গ্রামের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে থাকবে কেন

সুভাষ দে

এবার চট্টগ্রাম বোর্ডের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাশের হার গতবারের তুলনায় প্রায় ৭ শতাংশ কমেছে। অন্যান্য বোর্ডেও পাশের হার কমেছে। বেশ কিছু পত্রিকা একে ‘ফলাফল বিপর্যয়’ বলেছে। পরীক্ষায় পাশের হার কম হওয়ার ব্যাপারে চট্টগ্রাম বোর্ডের কর্মকর্তা, শিক্ষাকর্তৃপক্ষ, শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে নতুন পদ্ধতি, সৃজনশীল প্রশ্ন বেড়ে যাওয়া, গণিত ও ইংরেজিতে অধিক হারে ফেল ইত্যাদি। আবার শহরের কিছু স্কুল ভাল ফল করলেও গ্রাম ও মফস্বলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকায় সামগ্রিকভাবে পাশের হার কমেছে।
এসব সরল স্বীকারোক্তি। তা হলে প্রশ্ন এসে যায়, কম পাশ করার দায়িত্ব তা হলে কে নেবে? যে সব কারণ দেখানো হয়েছে সেগুলির অধিকাংশই শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ঘটেছে। এখানে শিক্ষকদের ভূমিকাও এসে যায়।
আমি গ্রামের শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে পড়ার ব্যাপারে আলোকপাত করতে চাই। গত ৩/৪ দশকে শিক্ষা নিয়ে নানা পরীক্ষা- নিরীক্ষা, শিক্ষাকে জাতীয় লক্ষ্য ও আদর্শ থেকে বিযুক্ত করার প্রয়াস, বিদেশি অনুদান, দাতাদের পরামর্শ ও দেশীয় আমলাতন্ত্রের কারসাজিতে শিক্ষায় নানা গোঁজামিল ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসবিকৃতি, জাতীয় ইতিহাস-ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের বিপরীতে পাকিস্তানি ভাবাদর্শ অনুসরণে শিক্ষায় সাম্প্রদায়িকতার অনুপ্রবেশ, শিক্ষা নিয়ে বাণিজ্য, শিক্ষায় ধর্মীয় ভাবাদর্শের অনুকরণে সাজানোর চক্রান্ত, বিভিন্ন ধরনের শিক্ষাপদ্ধতি চালু, বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতি, সামাজিক মূল্যবোধ-এ সবের গুরুত্ব খাটো করে দেখা-এককথায় বলা যেতে পারে শিক্ষা ‘মানুষ’ হয়ে ওঠার আয়োজন-প্রচেষ্টা থেকে ছিটকে গেছে।
শহরের অভিভাবকদের আর্থিক সচ্ছলতা, কোচিং সেন্টার, নানা গাইডবই সাহায্য, প্রাইভেট পড়ার সুযোগ, স্কুলে শিক্ষকদের পাঠদান পদ্ধতি, শহরের স্কুলগুলিতে প্রশাসনের নজরদারি, সন্তানদের ব্যাপারে অভিভাবকদের খোঁজখবর নেয়া – এসব বিষয় শহরের শিক্ষার্থীদের ভাল ফল পেতে সাহায্য করে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে পিছিয়েথাকা গ্রামের ছেলেমেয়েরা তুলনামূলকভাবে বৈষম্যের শিকার হয়।
গ্রাম-শহরের ব্যবধান অর্থাৎ গ্রাম- মফস্বলের শিক্ষার্থীদের পিছিয়েপড়া আজকের নয়, কয়েক দশক ধরেই চলে আসছে অথচ অতীতে এটি ছিল না, গ্রামের শিক্ষার্থীরা ভাল ফল করেছে। ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তানি আমলেও এধারা অব্যাহত থেকেছে এমন কি স্বাধীনতার পরও কিছু সময় পর্যন্ত এটি দেখা গেছে। এর প্রধান কারণ এ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেধাবী, দক্ষ, শিক্ষকরা পাঠদানে নিয়োজিত ছিলেন। তাদের কাছে শিক্ষা ছিল মহান পেশা। তখন জীবনযাত্রা বর্তমানের মত জটিল ও সমস্যাক্রান্ত হয়নি। বেসরকারি স্কুল কলেজগুলোতে যা বেতন পেতেন তাতেই তারা সন্তুষ্ট ছিলেন, অনেক শিক্ষক প্রলোভন থাকলেও গ্রাম এবং মা-বাবার পরিজনের সান্নিধ্য ছেড়ে শহর কিংবা দূর জেলায় যেতে চাননি।
ব্রিটিশ আমলে শিক্ষকরা স্বদেশি রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন, সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তাদের ভূমিকাই ছিল মুখ্য। গ্রামের স্কুলগুলিতে নিয়মিত ক্রীড়ানুষ্ঠান, বাৎসরিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাটক, বিতর্ক এ সবের আয়োজন থাকতো। অনেক গ্রামে ছিলো সমৃদ্ধ লাইব্রেরি। শিক্ষকরা স্কুলে দলাদলি, নোংরা রাজনীতি, সাম্প্রদায়িকতা প্রশ্রয় দিতেন না, সামাজিক কাজে তারা সক্রিয় এবং গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা রাখতেন। গ্রাম-মফস্বল-মহকুমার ছেলেরাই রয়েল ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিস, পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস এমনকি বাংলাদেশ আমলের প্রথম দিকেও বিসিএস পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট করেছেন।
এখন গ্রাম ছেড়ে শহরে অভিবাসন প্রতিদিনই বাড়ছে। শিক্ষা, বিশেষায়িত শিক্ষা কিংবা বিদেশে লেখাপড়ার সুযোগ গ্রাম-মফস্বলের তরুণরা পাচ্ছেন না। প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে গ্রামের শিক্ষার্থীরা, সুযোগ-সুবিধা একচেটিয়া ভোগ করছে বড় বড় শহরের শিক্ষার্থীরা।
ভাল ফল করেছে শহর ও জেলার কিছু স্কুল। মফস্বলের স্কুলগুলিতে পাশের হার কমবে এটি স্বাভাবিক, জিপিএ-৫ আরো কম, এর ফলে তারা শহরের ভাল কলেজে ভর্তি হতে পারবে না, এর সাথে রয়েছে কলেজগুলোর আসন সংকট। শিক্ষাবিদ ও শিক্ষার সাথেসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা শহর ও মফস্বলের ফলাফল ব্যবধানের অন্যতম কারণ হিসেবে গ্রামের স্কুলগুলিতে এলাকায় ভালো শিক্ষকের অভাব, অর্থনৈতিক ও নানা সামাজিক সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন।
ফলাফল ভাল করতে চাই মানসম্মত শিক্ষা আর এর জন্য প্রয়োজন ভালো শিক্ষক। গ্রাম-মফস্বল এলাকায় গণিত, ইংরেজি ও বিজ্ঞান বিষয়গুলোতে ভালো শিক্ষকের ব্যাপক সংকট রয়েছে, তাছাড়া স্কুল পরিচালনা কমিটি সক্রিয় ও উদ্যোগী না হলে শিক্ষার মান, শিক্ষা ব্যবস্থাপনা নিয়ে সংকট কাটবে না। অভিভাবকদের আর্থিক সংকট, মেয়ে শিক্ষার্থীর বেলায় নানা সামাজিক সমস্যাও আছে। দারিদ্র্যের কারণে পুষ্টিহীনতা গ্রামে বেশি, মেধার জন্য সুষম খাবার অপরিহার্য। তাছাড়া ছেলেমেয়েদের নানাবিধ পারিবারিক কাজেও শ্রম দিতে হয়।
অন্যদিকে শহরের ছেলেমেয়েরা মোটামুটি ভালো শিক্ষক পায় স্কুলে। এর পরও অভিভাবকরা সন্তানদের জন্য প্রাইভেট-কোচিং এ সবের ব্যবস্থা করেন। এখন গ্রামের সচ্ছল পরিবার ছেলেমেয়ের পড়াশোনার জন্য শহরে চলে যাচ্ছে।
শিক্ষার ক্ষেত্রে শহর-গ্রামের এই ব্যবধানের ফলে নানা ধরনের বৈষম্য বাড়ছে। শিক্ষার সুযোগবৈষম্য থেকে অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক বৈষম্যের শিকার হতে চলেছে গ্রাম-মফস্বলের তরুণরা।
শহরের ছেলেমেয়েরা ভাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে, বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে পারছে, সরকারি বেসরকারি চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে তারা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকে, প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে গ্রামের ছেলেমেয়েরা। এর ফলে শহরের এলিট শ্রেণী রাজনৈতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রাধান্য পায়, অন্যদিকে গ্রাম-মফস্বলের তরুণরা প্রবল বৈষম্যের শিকার হয়ে এক সময় হতাশায় নিমজ্জিত হয়। কোনরূপ উচ্চাশা পূরণ কিংবা নিজেদের অবস্থান পরিবর্তনে তারা সমর্থ হয় না।
গ্রামের বেসরকারি স্কুলগুলোর অবস্থা খুবই করুণ, শিক্ষার্থী বেশি কিন্তু সে অনুপাতে শিক্ষক নেই, শিক্ষকদের এমপিও ভুক্তি সহজে হয় না। তাদের ওপর সরকারি -নানা পরিসংখ্যান, জরিপ, নির্বাচনকালীন দায়িত্ব এসবও থাকে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণও পর্যাপ্ত নয়। শিক্ষক বাড়াতে হবে এবং যোগ্য শিক্ষকদের আকৃষ্ট করতে না পারলে মানসম্মত শিক্ষার ক্ষেত্রে গ্রাম-শহর, সরকারি-বেসরকারি ব্যবধান-বৈষম্য ঘুচবে না। উপকূলীয় ও পাহাড়ি এলাকা, চরাঞ্চল, হাওর, দ্বীপাঞ্চল ও প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষাচিত্র খুবই হতাশাজনক।
শিক্ষাক্ষেত্রে কোন ধরনের বৈষম্য, পক্ষপাতিত্ব, একপেশে মনোভাব কাম্য নয়। তা হলে শিক্ষার সার্বজনীন রূপ, নাগরিক অধিকার সংকুচিত হয়ে পড়ে। সংবিধানে শিক্ষাকে সুযোগ নয়, অধিকার বলা হয়েছে, আর এই অধিকার সকল ক্ষেত্রে সমানভাবে ব্যাপ্ত ও বিকশিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
লেখক : সাংবাদিক