চট্টগ্রামের মুকুটহীন সম্রাট মহিউদ্দিন

ড. মইনুল ইসলাম

চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি জনাব মহিউদ্দিন চৌধুরী ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭ তারিখ রাত তিনটায় ইনতিকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্নাহ ইলায়হে রাজেউন)। ১৯৯৪ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচিত মেয়র এবং পরপর তিনবার নির্বাচিত মেয়র ছিলেন তিনি। ১৯৯৪ সালে তিনি মেয়র হওয়ার পর থেকে চট্টগ্রামের রাজনীতিতে গত দুই যুগ ধরে জননেতা বলতে এই একজনই ছিলেন, যাঁকে দলমতনির্বিশেষে জনগণ চট্টগ্রামের অভিভাবক মনে করতেন। মুক্তিযুদ্ধের এই কিংবদন্তী অসীম সাহসী যোদ্ধা স্বাধীন বাংলাদেশে চট্টগ্রামের ছাত্ররাজনীতির একজন লড়াকু সৈনিক হিসেবে ১৯৭২ সাল থেকেই অনন্য প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন। কিন’, ছাত্রলীগের নেতার পরিচয়ের কারণে ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের পর সরকারের অত্যাচার-নির্যাতনের স্টীমরোলার চলেছিল তাঁর উপর। মোশতাকের অবৈধ সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রাম পরিচালনার উদ্দেশ্যে তিনি অনেকদিন ভারতের কোলকাতায় অবস’ান করেছিলেন, কিন’ ভারতের সরকার পরিবর্তনের কারণে তাঁদের ঐ প্রয়াস ব্যর্থ হওয়ার পর নিদারুণ অর্থ সংকটে পড়তে হয়েছিল তাঁকে। শ্রমিকের পরিচয়ে নানা ধরনের শ্রমসাধ্য কাজে নিজেকে নিয়োজিত করে ঐ পর্যায়ে তাঁকে দিনাতিপাত করতে হয়েছে। ১৯৭৮ সালে দেশে ফিরে আসার পর জিয়াউর রহমানের আমলে বহুদিন জেল-জুলুমও সইতে হয়েছে, পলাতক জীবনও কাটাতে হয়েছে দীর্ঘদিন।
আশির দশকে ক্রমেই আওয়ামী লীগের অকুতোভয় যুবনেতা এবং শ্রমিক লীগের লড়াকু শ্রমিক নেতা হিসেবে আবারো রাজনীতির মাঠে তাঁর ক্রমবিকাশ দেখেছি আমরা। ঐ পর্যায়ে তাঁকে ভয় পেতেন সাধারণ মানুষ। স্বৈরাচারী সমরপ্রভু এরশাদের বিরুদ্ধে ১৯৮৪ সাল থেকে প্রতিরোধ সংগ্রামে যখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৮৬ সালে সভাপতি হিসেবে আমি নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন আওয়ামী লীগের এই নেতার সাথে আমার বন্ধুত্ব ও পারষ্পরিক সহমর্মিতার সম্পর্কটি সংগ্রামী সাথী এবং আজীবন সুহৃদের পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। আমার ব্যাপারে তাঁর এই অকুণ্ঠ ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আস’ার স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ আমৃত্যু প্রবহমান ছিল, সেটা চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী অনেকেরই জানা ছিল। অন্যদিকে, আমার পত্রিকার কলামগুলোতে বা সভা-সেমিনারে যখন তাঁর কোন ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিতাম সেগুলো দ্রুত সংশোধনেরও প্রয়াস নিতেন তিনি, এই সমালোচক যে তাঁর অকৃত্রিম শুভাকাঙ্ক্ষী সে বিশ্বাস জীবনের শেষদিন পর্যন্ত অবিচল ছিল তাঁর। ১৯৮৬ সালের সংসদীয় নির্বাচনে জনাব মহিউদ্দিন চৌধুরী রাউজান থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য প্রার্থী হয়েছিলেন, কিন’ স্বাধীনতা-বিরোধী সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পেশীশক্তি এবং মাস্তান বাহিনীর দাপটের কারণে ভোটের কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষে ভোটার হিসেবে আমরা কেউ ভোট দিতে পারিনি। আমার নিজের গ্রাম নোয়াপাড়ার একটি ভোটকেন্দ্রে এহেন ভোট-ডাকাতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কারণে আমাকে বোমা হামলারও শিকার হতে হয়েছিল। পত্র-পত্রিকায় এই খবর পড়ে মহিউদ্দিন চৌধুরী আমাকে সমবেদনা জানিয়েছিলেন এই বলে, ‘ইনশাআল্লাহ আঁরার দিন আইবো স্যার’। ১৯৯১ সালে আমি আমার শহরের ঠিকানায় ভোটার হওয়ায় ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে এবং ১৯৯৪ সালের মেয়র নির্বাচনে আবার সুযোগ হলো তাঁকে ভোট দেয়ার। সংসদ নির্বাচনে মহিউদ্দিন চৌধুরী হেরে গেলেও ১৯৯৪ সালে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচিত মেয়র হয়ে সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। মেয়র নির্বাচনে আমাদের ভোটকেন্দ্র ছিল পাঁচলাইশের প্রবর্তক সংঘের পাহাড়শীর্ষে। ঐ সুউচ্চ ও দুর্গম ভোটকেন্দ্রে আমার ৮৯ বছরের বৃদ্ধ বাবাকে যখন অতিকষ্টে হাত ধরে উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলাম তখন ঐ দৃশ্য দেখে জনৈক ভদ্রলোক তিরষ্কারের সুরে বাবাকে অনুযোগ করেছিলেন, ‘ঔগ্যাভোট দেয়নর লাই এত কষ্ট গরন পড়ে না?’ বাবা জবাব দিয়েছিলেন, ‘ভালা নেতা চাইলে গরন পড়ে’। আমি গর্বের সাথে বলতে পারি, মেয়র নির্বাচনে বিজয়ের পর জনাব মহিউদ্দিন চৌধুরী আমার বাবার ঐ বিশ্বাসের মর্যাদা রেখেছিলেন। গত দু’যুগ ধরে সারা দেশের মানুষের কাছে অসীম সাহসের প্রতিমূর্তি ছিলেন তিনি। জনগণের ভোটে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর ক্রমেই তিনি জনগণের আস’াভাজন আপনজনে পরিণত হয়ে চলেছিলেন। চট্টগ্রামবাসীর কাছে তিনি ক্রমেই হয়ে উঠছিলেন আপসহীন যোদ্ধা এবং রাজনৈতিক অভিভাবক, চট্টগ্রামের ন্যায্য স্বার্থে যে কোন মহল থেকে আঘাত আসলে সবার আগে গর্জে উঠতেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। প্রতিবাদ ও প্রতিরোধে প্রতিবারই নেতৃত্ব দিতেন অকুতোভয়ে। এমনকি চট্টগ্রামের বঞ্চনা যদি তাঁর নিজের দলের শীর্ষ নেতৃত্বের ভুল সিদ্ধান্তের ফসলও হয় তাতেও ঐ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বারবার রুখে দাঁড়িয়েছেন তিনি। এজন্যে বেশ কয়েকবার দলীয় প্রধানমন্ত্রীর বৈরিতার শিকারও হতে হয়েছে তাঁকে, কিন’ তিনি ন্যায়ের পথ থেকে বিচ্যুত হননি এহেন বিরাগের কাছে মাথা নত করে। ১৯৯৬-৯৭ সালে জনাব মহিউদ্দিন চৌধুরী চট্টগ্রাম বন্দরে এসএসএ’র মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি গাঁড়ার পাঁয়তারাকে যেভাবে রুখে দিয়েছিলেন সেজন্যে তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে স’ান করে নিয়েছেন। হয়তো ঐ ব্যাপারে তিনি শেখ হাসিনার বিরাগভাজন হওয়ায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদের আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক বঞ্চনার শিকার হয়েছিল। কিন’, তাতে মহিউদ্দিন চৌধুরীর জনপ্রিয়তা আরো বেড়ে গিয়েছিল। তিনি প্রকৃত প্রস্তাবে ঐ ঘটনার মাধ্যমে চট্টগ্রামের অবিসংবাদিত রাজনৈতিক অভিভাবকের স’ানটি একান্তই নিজের অধিকারে নিয়ে নিয়েছিলেন।এমনকি, মেয়র পদের নির্বাচনে ২০১০ সালে হেরে যাওয়ার পরও যখন ভারতের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে ভারত সরকারের প্রবল চাপের কাছে নতি স্বীকার করে বর্তমান মহাজোট সরকার ২০১৪ সালে সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন পরিকল্পনা পরিত্যাগ করেছিল এবং নানা ধানাই-পানাই করে সেটা লুকোবার চেষ্টা করছিল তখনও চট্টগ্রামবাসীর সাথে সরকার প্রতারণা করছে বলে উচ্চকণ্ঠে অভিযোগ তুলেছিলেন একমাত্র মহিউদ্দিন চৌধুরী। পটুয়াখালীর পায়রা বন্দর নির্মাণের জন্যে যখন চট্টগ্রাম বন্দরের শতশত কোটি টাকা গত কয়েকবছর ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তার বিরুদ্ধেও সোচ্চার প্রতিবাদ উত্থিত হয়েছে তাঁরই কণ্ঠে। চট্টগ্রাম বন্দরের প্রতি বর্তমান নৌ পরিবহন ও বন্দর মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দৃষ্টিভঙ্গি যে বিমাতাসুলভ সেটাও তাঁর পছন্দসই ছিল না। চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালনায় একটি মাফিয়া গ্রুপ ক্ষমতা কুক্ষিগত করে লুটপাট চালিয়ে যাচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করে চলেছেন বহুদিন যাবত। এমনকি, শ্রমিক নেতাদের একাংশও এই মাফিয়ার নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে বলে তাঁর উচ্চকণ্ঠ প্রতিরোধের ডাক শোনা যাচ্ছিল কিছুদিন ধরে। যে কথাটা মহিউদ্দিন চৌধুরী সম্পর্কে নির্দ্বিধায় বলা যায় তাহলো, তাঁর নিজের দল ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও চট্টগ্রামের এবং চট্টগ্রাম বন্দরের ন্যায্য স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ার কোন আশংকা দেখলে আমৃত্যু রুখে দাঁড়িয়েছেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। সেজন্যেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন দলমতনির্বিশেষে এই অঞ্চলের আপামর জনগণের প্রাণপ্রিয় মুকুটহীন সম্রাট।
অন্যদিকে দেখা যাবে, প্রথমবার এবং তৃতীয়বার যখন তিনি মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন তখন রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল বিএনপি এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট। এর ফলে মহিউদ্দিন চৌধুরীর বিজয়কে ছিনতাই করার অপপ্রয়াসকে রুখতে দু’বারই হাজার হাজার জনতাকে ভোট গণনা কেন্দ্রের চারিদিকে রাত জেগে পাহারা বসাতে হয়েছে। আবার, মহিউদ্দিন চৌধুরীকে বিজয়ী করার অপরাধে বিএনপি সরকার চট্টগ্রামের জনগণকে শাস্তি দিতেও পিছপা হয়নি। ১৯৯৪ সালে মেয়াদের প্রথম থেকেই আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচিত এই মেয়রকে সরকারের চরম বৈরিতা মোকাবেলা করতে হয়েছিল। এতদ্সত্ত্বেও, ১৯৯৫-৯৬ সালে বিএনপি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলন-সংগ্রামের সময় মহিউদ্দিন চৌধুরীকে যখন সরকার গ্রেফতার করেছিল তার প্রতিবাদে চট্টগ্রামের পাশাপাশি সারা দেশে যে অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থান পরিসি’তির সৃষ্টি হয়েছিল জনগণ তা নিশ্চয়ই ভুলে যায়নি। সেজন্যেই ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে যখন শেখ হাসিনা জয়ী হয়ে ক্ষমতাসীন হয়েছিলেন তখন এই নেতা তাঁর কাছে যথাযথ গুরুত্ব পাবেন, সেটাই ছিল যৌক্তিক প্রত্যাশা। কিন’, নির্বাচনের পর মহিউদ্দিন চৌধুরী যখন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে ‘সিটি গভর্নমেন্টে’ রূপান্তরিত করার জন্যে শেখ হাসিনার কাছে অনুরোধ জানিয়েছিলেন তখন তাঁকে প্রত্যাখ্যাত হতে হয়েছিল। তাঁর প্রস্তাবের উদ্দেশ্য ছিল, এই মহানগরীতে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার সাথে সংশ্লিষ্ট ৩২টি সংস’ার কাজকর্মে যে সমন্বয়ের প্রকট অভাব রয়েছে তা দূরীকরণে মেয়র তাহলে প্রধান সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করতে পারতেন। আমি নিজে উদ্যোগী হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং যুক্তরাজ্যের নজির উদ্ধৃত করে আমার একাধিক কলামে তাঁর ঐ দাবির ন্যায্যতা তুলে ধরেছিলাম। বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই যে প্রস্তাবিত সিটি গভর্নমেন্টের অনুরূপ ব্যবস’া চালু রয়েছে তা-ও তুলে ধরা হয়েছিল ঐ সময়ের পত্র-পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত সকল কলাম ও অভিমতগুলোতে। যতদূর জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এহেন দাবি উত্থাপনের জন্যে জনাব মহিউদ্দিন চৌধুরীর উপরে বরং নাখোশ হয়েছিলেন, এবং ঐ দাবি অচিরেই মাঠে মারা গিয়েছিল। সিটি গভর্নমেন্টের এই প্রয়োজনটি গত কুড়ি বছরেও আর মেটানো হয়নি।
আবার, ১৯৯৪-৯৬ এবং ২০০১-০৬ মেয়াদের বিএনপি সরকারের সময় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী হওয়াতে চট্টগ্রামকে অবিশ্বাস্যভাবে কম উন্নয়ন বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এমনকি ২০০১-০৬ মেয়াদের বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় পরপর দু’বছর সিলেটের চাইতে অর্ধেকেরও কম বরাদ্দ পেয়েছিল চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন থেকে পাঠানো সব প্রকল্প-প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে আটকে দেয়াই ছিল নিয়ম। একবার তো চট্টগ্রামের এক বিএনপি নেতা বলেই দিলেন, মহিউদ্দিন চৌধুরী যদ্দিন মেয়র থাকবে তদ্দিন কোন প্রকল্পই পাশ হবে না। এহেন বৈরিতাকে পাশ কাটিয়ে চট্টগ্রাম নগরীর উন্নয়নকে সচল রাখতে মহিউদ্দিন চৌধুরী অভিনব এবং সৃজনশীল নানা আয়বর্ধক কার্যক্রম গ্রহণ করেছেন একাধিকবার। নাগরিকদের হোল্ডিং ট্যাক্স না বাড়িয়েও যে সফলভাবে নগরীর উন্নয়ন কার্যক্রমে বিকল্প অর্থায়নের ব্যবস’া করা যায়, এবং সরকারের বৈরিতাকেও যে অতিক্রম করা যায় মহিউদ্দিন চৌধুরী তা বারবার দেখিয়ে দিয়েছেন। তাঁর সময়ে চট্টগ্রাম নগরীর পরিচ্ছন্নতা সারা দেশে প্রশংসিত হয়েছে। সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত স্কুল-কলেজের সংখ্যা অনেক বেড়েছে, আবার এসব ক্রমবর্ধমান-সংখ্যক স্কুল-কলেজ অর্থাভাবে কখনোই মুখ থুবড়ে পড়েনি। সিটি কর্পোরেশনের স্বাস’্যকেন্দ্র এবং মেটারনিটি ক্লিনিকেরও সংখ্যা বেড়েছে, আবার ওগুলো জনগণকে সেবা দিতেও ব্যর্থ হয়নি। তাঁর অনন্য অবদান প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ও উত্তরোত্তর বিকশিত হয়েই চলেছে। তাঁর মেয়র হজ্ব কাফেলায় যাঁরা হজ্ব করতে গেছেন তাঁরা এই মেয়রের প্রত্যক্ষ শারীরিক সেবাও পেয়েছেন পবিত্র মক্কা-মদীনায়। চট্টগ্রামের জিইসি মোড় থেকে এ কে খান গেট পর্যন্ত সুপরিসর সড়ক এবং আগ্রাবাদের বাদামতলী মোড় থেকে পোর্ট কানেকটিং রোড পর্যন্ত এক্সেস রোড নির্মাণ প্রধানত তাঁরই কীর্তি হিসেবে স্বীকৃত। তাঁর অনেকগুলো প্রকল্প-প্রস্তাব সরকারের স’ানীয় সরকার মন্ত্রণালয় আটকে দিয়েছে। পতেঙ্গা সী-বিচের পর্যটন কমপ্লেক্স এবং ছিলিমপুরের পোর্ট সিটি আবাসিক এলাকা এখনো ঝুলে আছে। ময়লা আবর্জনা ও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্যে তাঁর একটি প্রকল্প-প্রস্তাব বিএনপি সরকার অনুমোদন না দেয়ায় সেটা বাস্তবায়ন করতে পারেননি বলে প্রায়ই দুঃখ করতেন।
২০০৭-৮ সালের সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার নানা অভিযোগ তুলে মহিউদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেফতার করেছিল। ঐ সময় মিসেস হাসিনা মহিউদ্দিন জনৈক ব্যক্তির মাধ্যমে আমার সাহায্য চেয়েছিলেন তাঁর মুক্তির ব্যাপারে। আমি বলেছিলাম, সামরিক এস্টাবলিশমেন্ট আমাকে তাদের শত্রু বিবেচনা করে। অতএব, আমার কোন তদবির এ-ব্যাপারে কাজে লাগবে না। বরং, চট্টগ্রামে তাঁর মুক্তির দাবিতে যদি মানববন্ধন কিংবা অনশন ধর্মঘট করা হয় তাতে আমি নেতৃত্ব দিতে প্রস’ত আছি। পরবর্তীতে আমার ঐ প্রস্তাব নিয়ে কেউ এগোয়নি। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, মহিউদ্দিন চৌধুরীর কন্যা টুম্পা যখন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুশয্যায় শায়িত ছিলেন তখন মৃত্যুর আগে ওকে একবার দেখার জন্যে মহিউদ্দিন চৌধুরীর প্যারোলের আবেদনের ব্যাপারে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একজন উপদেষ্টার মাধ্যমে নাকি সামরিক এস্টাবলিশমেন্ট থেকে বলা হয়েছিল, যদি আর কোনদিন রাজনীতি করবেন না মর্মে মুচলেকা দিতে মহিউদ্দিন চৌধুরী রাজি থাকেন তাহলে ঐ আবেদন বিবেচনা করা যেতে পারে। বলা বাহুল্য, তিনি এই মুচলেকা দিতে রাজি হননি। অতএব, মৃত্যুপথযাত্রী টুম্পার সাথে ইহজগতে পিতার সাক্ষাতও হয়নি। আমাদের দেশের সমরপ্রভুদের নিষ্ঠুরতা এবং ব্ল্যাকমেইলিং কতদূর অমানবিক পর্যায়ে যেতে পারে তারই জাজ্বল্যমান প্রমাণ হয়ে থাকবে এই উপাখ্যান। জাতিকে সেজন্যেই সাবধান থাকতে হবে ভবিষ্যতে যারা আবার উত্তরপাড়ার শাসনকে ডেকে আনতে চায় তাদের সম্পর্কে।
মহিউদ্দিন চৌধুরী তাঁর তৃতীয় মেয়াদে হয়তো বেশ কিছু ভুল করেছিলেন। ২০১০ সালে তাঁর জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েছিল নিঃসন্দেহে। একইসাথে আওয়ামী লীগের প্রচণ্ড অন্তর্কোন্দলে ঐ বছর জুনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে চতুর্থ মেয়াদে তাঁর জেতা হয়নি। কিন’, অতিদ্রুত তাঁর ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছিলেন তিনি। অতএব, তাঁর জনপ্রিয়তা ক্রমেই বাড়তে বাড়তে আবারো আকাশচুম্বী হয়ে গিয়েছিল ২০১৭ সালে। বিশেষত, গৃহকর পুনর্মূল্যায়নের নামে ভুল কর-নির্ধারণ পদ্ধতি চট্টগ্রামের নাগরিকদের উপর চাপিয়ে দেয়ার জবরদস্তি চট্টগ্রামের জনগণকে ২০১৭ সালে যখন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের বর্তমান মেয়রের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামতে বাধ্য করেছিল তখন জীবনের শেষবারের মত জনগণের এই প্রাণপ্রিয় নেতা ঐ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে চলেছিলেন। তিনি নাকি সরাসরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকেও এ-ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে অনুরোধ করেছিলেন। যা-ই হোক,সরকার শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত স’গিত করতে বাধ্য হয়েছে। আন্দোলনের এই সাময়িক সাফল্য তাঁরও, জনগণের নাড়ির স্পন্দন যিনি বুঝতে পারেন তিনিই তো আসল জননায়ক। আমি মনে করি, চট্টগ্রামের বর্তমান মেয়র মহোদয় যদি এই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে তাঁর ভোটারদের প্রতিপক্ষ হওয়ার অবস’ান গ্রহণ থেকে ভবিষ্যতে বিরত থাকেন তাহলে আখেরে তিনি লাভবান হবেন এবং তাঁর জনপ্রিয়তার ভাটার টানও এড়াতে সক্ষম হবেন। ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭ তারিখ বিকেলের লালদীঘির জানাজার জনসমুদ্র প্রমাণ করেছে মহিউদ্দিন চৌধুরীই এই জনপদের মুকুটহীন সম্রাট ছিলেন। জয়তু আমাদের নেতা। আল্লাহর কাছে তাঁর আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।