চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার কনডেম সেলে ৪৮ আসামি

মোহাম্মদ রফিক

আকতার কামাল। বয়স প্রায় ৭৫। ১৮ বছর ধরে কারাবন্দি তিনি। ২০০৮ সালে এক হত্যা মামলায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনাল। ঘটনাটি ছিল নগরের ডবলমুরিং থানা এলাকার। সেই থেকে ফাঁসির আসামি হয়ে কারাগারের কনডেম সেলে জীবন কাটাচ্ছেন তিনি। সাজা মওকুফের জন্য ২০১৩ সালে সুপ্রিম কোর্টে লিভ টু আপিল করেছিলেন তিনি। লিভ টু আপিল নিষ্পত্তি করে উচ্চ আদালত তার সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন।
জানা গেছে, বর্তমানে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের কনডেম সেলে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি রয়েছেন ৪৮ জন। এরমধ্যে আলোচিত দশ ট্রাক অস্ত্র মামলা, নাজিরহাট কলেজের অধ্যক্ষ গোপাল কৃষ্ণ মুহুরী, বহদ্দারহাট এইট মার্ডার, বৌদ্ধভিক্ষু জ্ঞানজ্যোতি হত্যা মামলার আসামিও রয়েছেন। অধ্যক্ষ গোপাল কৃষ্ণ মুহুরি হত্যা মামলায় দুর্ধর্ষ শিবির ক্যাডার তসলিম উদ্দিন মন্টুকে ২০০৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল। এ রায়ের বিরুদ্ধে করা কারা কর্তৃপক্ষের জেল আপিল এখনো বিচারাধীন।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের ডেপুটি জেলার ফখরুদ্দিন জানান, লিভ টু আপিল নিষ্পত্তি না হওয়ায় কনডেম সেলে বন্দি রয়েছে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ১২ জন আসামি।’ সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে ২০০৫ সাল থেকে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত কোন আসামির রায় কার্যকর হয়নি। মিরসরাইয়ে এক অটোরিকশা চালককে হত্যার প্রায় ১২ বছর পর ২০১৬ সালের ১২ জুলাই মৃত্যুাদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত দুই খুনির ফাঁসি কার্যকর হয় চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে। ফাঁসির দণ্ড কার্যকর হওয়া ওই দুই খুনি হলেন-মিরসরাই উপজেলার উত্তর হাজি সরাই গ্রামের লেদু মিয়ার বাড়ির কামাল উদ্দিনের ছেলে সাইফুল ইসলাম ওরফে শহীদ এবং একই উপজেলার মধ্যম সোনাপাড়া গ্রামের তাজুল ইসলামের ছেলে মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ ওরফে শহীদ। একই মঞ্চে দুই খুনির ফাঁসি রায় কার্যকর করতে কারা কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করেছিলেন জল্লাদ আব্দুল হান্নানের নেতৃত্বে পাঁচ জল্লাদ।
এছাড়া চাঞ্চল্যকর দশ ট্রাক অস্ত্র মামলায় জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন আমীর মতিউর রহমান নিজামীসহ (২০১৬ সালের ১০ মে যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর) ১৪ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন চট্টগ্রামের বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক এস এম মুজিবুর রহমান। এ মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলেন-সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, এনএসআই-এর দুই সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুর রহিম এবং ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফা’র সামরিক শাখার প্রধান পরেশ বড়-য়া সহ ১৪ জন। এর মধ্যে মামলার অপর ৪ আসামি ইতিমধ্যে মারা গেছেন।
কারা কর্মকর্তারা জানান, দশ ট্রাক অস্ত্র মামলাসহ গত ৫ বছরের ব্যবধানে ফাঁসির সাজা হয়েছে ৩৩ জন বন্দির। ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে সর্বকনিষ্ট হলেন-রাঙ্গুনিয়া উপজেলার মধ্যম সৈয়দ বাড়ির ফজল চৌকিদারের ছেলে মো. কামাল উদ্দিন ওরফে জুয়েল। তার বয়স এখন ২৬ বছর। ২০১৩ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। আদিবাসী এক নারীকে ধর্ষণ মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামি বয়সের অনুপাতে জুয়েলের কম। এ রায়ের বিরুদ্ধে জেল আপিল করা হয়েছে বলে জানায় কারা কর্তৃপক্ষ।
জানা গেছে, হত্যা-অপহরণ করে লাশ গুম করা, ধর্ষণসহ জঘন্যতম অপরাধে নিম্ন আদালত থেকে এসব আসামিদের ফাঁসির এ সাজা দেয়া হয়। আইন অনুযায়ী এ সাজা কার্যকর করতে হলে হাইকোর্ট বিভাগের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়।
কারা সূত্র জানায়, ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত কোন আসামি নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল না করলে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে এসব মামলার নিষ্পত্তি করতে হয়। নিম্ন আদালত রায় ঘোষণার পর ওই রায় অনুমোদনের জন্য এ-সংক্রান্ত নথিপত্র পাঠানো হয় উচ্চ আদালতে। যা ডেথ রেফারেন্স হিসেবে পরিচিত।
তবে নিম্ন আদালত মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়ার পর আসামিপক্ষই উচ্চ আদালতে আপিল করেন। এ বিষয়টি হাইকোর্টে আসার পর রাষ্ট্রীয়ভাবে ওইসব মামলার পেপারবুক বিজি প্রেস প্রস’ত করে তা হাইকোর্টে পাঠায়। এরপর তালিকার ক্রম-অনুযায়ী ডেথ রেফারেন্স শুনানির ক্ষমতাপ্রাপ্ত বেঞ্চে পাঠানো হয়। সে অনুযায়ী মামলা নিষ্পত্তি হয়ে থাকে।
আইনজ্ঞরা জানান, কোন ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার পর হাইকোর্টে ওই মামলা বিচারকালের চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন বিচারকেরা। তারা দেখেন, একটু ভুলের জন্য যেন একজন নিরপরাধ মানুষের প্রাণ না যায়। এ চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে গেলে প্রত্যেক সাক্ষীর সাক্ষ্য ভালোভাবে পরীক্ষা করা হয়। এ জন্য একটি মামলার বিচার শেষ হতে বেশ কিছুদিন সময় লাগে। সাধারণ মামলার মতো ডেথ রেফারেন্স শুনানি দ্রুত করার কোনো সুযোগ নেই।