ঘুষ ছাড়া মেলে না সেবা

সরকার হাবীব

মামলার আরজি, এজাহার, পুলিশ প্রতিবেদন, চার্জশিট, সাড়্গীর জবানবন্দি, রায় এবং বিভিন্ন ধরনের আদালত কর্তৃক আদেশের জাবেদা নকল সরবরাহ করেন সংশিস্নষ্ট আদালতের নকলখানা। এসব নকলখানার চিত্র অতীতের মতো এখনও নাজুক। অতিরিক্ত টাকা ছাড়া মিলছে না নকলখানাগুলোতে কোনো ধরনের সেবা। প্রত্যেক আদালতের নকলখানা যেন একেকটি ব্যবসাকেন্দ্র। ফলে বিচারপ্রার্থী মানুষ থেকে শুরম্ন করে ভোগানিত্মর স্বীকার হচ্ছেন আইনজীবীরাও। সাথে বাড়ছে বিচার বিভাগীয় দুর্নামও।
জানা গেছে, মামলার জাবেদা নকল প্রয়োজন হয় নিম্ন আদালতের আদেশের বিরম্নদ্ধে উচ্চ আদালতে যেতে হলেও। আবার মামলার রায় ও আদেশ নিজের কাছে প্রমাণস্বরূপ রাখার জন্যও অনেকে নকল সরবরাহ করে থাকেন।
আদালতসূত্রে জানা গেছে, যে কোন মামলার নথির জাবেদা নকল (সই-মোহরিযুক্ত সত্যায়িত অনুলিপি) নিতে হলে সংশিস্নষ্ট নকলখানায় নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে হয়। সরকারিভাবে নির্ধারিত কোর্ট ফি আর ফোলিও (বিশেষ এক ধরনের কাগজ) দাখিল করলেই নকল সরবরাহ করার নিয়ম। কিন’ এর বাইরেও নকলখানার কর্মচারীদের জন্য বিচারপ্রার্থী এবং আইনজীবীদের গুনতে হয় অতিরিক্ত টাকা। নির্ধারিত টাকার চেয়ে কম দিয়ে নকল পাওয়া যায় না। জরম্নরি ড়্গেত্রে নকল প্রতি হাজার টাকাও গুনতে হয় বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীদের।
আদালতসূত্রে আরও জানা গেছে, আদালতে নালিশি মামলা করতে গিয়েও অতিরিক্ত টাকা গুনতে হয় বিচারপ্রার্থীদের। সেখান থেকেও মুক্তি পাচ্ছেন না নালিশকারীরা। সংশিস্নষ্টরা বলছেন, যৌতুক নিরোধ আইনের মামলা, চেক প্রতারণা মামলাসংক্রানত্ম নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্ট অ্যাক্টের মামলাসহ বেশ কিছু মামলা সরাসরি আদালতে ফাইলিং করতে হয়। এমনকি থানায় যারা প্রভাব খাটিয়ে মামলা করতে পারেন না, তারাও আদালতে মামলা দায়ের করে থাকেন। এ প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপেও খরচাপাতি গুনতে হয় বিচারপ্রার্থীকে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক আইনজীবী বলেন, এক প্রকার বাধ্য হয়েই বিচারবিভাগীয় কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত টাকা দিতে নকল সরবরাহ করতে হয়। অতিরিক্ত টাকা না দিলে নকল যথাসময়ে সরবরাহ করা হয় না। তিনি আরও বলেন, নকলখানার কর্মচারীরা পৃষ্ঠা প্রতি মূল্য নির্ধারণ করে রেখেছেন। ওই নির্ধারিত মূল্যের কমে নকল সরবরাহ হয় না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সিএমএম আদালতের নকলখানায় প্রতি পৃষ্ঠা নকল নিতে গুনতে হয় ২ শত টাকা।
মামলার নথির জাবেদা
নকলের দরখাসত্ম দুই ধরনের করা যায়। জরম্নরি প্রয়োজনে জরম্নরি কোর্ট ফি যুক্ত করতে হয় দরখাসেত্মর সঙ্গে। আর সাধারণ নকল পাওয়ার জন্য নির্ধারিত কোর্ট ফি দিয়ে দরখাসত্ম দাখিল করতে হয়। সাধারণ নকলের জন্য ২০ টাকার কোর্ট ফি, সই মোহরীর কোর্ট ফি ১২ টাকা এবং জরম্নরি নকলের প্রয়োজনে অতিরিক্ত ১২ টাকার কোর্ট ফি দাখিল করতে হয়। আর ফোলিও দাখিল করতে হয়। প্রতি ফোলিওর দাম মাত্র তিন টাকা। একটি মামলার নকলের জন্য যত পৃষ্ঠা হোক ওই পরিমাণ কোর্ট ফি জমা দিতে হয়। শুধু ফোলিওর দাম পৃষ্ঠা প্রতি তিন টাকা করে বেশি লাগে। কিন’ নকলখানায় এর চেয়ে অনেক বেশি টাকা দিয়ে নকল সরবরাহ করতে হয়।
বিচারপ্রার্থী এনাম নামের একজন বলেন, চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালত থেকে শুরম্ন করে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (সিজেএম) আদালতসহ অসংখ্য আদালতের নকলখানার চলছে এসব নোংরা নকল বাণিজ্য। বিচারপ্রার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় করে সংশিস্নষ্ট কর্মকর্তারা ভাগ-বাটোয়ারা করে নিজেদের পকেটে ঢুকান।
নকল সরবরাহ করার ড়্গেত্রে অতিরিক্ত টাকা গ্রহণের কথা অস্বীকার করে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের নকলখানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লুৎফুর সুপ্রভাতকে বলেন, সরকারি নিয়ম মেনেই গ্রাহককে সেবা দিচ্ছেন তারা এবং তারা নকল সরবরাহ করার ড়্গেত্রে অতিরিক্ত কোন টাকা গ্রহণ করেন না।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম অঞ্চলের সাধারণ সম্পাদক আইনজীবী আখতার কবির সুপ্রভাতকে বলেন, নকলখানার দায়িত্বে যারা আছেন তাদের ঘুষ গ্রহণের পরিমাণ অতীতের মতো এখনো চলমান। ঊনচলিস্নশ টাকার এক পাতা নকল নিতে কখনো ৫ শত টাকা আবার কখনো কখনো তিন চার হাজার টাকাও দিতে হয়। আইনজীবী সমিতি এবং বিজ্ঞ বিচারকরা সিদ্ধানত্ম নিলে অবশ্যই এসব বন্ধ করা সম্ভব হবে।