চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় অর্ধ শতাব্দী পেরিয়ে

কামরুন নাহার সানজিদা
11054343_10202848686336539_

বনবিদ্যার চারপাশের রূপময় প্রকৃতি নিজেকে সাজিয়ে বারো মাসই জীবন্ত ছবি হয়ে থাকে যে বিশ্ববিদ্যালয়, তার নাম চট্টগ্রাম
বিশ্ববিদ্যালয়। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার স্বপ্ন দেখা লাখো শিক্ষার্থীর মনে জাগে সবুজ প্রকৃতি আর শান্তির ছবি। দেশ-বিদেশে নেতৃত্ব দিয়ে যাওয়া দেশের অনেক কৃতীসন্তানের পীঠস’ান এই বিশ্ববিদ্যালয়। আজকের দিনে অর্ধ শতাব্দী পার করলো এ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়।
সবুজ পাহাড়ে ঘেরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশপথকে বলা হয় ‘দ্য ওয়ে টু দ্য হ্যাভেন’। সত্যিকার অর্থেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপূর্ব লীলাভূমি এ ক্যাম্পাস। ষড়ঋতুর পালাবদল হৃদয় দিয়ে অনুভব করা যায় এ ক্যাম্পাসে। মূল শহরে যখন যান্ত্রিক ব্যস্ততা, তখন প্রকৃতির সাথে একাকার হয়ে ক্লাস করে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা।
পৃথিবীতে একমাত্র চবিতেই রয়েছে শাটল ট্রেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ বলা হয় শাটলকে। চবি শিক্ষার্থীদের এক অনবদ্য ও অপরিহার্য অংশ শাটল ট্রেনে ভ্রমণ। এর বগিতে গান করে অনেকেই হয়েছে বিখ্যাত গায়ক। শাটলের চলতি পথে অনুভবে গেঁথে যায় মানুষের বিচিত্র জীবনাচার আর অপরূপ প্রকৃতি।
চট্টগ্রাম শহর থেকে ২২ কিলোমিটার উত্তরে হাটহাজারী থানার ফতেপূর ইউনিয়নের জঙ্গল পশ্চিম-পট্টি মৌজার ১৭৫৩.৮৮ একর পাহাড়ি ভূমিতে অবসি’ত দেশের তৃতীয় বৃহৎ এই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৬৬ সালের ১৮ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের।
বাংলাপিডিয়ার সূত্রমতে, বিশ শতকের প্রথম থেকেই চট্টগ্রামের বিদ্বৎসমাজ স’ানীয়ভাবে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন অনুভব করছিল। ১৯৪০ সালের ২৮ ডিসেম্বর কলকাতায় অনুষ্ঠিত জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সর্বভারতীয় সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে মওলানা মুনিরুজ্জামান ইসলামবাদী চট্টগ্রামে একটি ‘ইসলামিক ইউনিভার্সিটি’ নির্মাণের কথা উল্লেখ করেন এবং এ লক্ষ্যে তিনি চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার দেয়াং পাহাড়ে ভূমিও কিনেন। ১৯৪২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি নূর আহমদ বঙ্গীয় আইন পরিষদে চট্টগ্রামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক দাবি উত্থাপন করেন।
পাকিস্তানের দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (১৯৬০-১৯৬৫) প্রণয়নকালে চট্টগ্রামে একটি ‘বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়’ স’াপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের স’ান হিসেবে শহরের কেন্দ্রে অবসি’ত চট্টগ্রাম সরকারি কলেজকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্ভাব্য ক্যাম্পাস হিসেবে নির্বাচিত করা হয়।
১৯৬৩ সালের ২৯ নভেম্বর ফজলুল কাদের চৌধুরী পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের স্পিকার মনোনীত হন। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের অনুপসি’তিতে ১৯৬৩ সালের ১২ ডিসেম্বর মন্ত্রিসভার বৈঠকে সভাপতিত্বকালে ফজলুল কাদের চৌধুরী কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী এ টি এম মোস্তফাকে পূর্ব-পাকিস্তানের তৃতীয় বিশ্ববিদ্যালয়টি চট্টগ্রামে স’াপনের প্রয়োজনীয় ব্যবস’া গ্রহণের নির্দেশ দেন। ১৯৬৪ সালের ৯ মার্চ তাঁর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক কাউন্সিলের বৈঠকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ মঞ্জুর করা হয়।
এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এম. ওসমান গণিকে চেয়ারম্যান এবং ড. কুদরাত-এ-খুদা, ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ, এম ফেরদৌস খান ও ড. মফিজউদ্দীন আহমদকে সদস্য করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স’ান নির্বাচন কমিশন’ গঠন করা হয়। কমিশন সরেজমিন পর্যবেক্ষণ করে হাটহাজারী উপজেলার ফতেপূর ইউনিয়নের জঙ্গল পশ্চিম-পট্টি মৌজার নির্জন পাহাড়ি ভূমিকে প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের স’ান হিসেবে সুপারিশ করে। ১৯৬৪ সালের ১৭-১৯ জুলাই অস’ায়ী প্রেসিডেন্ট ফজলুল কাদের চৌধুরীর সভাপতিত্বে ইসলামাবাদে জাতীয় অর্থনৈতিক কাউন্সিলের সভায় ‘স’ান নির্বাচন কমিশন’-এর সুপারিশের ভিত্তিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় স’াপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত এবং এ সংক্রান্ত চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। ১৯৬৪ সালের ২৯ আগস্ট পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ূব খান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স’াপন করেন।
১৯৬৫ সালের ৩ ডিসেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাস বিভাগের প্রফেসর ও বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামের প্রাক্তন কিউরেটর ড. আজিজুর রহমান মল্লিককে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘প্রকল্প-পরিচালক’ নিযুক্ত করা হয়। স’পতি মাজহারুল ইসলামের ‘বাস’কলা’ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করা হয়। প্রাথমিকভাবে একটি দ্বিতল প্রশাসনিক ভবন, বিভাগীয় অফিস, শ্রেণিকক্ষ ও লাইব্রেরির জন্য একতলা ভবন তৈরি করা হয়। শিক্ষক ও ছাত্রদের আবাসনের ব্যবস’াও করা হয়। বর্তমানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের জন্য পাঁচটি আবাসিক হল ও ছাত্রীদের জন্য তিনটি আবাসিক হল রয়েছে। এছাড়া বঙ্গবন্ধু হল ও শেখ হাসিনা হলসহ সনাতন ধর্মাবলম্বী ছাত্রছাত্রীদের জন্য চারটি আবাসিক হলের নির্মাণ কাজ চলছে।
১৯৬৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে ড. এ আর মল্লিককে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৯৬৬ সালের ১৮ নভেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্বোধন করেন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর আব্দুল মোনেম খান। প্রথমে কলা অনুষদের অন্তর্গত বাংলা, ইংরেজি, ইতিহাস ও অর্থনীতি বিভাগে ২০০ জন শিক্ষার্থী এবং ৭ জন শিক্ষক নিয়ে ১৯৬৬ সালের ২৮ নভেম্বর এম এ প্রথমপর্ব (প্রিলিমিনারি) ক্লাস শুরু হয়।
গত বছর সুবর্ণজয়ন্তী পালন করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। লাখো প্রাক্তন শিক্ষার্থীর পদচারণায় আবারো মুখরিত হয়েছিলো প্রাণের ক্যাম্পাস। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি স’ানে জড়িয়ে আছে ক্যাম্পাস জীবনের হাজারো স্মৃতি। জারুলতলা, কলার ঝুপড়ির আড্ডা, হলজীবনের মুহূর্তগুলো আর মউয়ের দোকানের স্মৃতি জেগে উঠেছিলো ক্ষণে ক্ষণে। একে অপরকে জড়িয়ে ধরে বাঁধভাঙা খুশির উচ্ছাস ঝড়ে পড়ে প্রত্যেকের কণ্ঠে। বান্ধবীর হাত ধরে কেন্দ্রীয় মাঠটা চক্কর দিয়ে যেন ফিরে গেলেন সেই মুহূর্তগুলোতে। আর বলছিলেন, ‘আবার দেখা হবে তো?’
আজকের দিনটিতে অর্ধ শতাব্দী পেরোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনকে উদযাপনে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার কামরুল হুদা সুপ্রভাতকে জানান, সকালে বঙ্গবন্ধু চত্বরে জমায়েত হবে সবাই। সেখানে জাতির পিতার প্রতি সম্মান জানিয়ে পুষ্পমাল্য অর্পণ করা হবে। এরপর শোভাযাত্রা বের করা হবে। পরে বিবিএ ফ্যাকাল্টির মিলনায়তনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। কাটা হবে কেক। সেখানে উপাচার্য প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী, উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. শিরীণ আখতার, সিন্ডিকেট সদস্যবৃন্দ, অনুষদসমূহের ডিনবৃন্দ, শিক্ষক সমিতি, কর্মকর্তা-কর্মচারী সমিতি, বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যরা উপসি’ত থাকবেন। আলোচনা সভা শেষে একটি সাংস্কৃতির অনুষ্ঠান পরিবেশিত হবে। সকল কর্মসূচিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অংশ নিতে পারবেন।