ঘোড়ার ডিম

অপু বড়ুয়া
gorar-dim

চমৎকার দিন কেটে যাচ্ছে রমিজ মিয়ার। অল্প কিছু জমিজমা আছে। তাতে খেটে-খুটে চাষাবাদ করে ধানসহ নানা মৌসুমে এটা সেটা ফসল ফলিয়ে বাজারে বিক্রি করে বেশ আয় রোজগার হচ্ছে। দু’ছেলে এক মেয়ে স্কুলে পড়ছে। তারা লেখাপড়ায়ও ভালো। রমিজ মিয়ার সুখের জীবন দেখে রাগে পিত্তি জ্বলে যায় ছফর আলীর। দিন দিন এ কী উন্নতি হচ্ছে রমিজের। এটা কিছুতেই সহ্য হচ্ছে না ছফর আলীর।
কারা কারা ছফর আলীকে রমিজের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলে। ‘দেখো-ছফর আলী তুমি হলা এলাকার মান্যি লোক। অথচ সহায় সম্পদে তোমাকে টেক্কা দিয়ে যাচ্ছে রমিজ।’ ছফর আলীও ব্যাপারটা নিয়ে বেশ ভাবে। তাহলে কী করা যায়। তবে যা হোক-ছফর আলী যে একজন কৃপণ লোক এলাকায় কথাটা বেশ চালু আছে। চারপাশের কেউ ছফর আলীর বাড়িতে যায় না। কেন না ছফর আলী কোনো অতিথি-মেহমানকে মোটেই সমাদর করে না। ঘটা করে এমনকি কোন অনুষ্ঠানও করে না,যদি টাকা পয়সা খরচ হয়ে যায়। অথচ রমিজ মিয়ার অত বেশি টাকা পয়সা না থাকলেও সাধ্যমতো খরচ করে সবাইকে খুশি রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে। রমিজ মিয়ার ছেলে মেয়েরাও হয়েছে রমিজ মিয়ার মতো। সবার সাথে হাসি খুশি ভাব নিয়ে কথা বলে। সবাইকে যথাযথ ভক্তি শ্রদ্ধা করে। আর ছফর আলীর ছেলেমেয়েরা হয়েছে ঠিক উল্টো। বাবার মতো কাউকেও সম্মান দেখানোর প্রয়োজন মনে করে না। একে ওকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে চলে। ক্রমে ক্রমে একটা কথা এর মুখ ওর মুখ করে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তা হলো হাঁস মুরগির ডিম। সবাই কানাঘুষা করে ডিমের কথা এখানে আসছে কেনো। ‘আসবে না-আলবৎ আসবে। এই ডিমই তো রমিজ মিয়াকে আজ সুখী মানুষের কাতারে নিয়ে এসেছে।’ এক সময় ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে পড়ে। এদিকে রমিজ মিয়ার বৌ অনেকগুলো হাঁস মুরগি পালন করে চলেছে। তাদের খুব যত্ন আত্তি করে। সেই হাঁস মুরগির ডিম বাজারে সময়মতো বিক্রি করে তবেই না তাদের সংসারে সুদিন সুসময় এনেছে। হিসাব করে খরচপাতি করে অনেক সঞ্চয়ের ফলে রমিজ মিয়া আজ একটা ভালো অবস্থানে এসেছে।
কথাটা বেশ কানে গেল ছফর আলীর। ছফর আলী যেমন কৃপণ ছিলো তাও আবার ছিলো নিরেট বোকা। সে অন্য কোন ব্যবসাপাতি না করার চিন্তা করতে করতে মনে মনে একটা বুদ্ধি বের করে ফেলল। ছপর আলী ভাবলো রমিজ মিয়া হাঁস মুরগির ডিম বিক্রি করে আজ এতো অর্থ সম্পদের মালিক হয়েছে, ছেলেমেয়েদের মানুষ করে চলেছে। তা বেশ ভালো। ব্যবসা সেও করবে। সবাইকে চমকে দেবে। লোভী কৃপণ ছপর আলী কারো সাথে কোনো ধরনের পরামর্শ করার প্রয়োজন মনে করে না। একদিন তল্লাটে ম্যালা হৈ চৈ পড়ে যায়। কী ব্যাপার! কী ব্যাপার! ছফর আলীর কাণ্ড দেখে সবাই হতবাক। ছফর আলী করলো কি ? কোত্থেকে একটি তাগড়া ঘোড়া কিনে নিয়ে আসে। এ ঘোড়া দিয়ে ছফর আলী কী করবে ? চারদিকে ফিসফাস কানাঘুষা। ঘোড়া নিয়ে ছফর আলীর কী মতলব আঁটছে। ক’দিন যেতে না যেতে ব্যাপারটা যখন পরিষ্কার হয় তখন সবাই হাসবে কি না কাঁদবে কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। ছফর আলীর সাফ সাফ কথা। এবার দেখো আমিও রমিজ মিয়ার মতো ঠিক ঠিক বড়ো লোক হচ্ছি। তা কেমন করে। তোমরা সবাই বোকা। তাই আমার বুদ্ধির ব্যাপারটা তোমরা বোঝো না। সবাই হা হা করে।‘তা বাপু কি বুদ্ধিটা তোমার বলো দেখি।’ ‘বুদ্ধি খুব সাধারণ। ঘোড়ার ডিমের কথা শুনোনি তোমরা। ঘোড়ার ডিম। ঘোড়া কিনে ঠিক করলাম ঐ ঘোড়া যে ডিম পাড়বে তা তো রমিজ মিয়ার হাঁস মুরগির মতো সাধারণ ডিম নয়। আমি আমার ঘোড়ার ডিম বিক্রি করে ঠিকই একদিন রমিজ মিয়ার চাইতে আরো বেশি বড় লোক হয়ে যাব।’সবাই কী শুনলো। অবাক হয়ে পড়লো ছফর আলীর ঘোড়া-ঘোড়ার ডিমের ব্যাপার স্যাপার শুনে। সবাই এর ওর মুখ চাওয়া চাওয়ি করে। লুকিয়ে হাসাহাসিও করে। বোকা ছফর আলীর আজগুরি কাণ্ড, বোকাটে কথাবার্তা শুনে সবাই ‘থ’ মেরে যায়।
চারদিকে সবাই ছফর আলীর কাণ্ড দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। বলে কী ছফর আলী ঘোড়ার ডিম বেচে বড়ো লোক হবে। সবাই দ্বন্দ্বে পড়ে যায়। ঘোড়ায় ডিম পাড়ে সাত জন্মে তো এ কথা কোথাও শুনিনি। ছফর আলী এ কী কাণ্ড ঘটাতে চায়। এদিকে দিন যায় মাস যায়। ছফর আলীর ঘোড়া খায় আর খায়। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমায়। কিন্তু কই কোথায় ঘোড়ার ডিম পাড়া। তার পরও ঘোড়ার এটা সেটা খাবার জোগাতে জোগাতে ছফর আলীর টাঁক খালি হওয়ার অবস্থা।
জমা টাকাকড়ি ম্যালা খরচ হয়ে যাচ্ছে ঘোড়ার পিছনে। সে কোথায় ঘোড়ার ডিম। ডিম বেচে বড়ো লোক হওয়া-রমিজ মিয়াকে টেক্কা দেওয়া। কিছুই হচ্ছে না। এক সময় বেশ ভড়কে যায় ছফর আলী। মনে পড়ে কারো কারো কথা।
ঘোড়া ডিম পাড়ে না। ঘোড়ার ডিম বলতে কিছু নেই। স্রেফ কথার কথা। ধীরে ধীরে বুঝতে পারে ছফর আলী। সে ঝোঁকের মাথায় একটা বড়ো ভুল করেছে ঘোড়াটা কিনে। আরো বড়ো ভুল করেছে সবার সাথে মিলমিশ করে না চলে, অহংবোধ করে, রমিজ মিয়াকে হিংসা করে তার সাথে অহেতুক পাল্লা দিয়ে। এরি মধ্যে ঘোড়াটা বেশ অসুস্থ হয়ে পড়লো। সবাই বলে ঘোড়ারোগ। ঘোড়ারোগ হলে ঘোড়াকে বাইরে ছেড়ে দিতে হয়-ঘরে রাখা উচিত নয়। গেরস্তের অমঙ্গল হয়। এবার ছফর আলী সবার সাথে শলা-পরামর্শ করে। সবার বুদ্ধি ভাবনা নেয়। ঘোড়াটাকে ঠিকই বাইরে ছেড়ে দেয়। তার পর সেই কৃপণ লোভী ছফর আলী আর কৃপণ লোভী থাকে না। ছোট-খাটো ব্যবসাপাতিতে মন দিয়ে বেশ খাটাখাটুনি করে বদলে নেয় নিজের জীবনকে। ভুলে যায় নিজের আগের অহংকার-একলা চলো ভাব। এ ভাবেই আস্তে আস্তে ছফর আলী নিজকে বদলিয়ে নিয়ে সুন্দর এক গোছালো জীবন শুরু করে। ঘোড়ার ডিমের গল্প তার কাছে সত্যি দুঃস্বপ্ন মনে হয়।