গ্রামীণ অর্থনীতিতে মন্দাভাব কাটাতে হবে

সুভাষ দে

সরকারি-বেসরকারি গবেষণা, পরিসংখ্যান ও অর্থনীতিবিদদের অভিমতে গ্রামীণ অর্থনীতির মন্দাভাব উঠে এসেছে। প্রবাসী আয় কমে যাওয়া, পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেকার হয়ে যাওয়া শ্রমিক, চালসহ জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি কারণে গ্রামীণ অর্থনীতি পিছিয়ে পড়েছে- বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকনমিক মডেলিং (সানেম) সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। ব্যাংক আমানত রাখা ও ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে গ্রামীণ মানুষের অংশগ্রহণ কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ব্যাংকে ২০১৬ সালে মোট আমানতের ২০.৫০ শতাংশ গ্রামীণ মানুষের, ২০১৭ সালে তা এসে দাঁড়িয়েছে ২০.২৮ শতাংশ, অনুরূপ মোট ঋণের ১০.১৭ শতাংশ গ্রামীণ মানুষের ২০১৭ জুনে এসে তা দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ০৭ শতাংশে।
বিবিএস এর প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, ২০১৬ সাল শেষে গ্রামের মানুষের গড় মাসিক আয়ের চেয়ে গড় মাসিক ব্যয় বেশি হয়েছে। ২০১৬ সালে গ্রামে একটি পরিবারের মাসিক আয় ছিল ১৩ হাজার ৩৫৩ টাকা, আর তাদের মাসিক ব্যয় ১৪ হাজার ১৫৬ টাকা। গ্রামের পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস প্রবাসীদের পাঠানো টাকা। গত ৩ বছরে রেমিট্যান্স কমার প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়েছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে ১ হাজার ৫৩১ কোটি ৬৯ লাখ (১৫ দশমিক ৩১ বিলিয়ন), ২০১৬-১৭ সালে ১৪ শতাংশ কমে রেমিট্যান্স দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৭৭ কোটি ডলারে। বেসরকারি সংস্থা ‘সানেম’ এর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হানের পর্যবেক্ষণ, বেশ কিছুদিন আগেও গ্রামের মানুষ প্রবাসী আয় দিয়ে বিভিন্ন উপশহরে জমি কিনতো, এখন গ্রামের মানুষের সেই অবস্থা নেই। এছাড়া গ্রামের মানুষের হাতে টাকা কমে যাওয়ায় জমির দাম কমেছে এর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। (সূত্র : সুপ্রভাত বাংলাদেশ, ১১ জানুয়ারি’২০১৭)
প্রবাসীদের আয় করা অর্থে আমাদের দেশে গ্রামীণ জীবনে মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ ঘটছে দ্রুত, এই অর্থে তাদের পরিবারের সদস্যদের মধ্য থেকে ক্ষুদে উদ্যোক্তাও গড়ে উঠছে যারা উপজেলা ও গ্রামের বাজারে ছোট ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ছোট ওয়ার্কশপ, ডিজিটাল সেন্টার গড়ে তুলেছে। মানুষের জীবনযাত্রার মান কিংবা আর্থিক সক্ষমতা কমে গেলে সামগ্রিকভাবে গ্রামীণ ব্যবসা-বাণিজ্য-অর্থনীতিতে মন্দাভাব আসবে।
শিল্পখাতে ৮ থেকে ৯ লাখ শ্রমিক কাজ হারিয়েছে- এটি সরকারি ভাষ্য। এদের অধিকাংশই গ্রামের। বিজিএমইএ’র তথ্য অনুযায়ী গত ৪ বছরে ১ হাজার ২০০ ফ্যাক্টরি বন্ধ হওয়ায় এই বিপুল সংখ্যক মানুষ চাকরি হারিয়েছে। তাদের আয়ের ওপর গ্রামে নির্ভরশীল পরিবারের আর্থিক সক্ষমতা কমে গেছে। এদের নতুন করে কর্মসংস্থান হয়নি, শ্রমিক কাজ হারালে অর্থনীতির গতি যেমন প্রতিবন্ধকতায় পড়ে তেমনি জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
গ্রামীণ মানুষের আর্থিক সক্ষমতা কমে যাওয়ার আর একটি বড় কারণ চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্যবৃদ্ধি। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার মোয়াজ্জেম এর মতে, ‘গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা রাখে যে সব প্রতিষ্ঠান, সেইসব প্রতিষ্ঠানে চাহিদা অনুযায়ী বিনিয়োগ হয়নি, আবার গ্রামের মানুষের আয় না বাড়লেও তাদের ভোগাচ্ছে প্রয়োজনীয় জিনিসের উচ্চদাম। গত এক বছরে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি, পাশাপাশি ঐ সময়ে শ্রমিকের মজুরি হারও কমে গেছে, এর অর্থ হলো মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে’। (সূত্র : সুপ্রভাত বাংলাদেশ, ১১ জানুয়ারি-২০১৭-)। গত ১ বছর থেকেই চালের দাম বেড়ে চলেছে বিশেষ করে গত ৬ মাসে তা অস্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছেছে। মোটা চালের দাম ১ কেজিতে ১২-১৩ টাকা বেড়েছে। পেঁয়াজের দাম আগের স্বাভাবিক দরের চাইতে দ্বিগুণ, ২/৩ মাস আগে আরো বেশি ছিল। এর ফলে গ্রামের মানুষের কষ্ট বেড়েছে। চাল কিনতে গিয়ে অন্যান্য ভোগ্যপণ্য প্রয়োজনমতো কেনা সম্ভব হচ্ছে না। পুষ্টিকর খাবার অর্থাৎ মাছ, মাংস কেনা কম হচ্ছে এতে পুষ্টি ঘাটতিও দেখা দিচ্ছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র উৎপাদনকারীরাও অবদান রাখেন। বিশেষ করে শাকসবজি, মৎস্য, পোলট্রি এসব খাতে এখন গ্রামীণ ক্ষুদ্র উৎপাদনকারীর সংখ্যা কম নয়, এখানে মহিলারাও যুক্ত আছেন। তাছাড়া কৃষক সমাজের সচ্ছল অংশও গ্রামীণ অর্থনীতি-সমাজ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখেন কিন্তু এসব ক্ষুদ্র উৎপাদনকারীরা তাদের উৎপাদিত ফসল, পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাননা। যোগাযোগ এবং বাজারজাতকরণে নানা সীমাবদ্ধতার কারণে মধ্যস্বত্বভোগী, শহরের ফড়িয়ারা তাদের ঠকায়। তারা ন্যায্যমূল্য পান না। উৎপাদিত ফসলের জন্য আগে থেকে নেয়া ঋণ পরিশোধ, কোনভাবে নিজেদের ব্যবহারের জন্য কিছু রেখে একেবারে কমমূল্যেই উৎপাদিত পণ্য বেচে দিতে বাধ্য হন তারা। এতে তাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা কমে যায়। জীবনযাত্রাও বিপর্যস্ত হয়।
আমাদের দেশে গ্রামীণ অর্থনীতিতে, গ্রামীণ জীবনে পরিবর্তন শুরু হয় মূলত বিগত শতকের আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে। এ সময় উপজেলা পদ্ধতি চালু হয়। দেশের থানা কেন্দ্রগুলি প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের ছোঁয়ায় অনেকটা গতিশীল হয়। উপজেলার নিজস্ব বাজেট থেকে উন্নয়ন হয় ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত যদিও নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, অস্বচ্ছতা স্থানীয় সরকার পদ্ধতিকে বিতর্কমূলক করে তোলে তবুও গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত শুরু হয় উপজেলাকে কেন্দ্র করেই।
আশির দশকের মাঝামাঝি থেকেই গার্মেন্টস শিল্প বিকশিত হতে শুরু করে, গ্রামের নারীরা এ কাজে যুক্ত হতে শহরে পাড়ি জমায়। তাদের উপার্জনে পরিবারে কিছুটা হলেও সচ্ছলতা আসে। আশি-নব্বই দশক থেকে মধ্যপ্রাচ্যের নানা দেশে জনশক্তি রপ্তানি শুরু হয়। বর্তমানে ১ কোটিরও বেশি মানুষ বিশ্বের নানা দেশে কাজ করছেন। এদের অধিকাংশই গ্রামের মানুষ। প্রতি পরিবারের ৪ জন সদস্য থাকলেও এই জনগোষ্ঠী ৪-৫ কোটি হবে তাদের পাঠানো অর্থে আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য পুষ্ট হতে শুরু করেছে।
সে সাথে আছে সরকারি-বেসরকারি ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্প। কৃষি ও কৃষি সহায়ক নানা শিল্প ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে সরকারি ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠান এবং এনজিওদের ঋণদান কর্মসূচি ছড়িয়ে আছে গ্রামে। এনজিওদের সুদের হার চড়া তবে এখন সরকারি ও নানা রাজনৈতিক-সামাজিক চাপে এসব প্রতিষ্ঠানের ঋণদান কর্মসূচিতে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে।
সরকারের পল্লী বিদ্যুতায়ন কর্মসূচির ফলে দেশের অধিকাংশ গ্রামে বিদ্যুৎ এসেছে। তথ্যপ্রযুক্তিও এখন ইউনিয়ন লেভেল পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। গ্রামাঞ্চলে শিক্ষা-স্বাস্থ্য কর্মসূচির প্রসার হয়েছে সরকারি-বেসরকারিভাবে। উপজেলা সদর এখন কর্মচাঞ্চল্যে মুখর। গ্রামাঞ্চলে মেয়েদের শিক্ষা বেড়েছে, মাধ্যমিক পর্যায়ে ছেলে মেয়ে প্রায় সমান সমান। গ্রামের কৃষি, কৃষি সহায়ক কাজে নারীরা ভূমিকা রাখছেন। এখন গ্রামের বাজারগুলিতে দেশি বিদেশি সকল পণ্য প্রায় একই দামে বিক্রি হচ্ছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রভূত উন্নতি হয়েছে। লোকেরা গ্রাম থেকে উপজেলা সদর কিংবা মহাসড়কের পাশে বড় বাজার গঞ্জে কেনাকাটা খাওয়া দাওয়া সেরে বাড়ি ফিরছেন। বিনোদন ও সামাজিক যোগাযোগ বেড়েছে। গ্রামীণ উন্নয়ন তথা গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণচাঞ্চল্য বিদেশি অর্থনীতিবিদ, পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি কেড়েছে।
বিশেষ করে গ্রামীণ নারীর ক্ষমতায়ন, গ্রামীণ অর্থনীতিতে তাদের ভূমিকা দিন দিন বাড়ছে। এখন গ্রামীণ জীবনে মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ ঘটছে, এমন কি ছোট মাঝারি বুর্জোয়া শ্রেণিও গড়ে উঠছে। রাজনৈতিক-সামাজিক ভূমিকার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে উপজেলা, গঞ্জগুলি। বর্তমান পরিস্থিতিতে গ্রামীণ অর্থনীতি যদি চাঙ্গা করা না যায়, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে সঠিক দৃষ্টি দেয়া না যায় তবে তা জাতীয় প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব-প্রতিক্রিয়া ফেলবে গ্রামাঞ্চলে মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানো না গেলে কাজের আশায় মানুষ শহরের দিকে ছুটবে, চাপ বাড়বে নগরগুলির ওপর। এজন্যে গ্রামাঞ্চলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ে তোলা, ছোট উদ্যোক্তা শ্রেণি গড়ে তুলতে সরকারি-বেসরকারিভাবে নানা উদ্যোগ প্রয়োজন। দেশে শিল্পায়ন অপরিহার্য, গার্মেন্টস শিল্পের উন্নতি ও অগ্রগতিতে প্রচেষ্টা নিতে হবে। শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের কর্মসংস্থানে এসব বেশি প্রয়োজন। সরকার গ্রামীণ ও শহর এলাকায় অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার কাজ শুরু করেছে। গ্রামীণ অর্থনীতি এতে শক্তিশালী হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বিনোদন সুবিধা বাড়াতে হবে গ্রামাঞ্চলে, তথ্যপ্রযুক্তির ছোঁয়ায় গ্রামীণ জীবন শতাব্দীর জড়তা কাটিয়ে কর্মচাঞ্চল্যে মুখর হবে। তবে ২০১৮ সালে গ্রামীণ অর্থনীতি তার মন্দাভাব কিংবা পিছিয়ে পড়া থেকে উঠে আসতে পারে। কারণ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, এ নির্বাচনকে ঘিরে গ্রামে সরকার উন্নয়ন কাজে আরো গতি আনবে। নানা প্রকল্প, সাহায্য ও প্রণোদনামূলক কর্মসূচি নিতে পারে সরকার। নির্বাচনে বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা গা-ঝাড়া দিয়ে উঠছেন, শহর থেকে রাজনৈতিক নেতারা গ্রামে ছুটে আসবেন, তারা নানা সাহায্য সহযোগিতার হাত বাড়াবেন। নির্বাচন এলে এমনিতেই গ্রামীণ জীবন চঞ্চল হয়ে ওঠে। আমাদের জনসংখ্যার এক চতুর্থাংশ দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করে। এদের অধিকাংশ গ্রামীণ জনগোষ্ঠী অর্থনীতিবিদরা বলছেন, খাদ্যমূল্যস্ফীতি, প্রাকৃতিক বিপর্যয়জনিত কৃষি ক্ষতি, চাকরি হারানো শ্রমিকদের যারা অধিকাংশ গ্রামীণ জনগোষ্ঠী তাদের দুরবস্থা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সুবিধা পেতে উচ্চ ব্যয় এবং আরো নানা কারণে বেশি মানুষ দারিদ্র্য সীমায় চলে আসতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি অর্থনৈতিক-সামাজিক বৈষম্য আরো বাড়িয়ে দেবে, সামাজিক অসন্তোষও তৈরি হতে পারে। সুতরাং গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি আনা এবং একে বিকশিত করার ক্ষেত্রগুলিতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ দৃশ্যমান হোক।
লেখক : সাংবাদিক