চট্টগ্রামে জাদুঘর আন্দোলনে শামসুল হোসাইন

আনোয়ার আহমেদ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরের প্রদর্শনী দেখছেন দর্শকরা

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরের সাবেক কিউরেটর এবং জোবরা গ্রামীণ জাদুঘর ও আর্কাইভ-এর পরিকল্পক ও পরামর্শক-কিউরেটর, বিশিষ্ট গবেষক ড. শামসুল হোসাইন দীর্ঘদিন ধরে নিরবচ্ছিন্ন, ক্লান্তিহীনভাবে গবেষণা করে চলেছেন চট্টগ্রামের মুসলিম স’াপত্য ও ঔপনিবেশিক স’াপত্য প্রভৃতি বিষয় নিয়ে। চট্টগ্রামে দুটি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার নিপুণ কারিগর হিসাবে এক অনন্য ও বিরল দৃষ্টান্তরূপে নিজেই একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছেন। শামসুল হোসাইনের চারিত্র্যিক বৈশিষ্ট্যের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো প্রবল আত্মবিশ্বাস। তাঁর মেধা ও প্রতিভা সম্পর্কে তিনি আত্মবিশ্বাসী। ফলে জাতীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য গবেষণায়, সংগ্রহ ও সংরক্ষণে তিনি অর্জন করেছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতি। তিনি সদা মৃদুভাষী, পরম সজ্জন, গভীর রসবোধ সম্পন্ন ও অত্যন্ত হৃদয়বান। তাঁর চরিত্রের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিশে আছে গবেষণা, ইতিহাস-ঐতিহ্যচর্চা।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘর আজ একটি সমৃদ্ধ ও আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠান। আর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরের সঙ্গে যে নামটি এসে যায় তাহলো জাদুঘরের সাবেক কিউরেটর শামসুল হোসাইন। কারণ জাদুঘরের আজকের এই যশখ্যাতি, সমৃদ্ধির পেছনে এই মানুষটির অবদান সবচেয়ে বেশি।
আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ জুন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মূলত শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রমে ইতিহাসের শিক্ষার্থী ও গবেষকদের সহায়তা প্রদান করা, প্রত্নতত্ত্ব, ইতিহাস ও প্রাচীন শিল্পকলার নিদর্শন সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রদর্শন এবং এসব বিষয়ে মৌলিক গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করাই ছিল এই জাদুঘর স’াপনের মুখ্য উদ্দেশ্য।
চ.বি. জাদুঘরের যাত্রা শুরু হয় খুবই ছোট পরিসরে, কলা অনুষদ ভবনের দোতলায় একটি ছোট্ট কক্ষে। সেখান থেকে পরে একই ভবনের নিচতলার দু’টি কক্ষে, তারপর শহরের মৌলানা মোহাম্মদ আলী সড়কে, আবার কা্যম্পাসে প্রশাসনিক ভবনের চার তলায়। মোট পাঁচবার স’ান পরিবর্তন করতে হয়েছে এ জাদুঘরকে। সর্বশেষ ১৯৯২ সালের ১০ আগষ্ট স’ায়ী প্রদর্শনীর জন্য বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন’াগার ভবনের জন্য পশ্চিম পাশে বড় কলেবরে দ্বিতল ভবনে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে চ.বি. জাদুঘর। জাদুঘরটি দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের মধ্যেও একমাত্র জাদুঘর।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রথম দিককার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীবৃন্দ তৎকালীন বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর আবদুল করিমের অনুপ্রেরণায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনাদি আবিষ্কারের চেষ্টায় লিপ্ত হন। তৎকালীন উপাচার্য প্রফেসর মল্লিকের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং বিভাগের অধ্যক্ষ ড. আবদুল করিমের নেতৃত্বে বিভাগের প্রথম ব্যাচের শামসুল হোসাইন, মামুনুল বারী, আবদুল ওহাব, কামাল উদ-দীন প্রমুখ কয়েকজন ছাত্র প্রথম পর্যায়ে ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দের ৭, ১০ ও ১৪ মে তারিখে চট্টগ্রাম-ঢাকা ট্রাঙ্ক রোড ধরে চট্টগ্রাম থেকে ধুম পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় পুরাকীর্তি জরিপ কাজে অংশগ্রহণ করেন। এই জরিপের ফলে প্রাপ্ত দু’খণ্ড শিলালিপি এবং মেহরাবের খিলান বিভাগীয় সংগ্রহকে সমৃদ্ধ করে। জরিপ চলাকালে বিভাগের ছাত্র মহীউদ্দীন হোসাইন মিরসরাই থেকে সংগৃহীত গরুরবাহন বিষ্ণুর একটি ভাস্কর্য বিভাগকে উপহার দেন।
ছাত্র-শিক্ষকদের প্রচেষ্টায় সংগৃহীত প্রত্ননিদর্শনাদি ইতিহাস বিভাগের একটি কক্ষে প্রদর্শনের ব্যবস’া করা হয়। ইতিহাস বিভাগের অক্সিলিয়ারি বা সংযুক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে একটি জাদুঘর স’াপন ছিল এর উদ্দেশ্য। বর্তমানে পূর্ণ অবয়বে প্রতিষ্ঠিত হয়ে সেই ক্ষুদ্র সংগ্রহটি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘর এই নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ইতিহাস বিভাগের তিরিশটি পুরাকীর্তি নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘর যাত্রা শুরু করে। এ সংগ্রহে ছিল নয়টি বস্ত্রসম্ভার, চৌদ্দটি যুদ্ধাস্ত্র, দু’খণ্ড শিলালিপি, দু’টি ভাস্কর্য,এক খণ্ড স’াপত্যাংশ এবং দু’টি পিতলের থালা।
১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দের গোড়ার দিকে রাজশাহীর তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক নূরুল কাদের খানের সৌজন্যে পাওয়া যায় বিশাল এক বিষ্ণুমূর্তি। বিভাগের শিক্ষক মোকাদ্দেসুর রহমান এটি রাজশাহী থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে আসেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় উপাচার্যের বাসভবনের ভিত খননের সময়ে মাটির অনেক নিচ থেকে পাওয়া যায় দু’খানা থালা। তাও পাঠিয়ে দেওয়া হয় ইতিহাস বিভাগে।
১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে তৎকালীন পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আনুকূল্যে ইতিহাস বিভাগ ‘ডিস্ট্রিক্ট রেকর্ডস কালেকশন প্রজেক্ট’ শিরোনামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। এর উদ্দেশ্য ছিল চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলার ঐতিহাসিক দলিল-দস্তাবেজ সংগ্রহ করা। এই প্রকল্পে রিসার্চ ফেলো পদে প্রথম নিয়োজিত হন বিভাগের সদ্য-প্রাক্তন ছাত্র শামসুল হোসাইন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে শামসুল হোসাইন এই ঐতিহাসিক ঘটনার অনেক নিদর্শন ও দলিলপত্র সংগ্রহ করেন। যুদ্ধশেষে তার সংগ্রহের একটি প্রদর্শনী তথ্য ও বেতার মন্ত্রালয়ের অর্থানুকূল্যে বাংলাদেশ পরিষদের চট্টগ্রাম কেন্দ্রে ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দ থেকে অনুষ্ঠিত হয়। প্রখ্যাত সাহিত্যিক আবুল ফজল এই প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন। পরে এই সংগ্রহটি আরো সমৃদ্ধ হয় এবং শামসুল হোসাইন তার সংগ্রহ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকট হস্তান্তরের প্রস্তাব পেশ করেন। এই প্রস্তাবকে কেন্দ্র করেই বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জাদুঘর স’াপনের ধারণা প্রাথমিকভাবে বিবেচিত হতে থাকে।
পরবর্তীকালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব ও প্রাচীন শিল্পকলার একটি জাদুঘর স’াপনের খসড়া পরিকল্পনা ইতিহাস বিভাগের অধ্যক্ষ ড. আবদুল করিমের নিকট পেশ করেন শামসুল হোসাইন। ১৪ জুন ১৯৭৩ সহকারী কিউরেটর পদে শামসুল হোসাইনের যোগদানের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরের প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম সূচিত হয়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের তদানীন্তন রিসার্চ ফেলো শামসুল হোসাইন মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এবং স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে মুক্তিযুদ্ধের যেসব ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক দলিলপত্র সংগ্রহ করেন সেগুলির একটি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় চট্টগ্রামের বাংলাদেশ পরিষদে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের বেলাল মোহাম্মদ তাঁর নিজের সংগ্রহ থেকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কিছু দলিল সেখানে প্রদর্শনের জন্য শামসুল হোসাইনকে হস্তান্তর করেন। ১৯৭৪ সালের ২৬শে মার্চ শামসুল হোসাইনের উদ্যোগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘর “মুক্তিযুদ্ধের নিদর্শন” শীর্ষক একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করলে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ঐ দলিলগুলি সেখানে প্রদর্শিত হয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরে সেসব দলিল সংরক্ষণে আগ্রহী হলে বেলাল মোহাম্মদ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তদানীন্তন উপাচার্য প্রফেসর আবদুল করিমের হাতে দলিলগুলো হস্তান্তর করেন।
চ.বি. জাদুঘরে পুরাকীর্তি রয়েছে প্রায় এক হাজার পাঁচ শ’ ছিয়াশিটি (১০৫৮৬)। সবচেয়ে দুর্লভ সংগ্রহ হচ্ছে টারসিয়ারি যুগের একটি মাছের ফসিল। রয়েছে ১০ম শতাব্দীর দুর্লভ মাতৃকা মুর্তি।এছাড়াও আছে ১০ম, ১১শ ও ১২শ শতাব্দীর বিভিন্ন ধাতব মুর্তি। যেমন: ব্রহ্ম, মঞ্জুবর,মনসা ললিতা, অষ্টভুজা মহিষ মর্দিনী। ১৯শ শতাব্দীর কাঠ খোদই করা নরবলির দৃশ্য,নিদ্রারত কুম্ভকর্ণ, রাম ও রাবণের যুদ্ধের শিল্পকর্ম। বিভিন্ন ধরনের পুরা নির্দশনের মধ্যে রয়েছে পাহাড়পুর থেকে প্রাপ্ত ৮ম শতাব্দীর পোড়ামাটির ফলক, কুমিল্লা ময়নামতি থেকে প্রাপ্ত ৭ম-৮ম শতাব্দীর নিত্য ব্যবহার্য দ্রব্যাদি, ময়নামতি থেকে প্রাপ্ত ৮ম শতাব্দীর পোড়ামাটির ফলক, পোড়ামাটির অলংকরণ ও অলংকৃত ইট, বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রাপ্ত ইসলামী শিল্পকলার নির্দশন। মধ্যযুগের যুদ্ধাস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ১৮শ শতাব্দীর ঢাল তলোয়ার ও অন্যান্য যুদ্ধাস্ত্র। এছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ভাষার বর্ণমালা। বর্তমানে জাতীয় জাদুঘর, রাজশাহী বরেন্দ্র জাদুঘর এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘর বাংলাদেশে জাদুঘর আন্দোলনের পুরোভাগে রয়েছে।
ইতিহাস ঐতিহ্যচর্চার ক্ষেত্রে জাদুঘরের গুরুত্ব সম্পর্কে তিনি বলেন, “ইতিহাস তো রূপ কথা নয়, ইতিহাস রচিত হয় উপাদানের ভিত্তিতে। উপাদান যদি সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা না যায়, ডকুমেন্টশন না হয়, তাহলে এর মূল্য থাকে না। এই কাজগুলোর জন্য জাদুঘরের প্রয়োজন। সেখানে প্রশিক্ষিত জনবল থাকবে- যারা সংগ্রহ করবেন, সংরক্ষণ করবেন, ডকুমেন্টশন করবেন এবং প্রদর্শন করবেন। ইতিহাসের গবেষকদের জন্য জাদুঘর হলো তীর্থস’ান।” তিনি ইতিহাস ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণার পাশাপাশি সেগুলো প্রদর্শনের জন্যও বিভিন্ন সময়ে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। এগুলোর মধ্য উল্লেখযোগ্য হলো- ২০১২ সালের এপ্রিল মাসে ইংরেজী দৈনিক ডেইলী ষ্টার এর আয়োজনে অদম্য চট্টগ্রাম উৎসবের “চিরায়ত চট্টগ্রাম” প্রদর্শনী। যার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন ড. শামসুল হোসাইন।
চট্টগ্রাম জিমনেসিয়ামে অনুষ্ঠিত চিরায়ত চট্টগ্রাম নামের এই প্রদর্শনীতে স’ান পেয়েছে প্রায় ৭৭টি দুর্লভ আলোকচিত্র। আরো ছিল এ অঞ্চলের প্রাগৈতিহাসিক জীবনের ওপর শিল্পী কাজল দেবনাথের তৈরী একটি ত্রিমাত্রিক মডেল, শিল্পী আলপ্তগীন তুষারের চিত্র কর্ম, কর্ণফুলীর যুদ্ধ এবং মোগল আমলের হামজা খাঁর সমাধিসৌধের একটি মডেল।
ড. শামসুল হোসাইন জাদুঘর বিষয়ক অনেক গ্রন’ রচনা ও সম্পাদনা করেছেন। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো Art and the Vintage, জাদুঘরের কথা, Stone Sculpture in the Chittagong University Museum,ঐতিহ্যায়ন প্রভৃতি।

আপনার মন্তব্য লিখুন