চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ট্রেন কমে গেছে স্বপ্ন কাটা পড়ছে কবে টনক নড়বে প্রশাসনের?

রায়হান উদ্দিন, চবি
dav

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন শাটল ট্রেনে যাতায়াত করছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ২৪ হাজার শিক্ষার্থী। শাটলের আসন সংকটের কারণে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনের ছাদ, দরজা ও ইঞ্জিনের সামনে বসে যাতায়াত করছে। শিক্ষার্থীদের চাপাচাপি ও ভিড়াভিড়িতে হরহামেশায় জ্ঞান হারাচ্ছেন অনেক শিক্ষার্থী। আর এসব ভোগান্তিতে সিট দখলের প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে অনেকে হচ্ছেন মৃত্যুর পদযাত্রী। কাটা পড়ছে কত স্বপ্ন। তবুও যেন টনক নড়ছে না কর্তৃপক্ষের।

বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষার্থী সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে প্রায় ২৪ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছেন। নগরী থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে দুটি শাটল, একটি ডেমু ট্রেন প্রতিদিন ১২ বার যাওয়া আসা করে। প্রতিটি ট্রেনের সঙ্গে মাত্র ৬-৭ টি বগি সংযুক্ত থাকে। যা শিক্ষার্থীর ধারণক্ষমতার তুলনায় খুবই অপ্রতুল। এর মধ্যে একটি থাকে মালবাহী বগি। আগে ছিল ৮ থেকে ৯টি। বর্তমান প্রশাসন দায়িত্ব নেয়ার পর কমে যায় শাটলের বগি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, শাটল ট্রেনের প্রতিটি বগিতে বসার আসন রয়েছে সর্বোচ্চ ৮০ জনের। কিন’ প্রতিদিন যাতায়াত করেন কমপক্ষে ২০০ শিক্ষার্থী। সবচেয়ে বেশি ভিড় হয় শহরগামী দুপুর দেড়টা ও আড়াইটার ট্রেনে। এ সময় বগির ভেতর তিলধারণের জায়গা থাকে না। হাজার হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে অল্পসংখ্যকই ট্রেনে বসতে পারে। তাই বাধ্য হয়ে অন্যদের দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। কেউ কেউ বসেন দরজার পাদানিতে। বগির ভেতরে বসার সুযোগ না পেয়ে অনেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনের ছাদেই ওঠে পড়েন। তবে বসার সুযোগ পাওয়া শিক্ষার্থীরাও স্বস্তিতে যাতায়াত করতে পারেন না। কারণ দুজনের আসনে চাপাচাপি করে বসতে হয় তিনজনকে। অনেকেই শাটল ট্রেনে আসন না পেয়ে বাধ্য হয়ে সড়কপথে আসা-যাওয়া করছেন। কিন’ এ পথেও স্বস্তি নেই। ৪০-৫০ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে লাগে দেড়-দুই ঘণ্টা।
বিশ্ববিদ্যালয়গামী বেসরকারি বাসগুলো বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত না যাওয়ায় হাটহাজারীর এক নম্বর গেট থেকে সিএনজিতে যেতে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মূলফটক পর্যন্ত। যার জন্য জনপ্রতি গুণতে হয় অতিরিক্ত আরো ছয় টাকা। তাই শাটলে জায়গা না থাকলেও গাদাগাদি করে ভিতরে নতুবা ঝুঁকি নিয়ে ছাদে বা ইঞ্জিনের সামনে বসে যাতায়াত করেন শিক্ষার্থীরা। ফলে শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগের পাশাপাশি ঘটছে নানা দুর্ঘটনাও। সর্বশেষ গত বুধবার সমাজতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী রবিউল ইসলাম শাটল ট্রেনে কাটা পড়ে দু’পা হারান। এর আগে শাটলের দরজা থেকে পড়ে দুশিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় সিট ধরতে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন।
১৯৮৪ সালে চালু হওয়ার পর থেকে ক্রমেই এসব সমস্যা সঙ্গী হয়ে উঠেছে শাটল ট্রেন যাত্রীদের। দীর্ঘদিন ধরে এসব সমস্যা সমাধানের জন্য শিক্ষার্থীরা দাবি জানিয়ে আসছে। ডাবল ও ঝুঁকিমুক্ত রেললাইন, উন্নতমানের ও প্রয়োজনীয় বগি সংযোজন ইত্যাদি দাবি থাকলেও আলোর মুখ দেখছে না একটিও।
শাটলের বগিবৃদ্ধির ব্যাপারে অভিযোগ করে সুমাইয়া নওমি নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘বগি কম থাকার কারণে প্রতিদিন আমাদের ছেলেদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করে ট্রেনে চলাচল করতে হচ্ছে। অনেকে সিট ধরার প্রতিযোগিতায় নেমে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। যদি প্রশাসন বগিবৃদ্ধি কিংবা ডাবল রেললাইনের ব্যবস’া করতো, তাহলে হয়তো এ রকম কষ্ট করে আমাদের যাতায়াত করতে হতো না।’
সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী আনিচুর রহমান বলেন, ‘সম্প্রতি শিক্ষকদের জন্য এসি বাস দিয়েছে কতর্ৃৃপক্ষ। কিন’ প্রশাসন শিক্ষার্থীদের জন্য কী দিয়েছে? আমরা প্রতিদিন পণ্য হিসাবে ক্যাম্পাসে যাতায়াত করি। আমরা এসি বাস চাই না। নিরাপদ শাটল চাই।’
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, গত ৪ এপ্রিল সিআরবিতে অবসি’ত বাংলাদেশ রেলওয়ের সম্মেলন কক্ষে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সাথে এক জরুরি সভা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এতে শাটল ট্রেন বৃদ্ধি, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও বগি সংস্কারসহ ৬টি দাবি জানানো হয় চবি প্রশাসনের পক্ষ থেকে। সভায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নতুন এক জোড়া শাটল ট্রেন বৃদ্ধির ব্যাপারে অনুরোধ করে। যা সংশ্ল্লিষ্ট বিভাগ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আশ্বাস দেয়।
সমস্যার কথা স্বীকার করে প্রক্টর আলী আজগর চৌধুরী বলেন, ‘শাটল ট্রেন বৃদ্ধি, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও বগি সংস্কারসহ ৬টি দাবি নিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সাথে কয়েক দফা আলোচনা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কিছু সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়ে বাস্তবায়নের কাজ চলছে। আশা করি, খুব দ্রুত সময়ে সকল সমস্যা নিরসন সম্ভব হবে।’