ে ভেঙে পড়ে দামপাড়া পুলিশ লাইনের প্রতিরোধ ব্যবস’া। যুদ্ধরত ৫১জন পুলিশ শহীদ হন। আহত হন অনেকে। পাশাপাশি এ যুদ্ধে এক মেজরসহ ৭ পাক সেনাও নিহত হন। এরপর জীবিত পুলিশ সদস্যদের নিরাপদ স’ানে একত্রিত করে এসপি শামসুল বলেন, ‘আমাদের আত্মরক্ষা ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই। তোমরা যে যেভাবে পার নিজেদের জীবন বাঁচাও।’
এরপর পুলিশ লাইন ত্যাগ করে বাসভবনে চলে যান এসপি। সেখানে পৌঁছামাত্র পাক সেনারা তার বাসায় আক্রমণ করে। এসময় এসপিকে বাঁচাতে সেখানে শহীদ হন ১১ পুলিশ। এরপর এনায়েত বাজারে এক আত্মীয়ের বাসায় পরিবার নিয়ে আত্মগোপন করেন এসপি শামসুল। ১৫ এপ্রিল সকালে ওই বাসায় প্রবেশ করে পাক বাহিনী। তাদের দরজা খুলে দেন এসপি শামসুল নিজেই। এরপর তাকে আটক করে প্রথমে সার্কিট হাউজ, পরে লালদীঘির পাড় সদর দপ্তরে নিয়ে যাওয়া হয়। এসময় এসপির দায়িত্ব পালন করছিলেন এক মেজর। পাক সেনা প্রহরায় ১৫ ও ১৬ এপ্রিল অফিসেই কাটালেন এসপি। ১৭ এপ্রিল তাকে নিয়ে যাওয়া হয় চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে।
এর আগে ১২ এপ্রিল আন্দরকিল্লা থেকে পাক সেনার হাতে ধরা পড়েন দামপাড়া পুলিশ লাইনের আরআই আকরাম হোসেন। ক্যান্টনমেন্টে নেয়ার পর আরআই আকরামকে বন্দি অবস’ায় দেখতে পান এসপি শামসুল। ১৭ এপ্রিল দুই জনকে হাজির করা হয় ইন্টারোগেশন সেলে। বসানো হয় ইলেকট্রিক চেয়ারে। ওইদিনই পাক সেনারা নির্মমভাবে হত্যা করে এসপি শামসুল হক ও আরআই আকরাম হোসেনকে। দুইজনেরই মরদেহের কোনো খোঁজ পায়নি তাদের পরিবারের সদস্যরা। ২০১৩ সালে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন এসপি শামসুল।
স্বাধীনতা যুদ্ধের আরেক লড়াকু যোদ্ধা ছিলেন কোতোয়ালি থানার তৎকালীন ওসি আবদুল খালেক। ২৮ মার্চ রাতে পাক সেনারা কোতোয়ালি থানা দখল করে নেয়। এসময় পশ্চিম মাদারবাড়ির চাচা করম আলীর বাসায় চলে যান ওসি আবদুল খালেক। ১৬ এপ্রিল ওই বাসা থেকে ওসি খালেককে আটক করে পাক সেনারা।
এরপর একটি জিপ গাড়ির সামনে দুইহাত দুইদিকে বেঁধে বিবস্ত্র করে ওসি আবদুল খালেকের বুকের ওপর পাক সেনারা লিখে দেয় ‘কোতোয়ালি ওসি খালেক অ্যারেস্টেড।’ এরপর চলন্ত গাড়িতে ওসি খালেককে মারধর করে পাক সেনারা। পুরো শহর ঘুরিয়ে সন্ধ্যায় কোতোয়ালি থানায় আনা হয় ওসি খালেককে। সারারাত অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ক্যান্টেনমেন্টের জল্লাদ খানায়। ২২ এপ্রিল ওসি খালেকের প্রথমে হাত-পায়ের আঙ্গুল কাটে হায়েনার দল। পরে তার পা কেটে উল্লাস করে তারা। এরপর দুইচোখ উপড়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় বাঙালি জাতির লড়াকু সৈনিক ওসি আবদুল খালেককে। -তথ্য সূত্র মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম শহর