চট্টগ্রামে আন্তর্জাতিক সমকালীন প্রদর্শনী

সৃষ্টির প্রণোদনায় ভাস্কর্যের মেলা

আজিজুল কদির

শিল্পবোধ ব্যাপারটা প্রাকৃতিক। প্রকৃতি গোছালো নয়, বরং অগোছালো তবে সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ। সুতরাং শিল্প অগোছালো সৌন্দর্যকেই দাবি করে। তখন তা বহুরৈখিক ভাবনার উদ্রেক করে; যাকে শিল্পোত্তীর্ণ বলা হয়। এই বহুরৈখিকতাই শিল্পের মূলমন্ত্র। মূলত শিল্প তাই, যা মানুষকে ভাবতে এবং সৌন্দর্য উপলব্ধি করাতে বাধ্য করে। কোনো কোনো ভাস্কর্য রয়েছে যার সামনে গিয়ে দাঁড়ালে চমকে উঠতে হয়। এই চমকানোটাই প্রকৃত শিল্পের ইঙ্গিত করে। বাংলাদেশের ভাস্কর্যচর্চা প্রথাবদ্ধতায় আবদ্ধ ছিল এতদিন। আর তা থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে অনেক আগে থেকেই। কেননা ভাস্কর্যশিল্প বাংলাদেশের সংস্কৃতির আরেকটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশে খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের ভাস্কর্যও আবিষ্কৃত হয়েছে, যা থেকে বোঝা যায় সুদূও অতীতকাল থেকে এখানে ভাস্কর্যশিল্পের বিকাশ ঘটেছিল। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে মূর্তি ও ভাস্কর্য বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির গৌরব বহন করে চলেছে।
আর সেই ধারাবাহিকতায় ভাস্কর্য ও উত্তর-আধুনিক স’াপনাশিল্পের আট দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী শেষ হলো চবি চারুকলা ইনস্টিটিউটে। সেমিনার, আড্ডা, গান ও সংস্কৃতি-প্রেমীদের আনন্দমুখর সমাগমের মধ্য দিয়ে ছিল জার্মানির মিউনিকস’ প্রতিষ্ঠান কাল্পাচার নেটওয়ার্ক আয়োজিত ৯ম আন্তজার্তিক সমকালীন ভাস্কর্য প্রদর্শনী স্টার্ট ’১৮। প্রদর্শনীটি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিল্পী রশিদ চৌধুরী গ্যালারি ও আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ চট্টগ্রাম কেন্দ্র চত্বরে অনুষ্ঠিত হয়। গত ২৮ জানুয়ারি থেকে ৪ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ভাস্কর্য ও উত্তর-আধুনিক স’াপনাশিল্পের আন্তর্জাতিক এই প্রদর্শনীতে যেন তারই প্রমাণ মিলেছে যুক্তিযুক্তভাবে। চারুকলা ইনস্টিটিউটে শিল্পী রশীদ চৌধুরী গ্যালারির দ্বারপপ্রান্তে দেখা গেল প্রথিতযশা ভাস্কর সৈয়দ আব্দুলাহ খালিদকে স্মরণ করা হয়েছে যেখানে তাঁর প্রতিকৃতির পাশে একটি শিল্পকর্মের মাধ্যমে। তাঁর ‘ট্রি’ শিরোনামে নিস্প্রান একটি গাছের কান্ড যেন আমাদের বৃক্ষ নিধনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে। আবার গ্যলারিতে ঢুকে দেখা মিলল ভাস্কর অলক রায়ের ‘অনেক হয়েছে আর নয় ’ শিরোনামের ভাস্কর্য। এতে দেখা যায় উপুড় করা মানুষের মাথা যেখানে দর্শককে নির্দেশ করা হচ্ছে পানি স্প্রে করতে। আগত এক দর্শক যেন তাই করছে। পাশাপাশি ‘কিকাডা’ শিরোনামে রয়েছে শিল্পী নিলুফার চামান এর শিল্পকর্ম। যেখানে একটি মেগাফোনে বেজে উঠে আপন মনে বলে যাচ্ছে বরফ গলছে। বাস্তবে যেন তারই দেখা মিলল অন্য মেগাফোনগুলোতে। আবার বলা যায় ভাস্কর অলক রায় ও শিল্পী নিলুফার চামান এই দুই জনের কাজে একটা যোগসূত্র রয়েছে। ভাস্কর প্রণব মিত্রের ‘ইন্ট্রুডার’। এখানে এই নগরে আগন’ক অর্থাৎ রোহিঙ্গা অভিবাসনকে ইঙ্গিতবহন করছে শিল্পী তার শিল্পকর্মে তাবুর আদলে আলোকায়ন করে।
শিল্পী জাবের আহমেদ চৌধুরীর ‘সেল্টার ’ শিল্পকর্মে গৃহহীন মানুষকে উৎসর্গ করেছেন নিখুঁত কৌশল ও প্রাকৃতিক সরলীকরণ কাঠের খন্ডকে বিন্যাস করা। দরজা জানালা বিহীন এক অংশের ঘরটি যেন আমাদের মানবিকতার অনুভুতির তীব্রতা যেন এক স্বল্পপরিসরে প্রত্যক্ষ করিয়েছেন। অন্যদিকে শিল্পী উত্তম তালুকদার ‘স্টোরি অব উড’ ভাস্কর্যটিতে বিভিন্ন চরিত্রের পুরোনো কাঠের খন্ড গুলো যেন সৃষ্টির প্রণোদনায় আপোসহীন একটা সময়কে দাবী করছে। আবার আধা বিমুর্ত ফিগারেটিভ কাজ ভাস্কর সুকান্ত চৌধুরীর ‘দ্বৈত সত্বা’ ও ভাস্কর সুমান্ত কুমার এর ‘বৃক্ষ রাজ’ যেন বিষয়ের চমৎকারিত্বে ও প্রকাশের অভিনবত্বে উজ্জ্বল। বরাবরের মতো ভাস্কর ফজলে রাব্বী তার শিল্পকর্মে যেন বস’ও অন্তর্নিহিত সৌন্দর্যকে আশ্চর্য মমতায় উন্মোচিত করেছেন ‘বাটার ফ্লাই’ শিরোনামের শিল্পকর্মে। আবার ভাস্কর জহুর কুমার সিন্হার বিমুর্ত পাখি ফর্মের ‘ওন্ডেড পাখি’ ভাস্কর্যটি যেন কৌশল ও রীতিতে সাবলিল ও প্রাকৃতিক। এছাড়া প্রদর্শনীতে বেশ কিছু কাজ যেমন ভাস্কর অলক কুমার সরকার, মো:পারভেজ আলম, গোঁসাই পাহলবী, সুস্মিতা ভৌমিক এর শিল্পকর্মগুলো যেন আবেদনে গভীর ব্যঞ্জনায় আবেগের উজ্জ্বলতায় প্রকাশ পেয়েছে।
বলা যায় ভাস্কর্যগুলো ছিল জীবন্ত মানুষের মতো চঞ্চল, উদ্দীপনাময়। নিথর, নিস্তরঙ্গতায় সমুদ্রসুন্দর। উথাল পাথাল ঢেউয়ের মতো সৌন্দর্য বিদ্যমান। উল্ল্লেখিত শিল্পীদের ভাস্কর্যগুলো যেন প্রকৃত শিল্পবিচারে নান্দনিক। জার্মানির মিউনিকস’ প্রতিষ্ঠান কাল্পাচার নেটওয়ার্ক আয়োজিত ৯ম আন্তর্জাতিক সমকালীন ভাস্কর্য প্রদর্শনী স্টার্ট ’১৮ হোস্ট ভেন্যু হিসাবে চট্টগ্রামে তৃতীয়বারের মতো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট, এবং আঁলিয়স ফ্রঁসেজ গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত হয়। উল্লেখ্য ২০১০ সাল থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত হয়ে আসলেও। চট্টগ্রাম ভেন্যু হিসাবে যুক্ত হয় ২০১৬ সাল থেকে । এতে বিশ্বের ২১টি দেশের ৯৭টি ভেনুতে ৫০০০ শিল্পীর শিল্পকর্ম একযোগে প্রদর্শিত হয়। তবে চট্টগ্রাম ভেন্যুতে এবার বাংলাদেশের ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহীর ৫৪ জন শিল্পীর ভাস্কর্য, স’াপনাশিল্প ও ত্রিমাত্রিক শিল্পকর্ম এই প্রদর্শনীতে স’ান পেয়েছে।
প্রদর্শনীতে অংশগ্রহন করেছেন;
সৈয়দ আব্দুলাহ খালিদ, অলক রায়, প্রনব মিত্র চৌধুরী, সুকান্ত চৌধুরী, দেবাশীষ পাল, কাজল দেব নাথ, অসীম কুমার রায়, মো. আতিকুল ইসলাম, সামিনা এম. করিম, জাবের আহমেদ চৌধুরী, সুজিত কুমার সরকার, নাসিমা আখতার, উত্তম কুমার তালুকদার, জয়াশীষ আচার্য্য, আসমা উল হোসনা মারিয়া, দীপ্তাংশু মজুমদার, ইফরানুল হক, সুব্রত দাশ, নুরুল আমিন, সালাউদ্দিন নয়ন, জুয়েল চাকমা, অলক কুমার সরকার, বিলাস মন্ডল, জহূর কুমার সিমহা, কনক কুমার পাঠক, সুমন্ত কুমার, মো. পাভেজ আলম, ফজলে রাব্বী, এমরান মাহামুদ, মো.নিজাম উদ্দিন, মৌমিতা রায়, মেখ কাইয়ুম, জিহান করিম, তাসলিমা আকতার, বিনীতা রায়, দেবাংশু জৈন, গোঁসাই পাহলবী, রূপক সাহা, শারমিন আকতার জিম্পী, শাস্বত কুমার, নিলুফার চমন, সুচিষ্মিতা ভৌমিক, উত্তম বড়-য়া, অরূপ বড়-য়া, অনিমেষ, অনুপম রায়, রিয়াদ মাহাম্মুদ, মো. সানাউল্লাহ, নিগার সুলতানা রুনা, আমিনুল ইসলাম, মাইনুল ইসলাম পল।