চট্টগ্রাম-দোহাজারী ট্রেনের সংখ্যা বাড়াতে হবে

কানু কুমার দাশ

নগর পরিকল্পনায় একটা শহরের উন্নয়নে উপশহর এর সাথে টেকসই যোগাযোগ অত্যনত্ম গুরম্নত্বপূর্ণ । এই ড়্গেত্রে রেল পরিবহনের ভূমিকা সর্বাগ্রে।
চট্টগ্রাম শহরের সাথে ব্রিটিশ আমল থেকে দড়্গিণে দোহাজারী পর্যনত্ম, উত্তরে নাজিরহাট ও মিরসরাই (ঢাকা চট্টগ্রাম মেইন লাইন) রেল যোগাযোগ ছিল। এই যোগাযোগ অনত্মর্ভুক্ত ছিল পটিয়া, বোয়ালখালী, চন্দনাইশ, হাটহাজারী, নাজিরহাট, সীতাকু-, মিরসরাই উপশহরসমূহ। সেই সময়ের তাগিদে নির্মিত রেললাইন উত্তরোত্তর বৃদ্ধি না পেয়ে বিভিন্ন সময় তা আরও সংকুচিত হয়েছে। চট্টগ্রাম যদি প্রধান শহর হয় তা হলে তার উপশহরের সাথে তার যোগাযোগ হতে হবে নিবিড়। সেড়্গেত্রে বাংলাদেশের মত জনবহুল ও নদীমাতৃক দেশে তা হওয়ার কথা প্রধানত নৌ ও রেলপথ কেন্দ্রিক। আর সড়ক যোগাযোগ হবে সহায়ক। কিন’ জনবহুল এই দেশে সিংহভাগ যোগাযোগ সড়কের উপর হওয়াতে সড়ক এই বিশাল জনগণের প্রতিদিনকার চাপ নিতে হিমশিম খাচ্ছে। আর প্রতিনিয়ত সন্মুখীন হতে হচ্ছে অসহনীয় যানজটের।
যেখানে উন্নয়নের ধারায় এই রেল পরিসেবা আরও উন্নত হওয়ার দরকার ছিল সেখানে উল্টো ট্রেনের সংখ্যা কমিয়ে ফেলা হয় যার প্রভাব পড়ে সড়ক যোগাযোগের ওপর, ফলে নানাবিধ যোগাযোগ সমস্যা সৃষ্টি হয় ।
সমপ্রতি বর্তমান সরকার নতুন রেল মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি রেলের অবকাঠামোসহ প্রভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধন করেছে কিন’ তারপরেও বৃহৎ জনগোষ্ঠীর এই দেশে তা খুবই অপ্রতুল। তাই প্রতিনিয়ত রেলে ঘাটতি রয়েই যাচ্ছে। কিছু নতুন ট্রেন চালু ও পুরানো ট্রেনে নুতন বগি সংযোগ করার পরেও কোন ট্রেনেই টিকেট খালি থাকে না। তবে এখন ট্রেন অনেক সময়ানুবর্তিতা মেনে চলে এবং নিরাপদ হিসেবে মানুষের প্রথম পছন্দ। এখনও লোকাল ট্রেনের অবস’া তথৈবচ, লোকাল ট্রেনের সংখ্যা অত্যনত্ম কম। আবার যাই আছে, তাতে বগির সংখ্যাও যাত্রীর তুলনায় অনেক কম। অনেক লোকাল রেল লাইন হয় বন্ধ না হয় কোনমতে একখানা ট্রেন চালিয়ে তার অসিত্মত্ব টিকিয়ে রাখা হয়েছিল।
উদাহরণ দোহাজারী লাইন। যেখানে ছয় জোড়া ট্রেন চলাচল করত সেখানে ট্রেন সংখ্যা কমাতে কমাতে মাত্র এক জোড়া । তাও তিন/চার কম্পার্টমেন্টের। তখন অজুহাত ছিল যাত্রীরা টিকেট করত না। কিন’ তখন অনেক স্টেশনে টিকেট দেওয়া হত না। আর টিকেট দেওয়ার লোকও ছিল না। কিন’ সমপ্রতি পুনরায় রেলের উপর উন্নয়নের প্রভাব বাড়ছে। ফলে দোহাজারী ও নাজিরহাট রেললাইন ও স্টেশন সংস্কার করা হয় এবং নাজিরহাট লাইনে লোকাল ও ডেমু ট্রেনসহ ৪ জোড়া ট্রেন চলাচল শুরম্ন করে। গত নভেম্বর থেকে দোহাজারী লাইনে আর এক জোড়া লোকাল ট্রেন চলাচল শুরম্ন করে। যাত্রীরা নিজেরা একটা পরিষদ করে টিকেট চেকিং করা শুরম্ন করে। সে থেকে এই লাইনে প্রতি স্টেশনে আয় অনেক বেড়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ পটিয়া স্টেশনে মাসিক আয় ৮০ হাজার টাকার উপরে পূর্বে এই আয় ১০ হাজারের নিচে থাকত।
কিনত্ম এই দু জোড়া ট্রেন দিয়ে মূল শহরের সাথে উপশহরের যোগাযোগ সম্পূর্ণ হয় না। বর্তমানে একখানা ট্রেন দুইবার আসা যাওয়া করে। আর তাতে মানুষের ভিড় অসহনীয়। বিশেষত নারী ও শিশুদের জন্য তা অত্যনত্ম কষ্টদায়ক। অনেকে ট্রেনে জায়গা না পেয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছাদে যাতায়াত করে। তদুপরি বৃহস্পতিবার বিকালে ও বন্ধের আগে পরে ট্রেনে অনেকে উঠতেই পারে না। তাই এই লাইনে আর একখানা ট্রেন দিয়ে আরও দুইবার আসা-যাওয়া করলে দোহাজারী লাইনের উপশহর বোয়ালখালী, পটিয়া, চন্দনাইশের জনগণ অত্যনত্ম উপকৃত হবে। এই দুই খানা ট্রেন দিয়েই দিনে আট বার (চার জোড়া) ট্রেন দোহাজারী লাইনে চালানো সম্ভব। ট্রেনের সময় অফিসগামী মানুষসহ সকলের কাছে হবে উপভোগ্য। প্রসত্মাবিত সময়সূচি- ট্রেন নং ০১- দোহাজারী ছাড়বে সকাল ৬ টা (প্রধানত অফিসগামী, উপশহর থেকে শহর) চট্টগ্রাম ছাড়বে সকাল ১০ টা ৩০ মিনিটে, দোহাজারী ছাড়বে দুপুর ২ টা, চট্টগ্রাম ছাড়বে বিকাল ৬ টা। ট্রেন নং ০২- চট্টগ্রাম ছাড়বে সকাল ৭ টা (প্রধানত অফিসগামী, শহর থেকে উপশহরে), দোহাজারী ছাড়বে সকাল ১০ টায়, চট্টগ্রাম ছাড়বে দুপুর ২ টা ৩০ মিনিটে, দোহাজারী ছাড়বে বিকাল ৫টা ৩০ মিনিটে।
একটা শহরকে প্রাণবনত্ম করতে হলে তার আশেপাশের উপশহরের সাথে যোগাযোগ হতে হবে সহজ, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী। তাহলে মানুষ শহরের ওপর চাপ না বাড়িয়ে আশেপাশে বিকেন্দ্রীভূত হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও বার বার এই বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলেছেন। সেজন্য পরিকল্পনা ও তার বাসত্মবায়ন দরকার। যেখানে রেললাইন বর্তমান থাকার পরেও তার সর্ব্বোচ্চ ব্যবহার না করে সড়কের উপর চাপ বাড়ানো কোনমতেই কাম্য নয়। শুধু দোহাজারী রেললাইন নয়, সব রেললাইনকে সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হবে। আনত্মঃনগর ট্রেনের পাশাপাশি লোকাল/ডেমু ট্রেন সংখ্যা অনেক বাড়াতে হবে। তাহলে যোগাযোগ ব্যবস’া উন্নয়নের সাথে সাথে আবাসনে বিকেন্দ্রীকরণ সহজ হবে। মানুষ শহর থেকে দূরে থাকতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করবে আবার শহর থেকে দূরে উপশহরসহ গ্রামে নাগরিক সুযোগসুবিধা প্রদানের জন্য চাকুরিরত মানুষও উৎসাহ পাবে। একটি টেকশই উন্নয়নে একটি বিষয়ের সাথে অন্যটি জড়িত, সেইভাবে একটি শহরের সার্বিক উন্নয়নে জনগণকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে বিকেন্দ্রীকরন অত্যনত্ম জরম্নরি। না হলে শহর হয়ে উঠে কংক্রিটে পরিপূর্ণ, আলোবাতাসহীন আবাসন। যেখানে অল্প জায়গায় অনেক লোককে ঠাসাঠাসি করে থাকতে হয়। তাই সামগ্রিকভাবে বিষয়টি বিবেচনা করে রেলযোগাযোগ আরো গতিশীল ও ব্যাপক জনগণের কাছে পৌঁছাতে হবে। তার একটা উদাহরণ হতে পারে চট্টগ্রাম-দোহাজারী প্রসত্মাবিত রেল পরিসেবা।
লেখক : স’পতি ও পরিকল্পনাবিদ
সহকারী অধ্যাপক, স’াপত্য বিভাগ, চুয়েট