চট্টগ্রামে অন্তরঙ্গ দেবশ্রী

লেখা ও ছবি : কমল

দেবশ্রী রায় বিখ্যাত ভারতীয় বাঙালি অভিনেত্রী। ১৯৬৫ সালের ৮ আগস্ট কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তিন শতাধিক সিনেমায় তিনি অভিনয় করেছেন। পেয়েছেন ৪০টিরও বেশি পুরস্কার। তামিল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতেও তিনি ‘চিন্তামণি’ নামে অভিনয় করতেন।
দেবশ্রী রায় এর জন্ম, বেড়ে উঠা সব কলকাতায়। তার পিতার নাম বীরেন্দ্র কিশোর রায়, মায়ের নাম আরতি রায়। মায়ের বাড়ি বাংলাদেশে ইশ্বরদীতে।১৯৬৯ সালে তিনি প্রথম ‘বালক গদাধর’ নামে একটি চলচিত্রে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় করেন, যার পরিচালক ছিলেন হরিময় সেন। তিনি কলকাতার এ পি জে,পার্ক স্ট্রীট শাখার স্কুলের ছাত্রী ছিলেন, যদিও নাচের প্রতি অত্যধিক ঝোঁক থাকার কারণে বেশিদূর এগোতে পারেননি। তার ডাক নাম চুমকি। দেবশ্রী রায় একজন খ্যাতিমান ওড়িশি নৃত্যশিল্পীও। তিনি প্রথমে তার মা এবং বড় বোন পূর্ণিমা রায়ের কাছ থেকে নাচ শেখেন। পরে বন্দনা সেন এবং কেলুচরণ মহাপাত্রের কাছ থেকে তালিম নেন। খুব কম বয়স থেকে তিনি মঞ্চে নৃত্য পরিবেশনের মাধ্যমে পরিচিতি লাভ করেন। ‘নটরাজ’ নামে নিজস্ব একটি নাচের দল আছে তার।
১৯৯১ সালে দীর্ঘদিন সম্পর্কের পর তিনি বিয়ে করেন টালিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা প্রসেনজিতকে। কিন’ তারা খুব অল্প সময়ের মধ্যে আলাদা হয়ে যান। ভারতের জনপ্রিয় অভিনেত্রী রানী মুখার্জি সম্পর্কে তার ভাগ্নি হন।
প্রায় এক যুগের বেশি সময় ধরে দেবশ্রী রায় ভারতীয় বাংলা ছবির অভিনেত্রী হিসেবে শীর্ষ স’ান ধরে রেখেছেন। একাধারে কমার্শিয়াল এবং প্যারালাল ছবিতে সমান তালে অভিনয় করেছেন। নাযড়কা চরিত্রে তিনি প্রথম অভিনয় করেন অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের “নদী থেকে সাগরে”, যেখানে তার বিপরীতে ছিলেন মিঠুন চক্রবর্তী। তার প্রথম ব্লকব্লাস্টার হিট ছবি তরুণ মজুমদার এর ‘দাদার কীর্তি’। তিনি ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘উনিশে এপ্রিল’ চলচ্চিত্রে একজন তরুণ হতাশাগ্রস্ত ডাক্তারের ভূমিকায় অভিনয় করে ১৯৯৬ সালে জাতীয় চলচিত্র পুরস্কার পান। তার অন্যান্য সেরা ছবির মধ্যে আছে অপর্ণা সেন পরিচালিত ৩৬ চৌরঙ্গী লেন,লাইফ ইন পার্ক স্ট্রীট,মমতা কি ছাওন মেইন, কাভি আজনাবি থি, ফুলওয়ারি, জাস্টিস চৌধুরী প্রভৃতি।
দেবশ্রী রায় সমপ্রতি রাজনীতিতে এসেছেন। তিনি বর্তমানের তৃনমূলের এমএলএ। ২০১১ সালে তিনি রায়দিঘি থেকে প্রতিযোগিতা করেন সিপিএম এর শক্তিশালী প্রার্থী প্রাক্তন মিনিস্টার কান্তি গাঙ্গুলির সাথে।
কদিন আগে তিনি চট্টগ্রামে এসেছিলেন শুটিং করতে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘হঠাৎ দেখা’ কবিতা অবলম্বনে যৌথ প্রযোজনার একটি ছবি নির্মিত হচ্ছে। আর এ ছবির কাজের জন্যই তিনি মূলত চট্টগ্রামে আসেন। ছবিতে দেবশ্রীর সঙ্গে জুটি বেঁধে অভিনয় করছেন নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। ইমপ্রেস টেলিফিল্ম ও কলকাতার রেশমী পিকচার্সের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত হচ্ছে ছবিটি। ৫ নভেম্বর থেকে ছবিটির শুটিং চলে চট্টগ্রাম রেলস্টেশনে। সেই শুটিংয়ের ফাঁকে কথা হলো দেবশ্রী রায়ের সাথে।

আপনি বাংলাদেশে অনেকবার আসলেও এই প্রথম চট্টগ্রাম আসলেন।
দেবশ্রী রায় : হ্যাঁ এই প্রথম চট্টগ্রাম আসলাম। তবে চট্টগ্রামের অনেক ইতিহাস শুনেছি মায়ের কাছে। মার বাড়ি বাংলাদেশর ইশ্বরদীতে। দাদু কাজ করতেন চট্টগ্রামে। এই শহরে মাষ্টার দা জন্ম। শ্যুটিং শেষে ইচ্ছে আছে উনার সমাধি যাওয়ার।
পৃথিবীর অনেক জায়গার শ্যুটিং এর প্রয়োজনে ঘুরেছেন, এইখানে এসে কেমন লাগছে।
দেবশ্রী রায় : এই শহর দেখে পুরানো কলকাতার মনে হচ্ছে, যেন আমার শহর। চট্টগ্রামের আসার পর থেকে শুধু মাছ আর শুঁটকি খাওয়া হচ্ছে। এতই শুনেছি বাংলাদেশে মাছ আর শুঁটকির জন্য বিখ্যাত।
অনেক সিনেমা করেছেন জীবনে পেয়েছেন অনেক খ্যাতি।। সিনেমার জীবন নিয়ে কিছু যদি বলেন…
দেবশ্রী রায় : আমি ৩০০ ছবিতে অভিনয় করেছি। সব ছবির নামও বলতে পারবো না। তবে আগের ছবির সঙ্গে এখনকার ছবির কিছুটা ব্যবধান আছে। এই যেমন গল্পের কাহিনী বাছাইয়ে। আগের সিনেমায় সামাজিক প্রেক্ষাপটে সিনেমা তৈরি হতো। এখন রবীন্দ্রনাথ কিংবা অন্য কারো কোন গল্প বাছাই করে সিনেমা হচ্ছে। দর্শকও খাচ্ছে। সময়ের কারণে এমন চাহিদা তৈরি হচ্ছে। বহু আগে ১৯৯৭ সালে ‘উনিশে এপ্রিল’ ছবির জন্য পেয়েছিলাম পুরস্কার। এরপর আর সেই ধরনের ছবির মতো কাজ করা হয়নি।
এখন কলকাতায় অনেক এই ছবি করছেন, ভালো অভিনয় করছেন যেমন এখন দেব, শুভশ্রী, সোহম, পরমব্রত, কোয়েলরা অভিনয় করছে। এদের মধ্যে কাকে সবচেয়ে বেশি মেধাবী মনে হয়?
দেবশ্রী রায় : সত্যি বলতে কি ওদের বিষয়ে আমি কোন মন্তব্য করতে চাই না। কারণ ওদের ছবি আসলে খুব একটা দেখা হয়নি। তাছাড়া নিজে কলকাতার সিনেমা কবে দেখেছি তা ভুলে গেছি। কারণ কাউকে আলাদা করে মূল্যায়ন করা কঠিন।
এবার ‘হঠাৎ দেখা’ সিনেমাটি প্রসঙ্গে কিছু বলুন।
দেবশ্রী রায় : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘হঠাৎ দেখা’ কবিতাটি পড়লেই টের পাবেন। যার প্রতিটি লাইনের আড়ালে আছে ভালোবাসার এক চিরন্তন গল্প। সেই গল্পটিকে রূপালি পর্দায় তুলে ধরার আশ্বাস পেয়েছি নির্মাতাদ্বয়ের কাছ থেকে। যা আগামী ২৫ বৈশাখ বিশ্বকবির জয়ন্তীতে দুই বাংলায় একসঙ্গে মুক্তি দেওয়ার কথা রয়েছে। সবমিলিয়ে আমার কাছে একেবারে নতুন কিছু মনে হয়েছে।
সবাই জানে দেবশ্রী রায় পশুপ্রেমী। এই বিষয়ে কিছু জানতে চাই।
দেবশ্রী রায় : দেবশ্রী রায় ফাউন্ডেশন নামে আমার একটা এনজিও আছে।। আমি কুকুর খুব ভালোবাসি। আমার এই ফাউন্ডেশন হোমে অনেক কুকুরের সেবা করি। এছাড়া এইমুহুর্তে ১৬, ২০ এবং ২৪ বছর বয়সী তিনটি হাতি আছে। তার মধ্যে তুলনামূলক কম বয়সী হাতিকেই পছন্দ আমার।
বাংলাদেশের সিনেমা নিয়ে আপনার ভাবনা ও আপনার চোখে এই দেশের সিনেমার মূল্যায়ন ও অভিনয়ে বিষয়ে ধারণা।
দেবশ্রী রায় : এদেশের আলমগীর ভাইয়ের সঙ্গে আমার যোগাযোগ আছে। তিনি বন্ধুদের তালিকায় শীর্ষে। ‘মায়ের আশীর্বাদ’ সিনেমার পর থেকে তার সঙ্গে আমার পরিচয়।আর এই ছবির মাধ্যমে নতুন বন্ধু পেলাম আপনাদের আরেক নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনকে। এছাড়া রাজ্জাক ভাই, আনোয়ার হোসেন, হুমায়ূন ফরিদী ভাই, ইলিয়াস কাঞ্চন, ববিতা, শাবানা, কবরী, মৌসুমী সহ অনেক গুনী অভিনেতা আর অভিনেত্রী বাংলাদেশে আছে। অনেক ভালো ভালো সিনেমা এইদেশে আছে।
আপনাকে অনেক ধন্যবাদ সময় দেওয়ার জন্য। হয়তো হঠাৎ দখা সিনেমার মতো আবার একদিন দেখা হয়ে যাবে।
দেবশ্রী রায় : আপনাকেও ধন্যবাদ, ইচ্ছে আছে আমার মাকে নিয়ে একবার চট্টগ্রাম আসার। কক্সবাজার যাওয়া আর ঘুরে বেড়ানো।

আপনার মন্তব্য লিখুন