ঘুরে ফিরে সেই জামায়াত প্রসঙ্গ কেন মাথাচাড়া দেয়

অজয় দাশগুপ্ত

দুনিয়ার আর সব দেশের সাথে আমাদের রাজনীতির এটাই তফাৎ। আমাদের রাজনীতি এখনো মৌলিক বিষয়ে কলহ এড়াতে পারেনি। যে সব দেশ যুদ্ধ করে স্বাধীন হয় তারা যাদের সাথে যুদ্ধ করে তাদের মিত্র করাটা ইহকালে সমীচীন মনে করে না। যদিও ওপরে ওপরে একটা ভালো সম্পর্ক রাখে। গালভারী কথায় যাকে বলে- সবার সাথে বন্ধুত্ব।
আমি ভিয়েতনাম যাবার আগে ট্রাভেল এজেন্টের সাথে বেশ সময় নিয়ে পস্ন্যান করেছিলাম। সিডনি থেকে যাবো শুনে তারা দর্শনীয় স’ানগুলো বিশেষত যেগুলোর নৈসর্গিক সৌন্দর্য আর প্রকৃতি মনোরম সেগুলো ঠিক করে রেখেছিল। নাম কা ওয়াসেত্ম কয়েকটা ঐতিহাসিক জায়গা। আমি বাধ সাধি। তাদের বুঝতে বাধ্য করি যে আমার কৌতূহল মূলত ইতিহাসে। পরে তারা উত্তর ও দড়্গিণ ভিয়েতনামের সেসব জায়গাগুলো ঠিক করে দেয় যার প্রাকৃতিক মূল্যের চাইতে ইতিহাসমূল্য অনেক বেশি।
যখন আমি উত্তরে যাই তখন আমার দেখা যুদ্ধ ময়দান, বাংকার বা অস্ত্র শস্ত্র যতটা নজর কেড়েছে তার চেয়ে বেশি মনে আছে সেখানে আমেরিকানদের ধ্বংসযজ্ঞ। দড়্গিণ ভিয়েতনামে দেখা সেই জাদুঘরটি এখনও আমার চোখে বিভীষিকাময়। নাপাম বোমার পর চারদিকে কু-লি পাকানো ধোঁয়ার ভেতর উলঙ্গ হয়ে রাসত্মায় নেমে আসা ভিয়েতনামীদের ছবি আপনাকে হতবিহ্বল করবেই। চাইলেই কি তা ভোলা যায়?
আমি দেখেছি পর্যটকদের ভেতর আমেরিকানদের বিবর্ণ চেহারা। তারা জোর করে মুখে হাসি ঝুলিয়ে কথা বললেও, তাদের মনে মনে পরাজয়ের গস্নানি এখনো প্রবহমান। অন্যদিকে বদলে যাওয়া ভিয়েতনামের নতুন প্রজন্মের ভেতর চীনের চেয়ারম্যানের চাইতে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট অনেক বেশি জনপ্রিয় হলেও তারা ইতিহাস ভোলেননি। তাদের জাতীয়তাবোধ আর জন্মপ্রক্রিয়া এখনও তাদের গর্ব। যা আমি কম্বোডিয়াতেও দেখেছি। পলপটের মতো গৃহশত্রম্নর বিরম্নদ্ধে তাদের কঠিন মনোভাব আজও সমান সক্রিয়।
একাত্তরে পরাজিত জামায়াত দমেনি। আমাদের যুদ্ধ কেবল পাকিসত্মানিদের সাথে ছিল না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের ঘরের দুশমন, দালাল-রাজাকারেরাও যুদ্ধ করেছিল। তারা নিজ দেশের মা বোনদের ইজ্জত লুণ্ঠন করা, লুণ্ঠনে সহায়তা করার পাশপাশি দেশের সাথে বেঈমানি করতে ভুল করেনি। কোনও মাফ বা মার্জনায় কাজ হয়নি। সময় বুঝে তারা আধুনিক মুসলিম লীগ, বিএনপির সাথে মিলে এদেশকে আবার পাকিসত্মান বানানোর ধান্দায় আছে। সময়, শেখ হাসিনা আর শাহবাগ তা হতে দেয়নি। সে কারণে তাদের ক্রোধ। তারা নানাভাবে অপকৌশল চালানোর চেষ্টা করে যদিও ব্যর্থ। কিন’ আজ আবার তাদের সামনে নিয়ে আসছে এককালের আওয়ামী লীগার নামে পরিচিত সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল হোসেন। এ লজ্জা রাখার জায়গা নাই। তিনি মুখে যাই বলুন না কেন, নিজেই ভালো জানেন কোন এজেন্ডা বাসত্মবায়নে তাকে সামনে আনা হয়েছে। গণতন্ত্র যদি বিষয় হতো তা তিনি নিজেই সামলাতে পারতেন। বিষয় ভিন্ন। সে কারণে কামাল হোসেন আবার জামায়াত প্রসঙ্গ সামনে নিয়ে এসেছেন। একটা বিষয় পরিষ্কার, নিবন্ধন বাতিল হোক, আর যাই হোক জামায়াত আছে।
এদিকে খবরে দেখলাম বিএনপি বলছে, তারা জামায়াতকে ছেড়ে যাবে না। যদি না জামায়াত তাদের ছেড়ে যায়। আহারে পীরিতি! এ যেন মধুর প্রেমের টেস্ট। কে কাকে ছেড়ে যায় দেখি তো- এই টাইপের। আসলে সবকিছুর মূলে হিসেব- ভোটের হিসেব। বাংলাদেশে যেকোনও সময়ই সবার মতে সঠিক, গ্রহণযোগ্য বা সর্বজনস্বীকৃত ভোট হলে এই হিসেবের দরকার পড়বে। বিএনপির আর আওয়ামী লীগের সাথে এঁটে ওঠার সময় নাই। দীর্ঘকাল গদির বাইরে, দেশ শাসনের বাইরে থাকাতে, তাদের অর্থবল কমে গেছে। জনবলও তাই কমতির দিকে। ক্যাডার বা দলের মারমুখো নেতারাও এখন ‘সাইজড’। এমন অবস’ায় তাদের রম্নখে দাঁড়ানো খালি মাইক্রোফোনে আর মিডিয়ায়। তাই তারা জামায়াতকে ছাড়বে এমন কথা জান গেলেও উচ্চারণ করবেনা।
অন্যদিকে ঝামেলায় আছেন কামাল সাহেব। সারাজীবন আওয়ামী লীগের খেয়েপরে শেষ বয়সে ব্যক্তিক্রোধ আর বঞ্চনার ঝাল মেটাতে সবার প্রিয় হবার জন্য যে পথ বেছে নিয়েছেন তার প্রথমপর্ব খতম। খামোশ বা সংলাপ কোনওটাই কাজে আসেনি। নিজে তো ভোটেই গেলেন না। যে দুজন জিতে এলো তাদেরও ঝুলিয়ে রেখেছেন। ড. কামাল হোসেনের মনে যাই থাক, মুখে তিনি জামায়াতের হয়ে কিছু বলতে পারেন না। বললে তার সাথে কাদের সিদ্দীকির আর কী তফাৎ থাকলো? কাজেই এই বয়সেও তিনি ‘ঝুট-কে সাচ্চা’ বলে চালাতে চাইছেন। একজন প্রবীণ বয়োবৃদ্ধ মানুষ কিভাবে বলেন যে তিনি জানতেন না- বিএনপির ছায়ায় জামায়াত ইলেকশন করেছিল বা করবে? না জানার কী কোনও কারণ আছে?
তারা তো দেখি প্রায় রোজই জরম্নরি মিটিং এ বসেন। সেগুলোতে কী আলোচনা হয় তবে? অনেকে এখন বলছেন, রিটায়ার্ড নেতাদের বিলাস আর হতাশাকেন্দ্র- এইসব আলোচনার ঘর। সেখানে তারা সময় কাটান। আর এমন সব কথা বলেন, যাতে মাঠ গরম থাকে। ড. কামাল হোসেন যে কারণেই হোক জামায়াত প্রসঙ্গ এনে আরও একবার মানুষের মনে প্রশ্ন আর বিরক্তি উসকে দিলেন । জবাব তাকেই দিতে হবে। একেই বলে শাঁখের করাত। সাফ সাফ বলতে না পারলে এমন তো হবেই। কেন আপনি মেরম্নদ- সোজা করে বলতে পারছেন না, জামায়াত থাকলে আমরা নাই? আর যদি চান আপনার তরফ থেকে বিভেদরেখা মুছে যাক- তাই বলুন। তা না করলে এমন দোটানায় শেষে ব্যক্তি ইজ্জতও খোয়াবেন।
জামায়াত আছে কী নাই, এই প্রসঙ্গ বারবার ফিরে এসে প্রমাণ করে-আমাদের দেশে এখনও মুক্তিযুদ্ধের রাজনীতির দিন শেষ হয় নাই। প্রমাণ করে, এখনো দেশবিরোধী স্বাধীনতাবিরোধীদের রক্তবীজ রয়ে গেছে। তাই থামার সুযোগ নাই। আছে সাবধানতা আর সতর্কতার প্রয়োজন। শেষ বয়সে ড. কামাল হোসেন কোনদিকে ডিগবাজি খেয়ে ইতি টানেন সেটাই এখন দেখার বিষয় ।
রাজনীতিতে আবারো জামায়াত প্রসঙ্গ কেন- এ নিয়ে কেউ তেমন কিছু বলে না। কারণ সব দলের ভেতরই তাদের মানুষ আছে। জামায়াত আদৌ নিষিদ্ধ হবে? বা হলে কবে হবে- তাও অস্পষ্ট। এই কুয়াশার কারণ তাদের দলগত ভিত্তি, শক্তি নাকি আমাদের দুর্বলতা?
আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, বাংলাদেশের বাসত্মবতা আর সত্য মেনে নিলে যেকোনও দলই রাজনীতি করতে পারে। তাদের অতীতের কর্মকা-ের জন্য তারা কতটা অনুতপ্ত আর কতটা পরিবর্তিত সেটাই ভাবার বিষয়। সে দিকটা কেউ পরিষ্কার করে বলে না। একদল খালি মুখে মুখে বিরোধিতা করে, আরেক দল চায় বগলে রাখতে। এখানেই যত বিপদ। ড. কামাল হোসেন ব্যক্তিজীবনে আধুনিক মানুষ। পোশাক, কথায় সাহেবী কায়দায় অভ্যসত্ম। তিনি জিন্নাহ সাহেবের মতো ধর্মের রাজনীতি বা তাদের প্রমোটার হলেও, নিজে কখনো তা করবেন না। তাই মুখে তিনি তার সংশিস্নষ্টতার কথা না বলতেই পারেন। এখনো ফতোয়া, এখনো নারীবিরোধী কথাবার্তা চলছে। নারীদের লেখাপড়া বন্ধ করে দেওয়ানোর হুকুম দেখছি আমরা। এরা কখনো সরকারের মিত্র, কখনো দুশমন। সব মিলিয়ে এসব রাজনীতি যে বিষফোঁড়া সবাই মানেন। অন্যদিকে যেটুকু বাম আদর্শ আর প্রগতিশীলতা আমাদের শক্তি ছিল তা প্রায় নির্জীব। তাই আমাদের ভয় যায় না। বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রগতি সমার্থক না হলে তা টেকসই হবে না । সরকার প্রধান শেখ হাসিনা এখন তুঙ্গে। তিনি যদি বলিষ্ঠ থাকেন তো কামাল হোসেনরা নুইয়ে পড়বেন। এটা নিশ্চিত। আর তা না হলে নানা ভেলকিবাজিতে কোনটা যে কোন সময় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে বোঝা মুশকিল। সাধু সাবধান বৈকি।