চকরিয়া-পেকুয়ায় বনবিভাগের সংরক্ষিত পাহাড়ে অবৈধ বসতি

এম.জিয়াবুল হক, চকরিয়া

কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগ ও চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের অধীনে একাধিক পাহাড়ে গত দুইযুগ ধরে অবৈধভাবে মৃত্যুঝুঁিকতে বসবাস করছেন চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলার অন্তত ৩০ হাজার মানুষ। প্রতিবছর বর্ষাকালের শুরুতে স’ানীয় প্রশাসন পাহাড়ে বসবাসরত জনগণকে নিরাপদে সরে যেতে বারবার মাইকিং করলেও তাঁরা তাতে কোন ধরনের কর্ণপাত করছেনা। উল্টো প্রতিবছর বনবিভাগের পাহাড় দখল করে চলছে নতুন নতুন বসতি স’াপনের কাজ। এ অবস’ার কারণে বর্তমানে পাহাড়ে বেড়ে চলছে নিম্ন আয়ের মানুষের অবৈধ বসবাস। ফলে চলতি বছরের বর্ষাকালের শুরুতে এসব পাহাড়ি জনপদে বড় ধরনের পাহাড় ধসের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন স’ানীয় জনপ্রতিনিধিরা। অবশ্য ইতোমধ্যে স’ানীয় প্রশাসন আবারও বসবাসরত এসব পাহাড়ি জনপদের মানুষকে নিরাপদে সরে যেতে মাইকিং শুরু করেছে।
গত ১২ জুন দুপুরে চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের পেকুয়া উপজেলার টইটং ইউনিয়নের আঁধারমানিক নামের পাহাড়ি এলাকায় পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় স’ানীয় ওয়াহিদুল ইসলামের নতুন তৈরি করা বাঁশের বেড়া ও টিন ঘরটি পাহাড় ধসে নিমিষেই মাটিচাপা পড়ে ভেঙেগেছে। তার সুন্দর সাজানো ঘর। এসময় ভাগ্যক্রমে পরিবারের সবাই প্রাণে বাঁচলেও আহত হয় গৃহকর্তা মরতুজা। বর্তমানে পরিবার নিয়ে চরম আতংকে রয়েছে বলে জানান আহত মরতুজা। মঙ্গলবার বিকেলে এ প্রতিনিধির কাছে তিনি এ শঙ্কার কথা জানান। স’ানীয় সচেতন ব্যক্তিদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ঘরে মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে বিশাল জনগোষ্ঠী পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করে আসলেও তাদের সরিয়ে নিতে বা পুনর্বাসন করতে উদ্যোগী নয় স’ানীয় প্রশাসন। তাই বড় ধরনের কোন দুর্ঘটনা ঘটলে, এর দায় এড়াতে পারবেন না তারা। এমনকি এই প্রবল বর্ষণে পাহাড় ধ্বসের আশংকা থাকা সত্বেও তাদের সরিয়ে নিতে কোন উদ্যোগ বা বসবাসকারীরা সরে যেতে সচেতনতা তৈরি করা হয়নি। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের মছন্যাকাটা, বানিয়ারছড়া, মাহমুদনগর, পাহাড়তলী, ভিলেজার পাড়া, হারবাং ইউনিয়নের মুসলিমপাড়া, শানি-নগর, ফইজ্যার ডেবা, লম্বা ঘোনা, কৈয়ারবিল ইউনিয়নের ইসলামনগর, সুরাজপুর-মানিকপুর ইউনিয়নের উত্তর মানিকপুর, খুটাখালী ইউনিয়নের মেধাকচ্ছপিয়া, নয়াপাড়াা, কাকারা ইউনিয়নের বার আউলিয়া নগর, শাহ ওমরনগর, ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের নয়াপাড়াা, ছগিরশাহ কাটা, ছায়েরা খালী, ডুলাহাজারা ও বমু বিলছড়ি ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকায় অন্তত ২০হাজার মানুষ চরম ঝুঁকিতে বসবাস করছে। অপরদিকে একইভাবে পেকুয়া উপজেলার টইটং ইউনিয়নের সংগ্রামের জুম, বটতলীর গহীন অরণ্য মধুখালী, হারখিলারঝিরা, আধার মানিক, পুর্ব ধনিয়াকাটা, বারবাকিয়া ইউনিয়নের আবাদি ঘোনা, পুর্ব পাহাড়িয়াখালী, চাকমার ডুরি, ছনখোলার জুম ও শিলখালী ইউনিয়নের জারুরবুনিয়া, সাপের গাড়া, মাদাবুনিয়া, মাঝের ঘোনা, চিতার ঝিরি, নাপিতার ঘোনা, সবুজ পাড়া, ঢালার মুখ, পুর্ব শিলখালীতে অন্তত ১০ হাজার মানুষ গত দুই যুগ ধরে এসব মানুষ পাহাড়ি জনপদে বসবাস করছেন। জানতে চাইলে কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) হক মাহবুব মোরশেদ বলেন, চকরিয়া উপজেলার ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জে সাড়ে তিন হাজার ও ফুলছডড়ি রেঞ্জে চার হাজার পরিবারসহ বনবিভাগের ছয়টি রেঞ্জে অন্তত ১৫ হাজার পরিবার বসবাস করছে। তবে চরম ঝুঁকিতে রয়েছে দুই হাজার পরিবারের সাত হাজার মানুষ। পাহাড়ধ্বসের ঝুঁকি থেকে এসব পরিবারকে উচ্ছেদে প্রশাসন উদ্যোগ নিলে বনবিভাগের পক্ষথেকে সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হবে। চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোজাম্মেল হক শাহ চৌধুরী জানান, চুনতি রেঞ্জের আওতাধীন চকরিয়া উপজেলার হারবাং ও বরইতলী ইউনিয়নে আরও এক হাজার পরিবারের তিন হাজার মানুষ চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস’ায় পাহাড়ের ঢালুতে বসবাস করছে। পাহাড় ধ্বসে ঝুঁকি কমাতে চলতি বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই তাদের সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
চকরিয়া উপজেলার সুরাজপুর-মানিকপুর ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক আজিমুল হক বলেন, পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরত বেশিরভাগ লোক দরিদ্র শ্রেণির। এরা অভাব-অনটনে জর্জরিত হয়ে ও নদীভাঙনের শিকার হয়ে মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ে বসবাস করছে। বরইতলী ইউপি চেয়ারম্যান জালাল উদ্দিন বলেন, এসব পরিবারকে উচ্ছেদ না করে পুনর্বাসনের ব্যবস’া করতে হবে। তবে এ মুহূর্তে তাঁদের মৃত্যুঝুঁকি থেকে বাঁচাতে হলে প্রশাসনকে জরুরি ভিত্তিতে নিরাপদে সরিয়ে নিতে হবে। পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহবুবুল করিম বলেন, পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের সরিয়ে নিতে বনবিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুরউদ্দিন মুহাম্মদ শিবলী নোমান বলেন, জেলা প্রশাসকের নির্দেশে গত সোমবার থেকে উপজেলায় পাহাড়বেষ্টিত যেসব ইউনিয়নে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস রয়েছে, সেসব জায়গার চেয়ারম্যানদের প্রয়োজনীয় ব্যবস’া গ্রহণের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ইউনিয়ন চেয়ারম্যানরা সংশ্লিষ্ট এলাকায় মাইকিং শুরু করেছে। যাতে পাহাড়ে বসবাসরত লোকজন নিরাপদে সরে যেতে পারে।