চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনাপর্ব ও আড্ডাপ্রিয় হায়াৎ ভাই

শামসুল হোসাইন
hayat-mamud-cover

হায়াৎ ভাইয়ের আশি বছরে আমাদের অনেক আনন্দ। তাঁর নিজের সার্বক্ষণিক বাসও আনন্দ ভুবনে। ২ জুলাই সকাল বেলায় তাঁকে ফোন করতেই অপর প্রান্ত থেকে ভেসে এল সেই অনাবিল হাসির তরুণ উচ্ছ্বাস। ভরে গেল মনটা। তাঁর সঙ্গ সব সময় আনন্দময়। ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দের ৪ জানুয়ারি তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন – তখন আমরা প্রথম ব্যাচের ছাত্র। আমি পড়তাম ইতিহাস। প্রাথমিক অবস্থায় ছোট পরিসরের ক্যাম্পাস, চারটি বিভাগ, শ’দুয়েক ছাত্রছাত্রী, সাতজন শিক্ষক ও অল্প কয়জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়ে যাত্রা শুরু করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলা বিভাগের সূচনা পর্বের একজন শিক্ষক হায়াৎ মামুদ। ক্যাম্পাসটা ছিল বিরান। বিশাল এক টিলার উপর তিনটে ছোট ছোট একতলা ভবন, আর একটি দোতলা নির্মাণাধীন। পাহাড়ের নিচে তিনটি আধাপাকা লম্বা ঘরের দুটিতে দশটি করে কক্ষ এবং প্রত্যেক কামরায় তিন জন করে ছাত্রের থাকার ব্যবস্থা আর একপাশে গোসলখানা। পশ্চিম পাশের ঘরে কমন রুম, ডাইনিং হল এবং পাকঘর। উত্তর পাশের লম্বা ঘরটির দশটি কক্ষের সর্বপশ্চিমের কক্ষটিতে ছিল নামাজ পড়ার ব্যবস্থা এবং লাগোয়া একটি কক্ষে ওয়ার্ডেনের কার্যালয়। উত্তরে দূরের একটি টিলায় কয়েকজন শিক্ষকের বাসস্থান। রাত হলে অনেক নিয়ন বাতির আলোয় প্রাকৃতিক নির্জনতা আরও গভীর হয়ে উঠত। তৎকালের বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসর এত ছোট যে বর্ণনা এখানেই শেষ, তবে এর শৈল আবহ একটা উন্নত রিসর্ট-এর মত। সত্যিকার পড়ালেখার জায়গা।
প্রথম পর্বের ক্লাশ চলাকালেই তৎকালীন গ্রন্থাগার ভবনের পেছনে একটু হেঁটে গিয়ে পাহাড়ের অর্ধেক ঢালে তৈরি হয়ে যায় ছাত্রদের মনোরম ক্যাফেটেরিয়া। আমার ধারণায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থপতি মাযহারুল ইসলামের সবচেয়ে মনোরম নির্মাণ ছোট এই স্থাপনাটি। পেনসিলভেনিয়ার মিলরানে স্থপতি ফ্রাংক লয়েড রাইটের ’ফলিং ওয়াটার’ নামের বিখ্যাত স্থাপত্যকীর্তির আদল খুঁজে পাওয়া যায় এতে, ভবনের তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত ঝরনাধারা ছাড়া। এখানে অনেক সুন্দর বিকেল ও সন্ধ্যার স্মৃতি জমা আছে আমাদের। নিটোল আড্ডার স্মৃতি। সমকালের জোবরা গ্রাম অনাবিল প্রকৃতি নিয়ে মোহময়তায় ধরা দিত এখানে। আমরা হারিয়ে যেতাম। সবুজের মাঝে পাহাড়ের আধেক গায়ে ঝুলে থাকা কাঁচঘেরা দালানের লাগোয়া প্রশস্ত বারান্দাটি আড্ডা দেয়ার মোক্ষম জায়গা। মনে হচ্ছে এখনই চলে যাই। আমাদের কয়েকজন সুধাসন্ধানী সতীর্থ রাত হলেই এখানে ‘মৃত …’-এর আসর জমাতেন, হাটহাজারির এক দোকানে পাওয়া যেত এই অমৃত। ছোট বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও সঙ্কুলান হয়ে যেত এর হল ঘরে।
সেই আদিকালে ছাত্রছাত্রী-শিক্ষক মিলে নিরন্তর কর্মকাণ্ডে আমাদের অহরহ ব্যস্ত-সময় সত্যিকার বর্ণাঢ্য। ১৯৬৭-৬৮-র অ্যাকাডেমিক বর্ষটি ছিল দম ফেলার ফুরসতহীন কাল। ইতিহাস পত্রিকার পরপর পাঁচটি সংখ্যা প্রকাশনার কাজে করিম স্যারের সহযোগী হওয়ার দুর্লভ সুযোগ, আলাওল হল বার্ষিকী সম্পাদনা, উইনিভার্সিটি টাইমস সম্পাদনা এবং একুশের সংকলন সুর্য তোরণ সম্পাদনায় নিমগ্ন আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন আনন্দমুখর।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসটি পর্যায়ক্রমে ‘ফার্স্ট হল অব রেসিডেন্স’ এবং শেষে ‘আলাওল হল’ নামাঙ্কিত হয়। ছাত্রাবাস ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের শিক্ষা এবং শিক্ষানুষঙ্গী কার্যক্রমে আমরা একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ লাভ করি। ১৯৬৭-৬৮ খ্রিষ্টাব্দে আলাওল হল ইউনিয়ন প্রথম বারের মতো গঠিত হলে দায়িত্ব পেয়েছিলাম বার্ষিকী সম্পাদকের। বার্ষিকীটি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের প্রথম দাপ্তরিক প্রকাশনা। এই সংকলনে মোট প্রকাশিত আঠারোটি লেখার মধ্যে বাংলা বিভাগের শিক্ষক ছাত্রছাত্রীদের রচনা এগারোটি। রচয়িতা, শিক্ষকদের মধ্যে সৈয়দ আলী আহসান, মনিরুজ্জামান (চট্টগ্রাম কলেজে আমাদের শিক্ষক ছিলেন, পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছিলেন; হায়াৎ মামুদের আসল নামও মনিরুজ্জামান), দিলওয়ার হোসেন, মোহাম্মদ আবু জাফর ও মাহবুব তালুকদার এবং ছাত্রদের মধ্যে হারুন রশিদ তালুকদার, আবুল কাশেম সন্দ্বীপ, নীলুফার খানম, চৌধুরী জহুরুল হক, শাহেদা খান ও দানীউল হক। আমার প্রবন্ধটির শিরোনাম ছিল ‘আড্ডা সমাচার’। দৈনিক আজাদী পত্রিকায় আলাওল হল বার্ষিকী সম্পর্কে আলোচনা করেছিলেন সম্পাদক মোহাম্মদ খালেদ আর ঢাকার পাকিস্তান অবজার্ভার পত্রিকায় আলোচক ছিলেন মোবারক মোল্লা।
দ্বিতীয় শিক্ষাবর্ষে ছাত্র-রাজনৈতিক সংগঠনগুলো নতুন ক্যাম্পাসে আত্মপ্রকাশ করতে শুরু করে একুশে ফেব্রুয়ারি বা শহিদ দিবস উদযাপনকে কেন্দ্র করে। এ সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার উদ্যোগে ‘সূর্য্য তোরণ’ শিরোনামে একটি একুশের সংকলন প্রকাশিত হয়। সংকলনটির সম্পাদক ছিলাম আমি ও বাংলা বিভাগের ছাত্রী বাসন্তী সর্ববিদ্যা।
সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সূত্রে বাংলা বিভাগের শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের অনেকের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে উঠে। চট্টগ্রাম কলেজে আমাদের কয়েকজন বাংলার শিক্ষক পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছিলেন, এই কলেজে বাংলা অনার্স শেষ করে আমাদের সহপাঠী কয়েকজন বন্ধুও এম. এ. শেষ পর্বে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সূচনা-পর্বে শিক্ষক হিসেবে অনেক গুণীজনের সমাবেশ ঘটেছিল বাংলা বিভাগে – প্রফেসর সৈয়দ আলী আহসান, ড. আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ, ড. আনিসুজ্জামান, ড. আবদুল আউয়াল, ড. আবদুল কাইয়ুম, ড. হায়াৎ মামুদ, ড. মনিরুজ্জামান, ড. দিলওয়ার হোসেন, ড. শাহমুদ শাহ কোরাইশী, অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু জাফর, অধ্যাপিকা রাজিয়া সুলতানা ও অধ্যাপক মাহবুব তালুকদারের নাম মনে পড়ছে এখন। মুক্তিযুদ্ধের পড়ে ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল রাজশাহী থেকে চট্টগ্রামে এসে গেলে বাংলা বিভাগের ষোলকলা পূর্ণ হয়। ছাত্র থাকা কালেই বাংলা বিভাগের ক্লাশে ঢুকে পড়ে পেছনের বেঞ্চে বসে বক্তৃতা শুনেছি। এরকম মুনির চৌধুরী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এলে বাংলা বিভাগে তাঁর বিশেষ ক্লাশে যোগ দিয়েছি।
’বাংলা সাহিত্য সমিতি’ নামে একটি গবেষণা পরিষদ গঠনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে একটি অনন্য কার্যক্রমের সূত্রপাত হয়। পাণ্ডুলিপি শিরোনামে গবেষণা পত্রিকা এবং অন্যান্য গবেষণাপত্র প্রকাশ করে এই পরিষদ সুনাম কুড়োয়। গবেষণা উপকরণ সমৃদ্ধ করতে প্রাচীন পাণ্ডুলিপি সংগ্রহের কর্মসূচিও ছিল এই বিভাগে। ’বাংলা সাহিত্য সমিতি’-র একজন সহযোগী সদস্য হয়ে আমি এর অনেক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেছি।
শিক্ষক-কর্মকর্তাদের জন্য নির্মিত অল্প কয়েকটি ফ্ল্যাটে সকলের স্থান-সঙ্কুলান সম্ভব না হওয়ায় অনেক শিক্ষক শহরে বসবাস করতেন, বাংলা বিভাগের প্রথম শিক্ষক আবুল কালাম মনজুর মোরশেদের বাসা ছিল মেহেদিবাগ এলাকায় শহিদ মির্জা লেনে। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক এই শহিদ মির্জা লেনে বাসা করে থেকেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েই হায়াৎ মামুদ থাকতেন হাটহাজারিতে, পরে তিনিও চলে আসেন শহিদ মির্জা লেনে। এখানে তাঁর বাসার ছাদে বৈকালিক আড্ডার স্মৃতি স্মরণে আসছে। দেবুদা (শিল্পী দেবদাস চক্রবর্তী), বশীর ভাইও (শিল্পী মুর্তজা বশীর) তখন শহিদ মির্জা লেনে থাকেন। এখানে একটা মেস করে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক ওবায়দুল কাদের, পরিসংখ্যানের হাতেম আলী হাওলাদার এবং প্রাণীবিদ্যার রোনাল্ড পাত্রও বসবাস করতেন। আমাদের বাসা মেহেদিবাগের মাঝামাঝি এলাকায়, বর্তমান গার্মেন্টসের গলিতে ‘পুতুল ভিলা’-য়। এ বাসাতেই একখানা সেল্ফ পোর্ট্রেট এঁকে আমাকে উপহার দিয়েছিলেন বশীর ভাই। অনুপমদা (ড. অনুপম সেন) এসে আড্ডায় যোগ দিলে স্থান বদলে খাওয়ার আসর বসতো কোনো রেস্টুরেন্টে । হায়াৎ ভাই ও অনুপমদা গলায় গলায় বন্ধু। বাংলা বিভাগের শিক্ষক মোহাম্মদ আবু জাফর ও সিটি কলেজের শিক্ষক সেলিম আহমেদও শরিক হতেন এসব আড্ডায়।
মুক্তিযুদ্ধের পরে হায়াৎ মাহমুদ একবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। সেসময় তিনি শহর ছেড়ে থাকছিলেন ক্যাম্পাসের বাসায়। শিক্ষক সমিতির কার্যক্রম সাংস্কৃতিক বর্ণাঢ্যতায় ঝলমল করছিল তখন সেমিনার, নানা মাত্রিক প্রদর্শনী, আলোচনা চক্রে। বিজ্ঞান গ্যালারিতে প্রথম দেখেছিলাম সত্যজিতের তথ্যচিত্র ‘রবীন্দ্রনাথ’। ১৯৭৩-এ হায়াৎ মামুদ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে যান। হায়াৎ ভাই একজন দক্ষ সংগঠক ও সংস্কৃতিকর্মী এবং আড্ডারু। হায়াৎ মামুদ নামেই আছে এক বনেদি মদিরতা-আমাদের বন্ধনডোর। জন্মদিনে তাঁকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা। তাঁর অনাবিল হাসি চিরজীবী হোক।