ফিরে দেখা থাইল্যান্ড

গ্রীষ্মকালীন রাজপ্রাসাদের সৌন্দর্য

রিজওয়ানুল ইসলাম

ব্যাংকক থেকে বেশি দূরে নয় আয়ুথায়া প্রদেশ। সেখানে এক সময় (১৪শ শতাব্দীতে) সাইয়াম (পড়ুন: শ্যাম) রাজ্যের দ্বিতীয় রাজধানী ছিল। আর আয়ুথায়া প্রদেশেরই বাং পা ইন জেলায় থাইল্যান্ডের রাজার গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদ। ব্যাংকক থেকে বাং পা ইনের দূরত্ব মাত্র ৬০ কিলোমিটার। আগেই বলেছি আমি সপরিবারে ব্যাংককে বসবাস করেছি বেশ কয়েক বছর। কিন্ত এই প্রাসাদ বা আয়ুথায়ার প্রাচীন নগরীটি দেখতে যাওয়া হয়নি কখনো। তখন ছেলেমেয়েরা ছোট ছিল; তারা পছন্দ করত সমুদ্র সৈকত বা খেলাধুলা করা যায় এমন জায়গায় যেতে। আর থাইল্যান্ডের আবহাওয়ায় সারাদিন ঘুরে প্রাচীন নগরী এবং রাজপ্রাসাদ দেখার বাসনা তখন এত প্রবল ছিলনা। ভাবলাম, এবারের ট্রিপে সেই খামতি পূরণ করে নেয়া যাক।
আমাদের হোটেলের লবিতেই ছিল একটি ট্যুর কোম্পানির কাউন্টার, এবং সেখানে গিয়ে জানলাম যে বাং পা ইনের প্রাসাদ এবং আয়ুথায়ার প্রাচীন নগরীর ভগ্নাবশেষ দেখবার জন্য বিভিন্ন রকমের ব্যবস্থা রয়েছে। যখন ব্যাংককে বাস ছিল তখন নিজের গাড়ি এবং চালক নিয়ে সহজেই চলে যাওয়া যেত এই ষাট কিলোমিটার। ব্যক্তিগত গাড়ি এবং ড্রাইভার ভাড়া করা যায়; কিন্তু তার জন্য খরচা হবে ম্যালা। তাছাড়া এ ধরনের জায়গায় গেলে সাথে ট্যুরগাইড থাকলে ভালো হয়। সবকিছু ভেবে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম দলীয় ভ্রমণেই যাব। আর তার অর্থ এই যে একটি নির্দিষ্ট সময়ের বাসে অন্যদের সাথে যাওয়া-আসা এবং দলের সাথে থাকা। অবশ্য তাতেও কিছু হেরফের আছে: কেউ চাইলে বাসেই যাওয়া এবং আসার বদলে ফেরার সময় নদীপথে আসতে পারে। আর আমাদের কাছে এই বিকল্পটি বেশ আকর্ষণীয় মনে হলো বিশেষ করে যখন জানলাম যে নৌকায় দুপুরের খাবারের ব্যবস্থাও থাকবে। কিন্তু যেটা বেশি পছন্দ হলনা তা হলো যাত্রা শুরুর সময় সকাল সাড়ে ছটা! আমি যে সকালের মানুষ নই। তবে সবসময় সবকিছু নিজের পছন্দমত হয়না এই কথা মনে করে ব্যবস্থা পাকা করে ফেললাম।
সকালের পর্যটকদের কথা ভেবেই বোধ হয় হোটেলে প্রাতরাশের সময় শুরু সকাল ছটায়। অর্থাৎ যাত্রা শুরু করবার আগে আমরা বেশ ভালো করেই সেই পর্ব সেরে নিতে পারলাম। একটি মাইক্রোবাস এসে আমাদেরকে তুলে নিল যথাসময়ে। তবে সেই বাস আমাদের নিয়ে নামালো আর একটি হোটেলের সামনে; সেখান থেকে আরো কিছু পর্যটকের সাথে আমরা উঠলাম একটি বড় আকারের বাসে। আধুনিক এবং এয়ার কন্ডিশন্ড সেই বাস ছিল দূরের যাত্রার জন্য যথাযথ। আর আমার চোখে তখনো ঘুম রয়ে গিয়েছিল বলে যাত্রাপথের দুপাশের দৃশ্য বেশি উপভোগ করা হয়নি। তবে এটা বুঝতে পেরেছিলাম যে শহর ছেড়ে অনেকদূর যাবার পরেই সত্যিকারের গ্রামের দৃশ্য দেখা গিয়েছিল। অর্থনৈতিক উন্নয়ন এমনই এক প্রক্রিয়া যে তার ফলে শহর ক্রমশ তার আগ্রাসী থাবা ছড়ায় চারপাশে, আর গ্রাম সংকুচিত হতে থাকে।
ন’টা বাজার আগেই আমরা পৌঁছে গেলাম বাং পা ইন রাজ প্রাসাদের প্রধান প্রবেশ পথে। আমাদের গাইড আমদের জন্য টিকেট কিনে নিয়ে এলেন। আমরা সারাদিনের জন্য যে টিকেট কিনেছি তাতে এই টিকেটের দাম এবং দুপুরের খাবারের খরচ ধরা ছিল। সুতরাং আমাদের আর আলাদা করে পকেটে হাত দিতে হলনা। আমাদের এখন করণীয় শুধু তাঁকে অনুসরণ করে বিভিন্ন স্থান দেখা এবং তাঁর বর্ণনা শোনা। তবে আমি যে সব সময় গাইডের সব কথা মনোযোগ সহকারে শুনি তা বললে মিথ্যে বলা হবে। যতটুকু আমার শোনা দরকার বলে মনে করি ততটুকুই আমি শুনি, আর বাকি সময় নিজের মত করে দেখতে থাকি।
সময় সকাল ন’টা হলে কি, রোদের তাপ ছিল প্রচণ্ড। ভাগ্যিস প্রাসাদের ভবনগুলোর দিকে যাবার রাস্তার দুপাশে ছিল সারি সারি গাছ। তাদের ছায়া আমাদেরকে সেই রোদ থেকে কিছুটা হলেও বাঁচিয়েছিল। আর তখন আমি বুঝতে পেরেছিলাম এই ট্যুরের শুরু কেন এত ভোরে।
এই প্রাসাদ প্রথম নির্মিত হয় সপ্তদশ শতকে (১৬৩২ সালে)। কিন্তু অষ্টাদশ এবং উনবিংশ শতকের রাজাগণ এটার দিকে তেমন মনোযোগ দেননি বলে রক্ষণাবেক্ষণ ভালো হয়নি, আর তার ফলে আগাছায় ঢেকে যায় স্থাপনাগুলো। উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময় রাজা মন্‌গ্‌কুত প্রাসাদটিকে পুনরুদ্ধার করতে শুরু করেন। তবে এখন সেখানে যে দালানকোঠাগুলো দেখতে পেলাম তার অধিকাংশই নাকি ১৮৭২ থেকে ১৮৮৯ সময়কালে রাজা চুলালংকর্ণের আমলে নির্মিত হয়েছিল। সেভাবে দেখলে এই প্রাসাদের ইতিহাস দেড়শ বছরের কম সময়ের। তবে সেই সময় থেকে এর রক্ষণাবেক্ষণ যে ভালো হয়েছে তা বোঝা যায় স্থাপনাগুলোর দিকে তাকালে।
বেশ খানিকটা হাঁটবার পর আমরা প্রথম দাঁড়ালাম যে স্থাপনার সামনে সেটিই এই প্রাসাদের সবচাইতে পরিচিত ভবন, যা ছবির পোস্ট কার্ড, এবং পর্যটন বিজ্ঞাপনে বহুল ব্যবহৃত। একটি জলাশয়ের মাঝখানে বসে আছে থাই বৌদ্ধ মন্দিরের আদলে নির্মিত এই ভবন। গ্রীষ্মের অপরাহ্নে রাজা-রানীর বসে মৃদু হওয়া উপভোগ করবার জায়গা সেটি। যে দেশে সারা বছরই গ্রীষ্ম বিরাজ করে সেখানে (বিশেষ করে যখন বাতানুকুলের ব্যবস্থা চালু হয়নি) এ ধরনের একটি ঘরের উপকারিতা কত সেটা বুঝতে মোটেই অসুবিধে হয়না। উত্তর ভারতে মোগল রাজাদের প্রাসাদ এবং বাগানগুলোতেও জলের এরকম ব্যবহার দেখা যায়। ভবনটির চারপাশের জলাশয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে বড় বড় সব মাছ। দর্শনার্থীদের দাঁড়াবার জায়গাটি জল থেকে এত ওপরে ছিল যে সেখান থেকে বোঝা গেলনা মাছগুলো শোল-গজার না রুই-কাতলা প্রকৃতির। মনে পড়ে গেল আমদের দেশে সিলেটের হজরত শাহজালালের মাজারে দেখা শোল-গজার মাছের কথা।
থাইল্যান্ডের সাথে চীনের সম্পর্ক কিছুটা অম্ল-মধুর ধরনের। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় যে বিভিন্ন কালে বিভিন্ন কারণে (দুর্ভিক্ষ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদি) চীন থেকে দলে দলে লোক দক্ষিণ দিকে অভিবাসন করেছে, যার একটি বিরাট অংশ এসেছিল থাইল্যান্ডে। আর তারই ফলশ্রুতিতে আজ সে দেশের জনগোষ্ঠীর এক বিরাট অংশ চৈনিক। অভিবাসীরা সাধারণভাবে শিক্ষায় এবং ব্যবসায় সফল হয়, এবং থাইল্যান্ডের চীনারাও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে বিংশ শতকের সত্তর ও আশির দশকে থাইল্যান্ডে বামপন্থীদের(যাদের প্রতি চীনের সমর্থন ছিল) সরকার-বিরোধী বিদ্রোহী কার্যকলাপের ফলে চীনের সাথে তাদের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিলনা। কিন্তু বাং পা ইনের এই গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদে সম্পূর্ণ একটি ভবন রয়েছে যা থাইল্যান্ডের রাজাকে চীনের ব্যবসায়ীরা (তৎকালীন চেম্বার অফ কমার্স)উপহার দিয়েছিল। এবং সেই ভবনটি নির্মানে পুরোপুরি চীনের স্থাপত্য ব্যবহার করা হয়েছে। স্পষ্টই বোঝা যায় যে উনবিংশ শতকের শেষভাগে এবং বিংশ শতকের গোড়ায় এই দুটি দেশের সম্পর্ক বেশ ভালো ছিল।
গ্রীষ্মকালীন এই প্রাসাদ এখনো ব্যবহৃত হয় বলে এর মূল ভবনটিতে সাধারণের প্রবেশের সুযোগ নেই। শুধুমাত্র চীনা স্থাপত্যের এই ভবনটির ভেতরে ঢোকা গেল। তবে মূল ভবনগুলো বাদেও রয়েছে পর্যবেক্ষণের স্তম্ভ আর খুব সুন্দর সাজানো বাগান। কিন্তু সকাল দশটায়ই রোদের তাপ এত ছিল যে বাগানের সৌন্দর্য বেশি উপভোগ করা গেলনা। বরং যে পথটির দুপাশে ছিল গাছের সারি আর পথ ছিল ছায়া ঢাকা সে পথে গাড়িতে ফিরে যেতেই আমরা পছন্দ করলাম বেশি।

আপনার মন্তব্য লিখুন