গোলাম মুরশিদের সাক্ষাৎকার

ঢাকায় একুশের বই মেলায় গোলাম মুরশিদ (বামে) ও স্বরোচিষ সরকার

বাংলাদেশ বিষয়ক গবেষণায় অত্যন্ত জনপ্রিয়তার অধিকারী ড. গোলাম মুরশিদ। ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতি, জীবনী, ভাষাতত্ত্ব, অভিধান, মানবীবিদ্যা প্রভৃতি তাঁর আগ্রহের বিষয়। এসব বিষয়ের উপরে রয়েছে তাঁর অর্ধশতাধিক গ্রন্থ ও প্রবন্ধ। তাঁর গবেষণার বৈচিত্র্য, মৌলিকত্ব ও গুরুত্ব বিবেচনায় বাংলাদেশে তিনি অদ্বিতীয়।
ড. গোলাম মুরশিদের জন্ম ১৯৩৯ সালের ৮ এপ্রিল বরিশালের উজিরপুর উপজেলার ধামুরা গ্রামে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এমএ করেছেন। প্রথম কর্মজীবন ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। প্রায় দু দশক তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন। ১৯৮৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত তিনি লন্ডনের বিবিসি বাংলা বিভাগে কাজ করেছেন। এ ছাড়া, ১৯৯১ সাল থেকে লন্ডনে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় ও একটি সিক্সথ ফর্ম বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। বর্তমানে অবসর জীবনে প্রধানত লন্ডনেই বাস করেন।
‘সুপ্রভাত বাংলাদেশ’ পত্রিকার অনুরোধে তাঁর এই সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করা হয়েছে।

প্রশ্ন : উনিশশো সত্তরের সূচনায় আপনার সম্পাদনায় ‘বিদ্যাসাগর’ নামে একটি বই প্রকাশ পায়। বইটি প্রকাশের খবর তখন আকাশবাণী কলকাতা থেকে, এমনকি রয়টার থেকেও পরিবেশন করা হয়। বইটির মধ্যে এমন কী বৈশিষ্ট্য ছিলো, যা তখন এমন সমাদর লাভ করে?
মুরশিদ: ১৯৭০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিদ্যাসাগরের দেড় শো বছর পূর্তি হয়। এই উপলক্ষে এই বই রচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিলো। বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৭১ সালের ১৭ জানুয়ারি তারিখে। এতে ছিলো ১২জন লেখকের ১৪টি প্রবন্ধ। তখনও পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে বিদ্যাসাগরের দেড় শো বছর পূর্তি উদ্‌্‌যাপনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অপর পক্ষে, সে সময়ে পূর্ববঙ্গে একটা জোয়ার এসেছিলো ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদের। আমরা যারা এই বইতে লিখেছিলাম, তাদের সঙ্গে রাজনীতির কোনো যোগাযোগ ছিলো না। আমরা বরং সেই ধর্মনিরপেক্ষতার সংস্কৃতি দিয়ে প্রভাবিত হয়েছিলাম। তারই একটা বহিঃপ্রকাশ বিদ্যাসাগর স্মারকগ্রন্থ।

প্রশ্ন : মুক্তিযুদ্ধের সূচনায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের যে দশ জন শিক্ষককে হত্যা করা হবে বলে তালিকা করা হয়, তার মধ্যে আপনার নাম ছিলো। আপনি কি আন্দাজ করতে পারতেন, ঠিক কী কী কারণে তৎকালীন সরকার আপনাকে অখণ্ড পাকিস্তানের শত্রু মনে করতো?
মুরশিদ: আমি রাজনীতি-সচেতন নাগরিক ছিলাম চিরদিন। কিন্তু রাজনীতি করিনি কখনো। কাজেই হত্যার তালিকায় আমার নাম থাকাটা একটা বিস্ময়ের ব্যাপার। আমার ধারণা, ২১ মার্চ তারিখে কলকাতার আকাশবাণী কেন্দ্র থেকে প্রচারিত ‘সংবাদ-সমীক্ষা’য় বিদ্যাসাগর গ্রন্থের বিস্তারিত আলোচনা হয়েছিলো এবং তা পাকিস্তানী নিরাপত্তা বিভাগের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলো। তা ছাড়া, বিদ্যাসাগর স্মারকগ্রন্থ প্রকাশের খবরাখবর যে-রকম সাড়ম্বরে জাতীয় পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিলো, তাও নিরাপত্তা বিভাগকে সচেতন করে থাকবে।

প্রশ্ন : মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আপনি কলকাতায় ছিলেন। আনন্দবাজার, দেশ ইত্যাদি পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সাংস্কৃতিক পটভূমি নামে একটি বই প্রকাশ করেছিলেন হাসান মুরশিদ ছদ্মনামে। প্রথম দিকে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই সময়ের স্মৃতি নিয়ে লিখেছেন যখন পলাতক। আরো পরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লিখেছেন মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর। শেষোক্ত বইয়ে এক ধরনের হতাশা লক্ষ করি। দু-একটা আশাব্যঞ্জক দিকের কথা শুনতে চাই।
মুরশিদ: পূর্ববঙ্গে বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে-প্রবল জোয়ার এসেছিলো, তা-ই শেখ মুজিবুর রহমানের অতুলনীয় নেতৃত্বে স্বাধীন ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশে পরিণত হয়। তখন লাখ লাখ লোক নিহত হয়েছিলেন, নারীরা ধর্ষিতা হয়েছিলেন, বলতে গেলে সোনার বাংলা শ্মশানে পরিণত হয়েছিলো। জনগণের প্রত্যাশা ছিলো আকাশ-প্রমাণ। সবাই আশা করেছিলেন যে, এতো মূল্য দিয়ে কেনা বাংলাদেশে তাঁরা সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে বেঁচে থাকতে পারবেন। কিন্তু তখনকার মতো তাঁদের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। দেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক অবস্থা তাঁদের দারুণ হতাশ করেছিলো। আমিও হতাশ হয়েছিলাম।

প্রশ্ন : ১৯৭২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় আপনাকে ‘বিদ্যাসাগর বক্তৃতা’ দিতে আহ্বান করে। আপনি সেখানে রবীন্দ্রনাথের উপরে ছটি বক্তৃতা প্রদান করেন। সেগুলোর উপরে ভিত্তি করে প্রণীত হয় ‘রবীন্দ্রবিশ্বে পূর্ববঙ্গ পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রনাথ’। বাংলাদেশের মানুষের আত্মপরিচয়ের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পৃক্ততা সেখানে আলোচনা করেছেন। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে রবীন্দ্রনাথ কী হিসেবে টিকে থাকবেন বলে আপনার ধারণা?
মুরশিদ: রবীন্দ্রনাথ তখন ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালিয়ানার প্রতীক। আজও তাই। পাকিস্তানি শাসন-শোষণের মুখে তিনি জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলেন। তাঁকে নিয়ে আমরা লড়াই করেছিলাম। এখন অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। রবীন্দ্রনাথ তাই টিকে থাকবেন কবি হিশেবে, সুরকার-গীতিকার হিশেবে; ছোটোগল্পকার-নাট্যকার হিসেবে – প্রতিবাদের প্রতীক হিশেবে নয়।

প্রশ্ন : সত্তরের দশকের মাঝামাঝি আপনি দুটি বড়ো কাজ করেছেন। একটি রাজশাহীতে আপনার পিএইচডি গবেষণা, অন্যটি মেলবোর্নে আপনার পোস্টডক্টরাল গবেষণা। সাহিত্যের মধ্যে সমাজতত্ত্ব অনুসন্ধান উভয় গবেষণার মূল বৈশিষ্ট্য। প্রথমটি থেকে ‘সমাজ সংস্কার আন্দোলন ও বাংলা নাটক’ এবং দ্বিতীয়টি থেকে ‘সংকোচের বিহ্বলতা: আধুনিকতার অভিঘাতে বঙ্গরমণীর প্রতিক্রিয়া’ বই তৈরি হয়। বিশেষভাবে শেষের বইটি উপমহাদেশে মানবীবিদ্যা চর্চায় পাইওনিয়ার। সাহিত্যের সমাজতত্ত্ব বিষয়ক এসব গবেষণার পেছনে আপনার বিশেষ কোনো প্রেরণা ছিলো কি?
মুরশিদ: আমি আগাগোড়াই সাহিত্যের সঙ্গে সমাজকে মিলিয়ে দেখতে অভ্যস্ত ছিলাম। বিদ্যাসাগর স্মারক গ্রন্থে আমার প্রবন্ধ থেকেও সেটা দেখা যাবে। যুদ্ধের আগেই আমি রবীন্দ্রনাথের সমাজ-সচেতনতা নিয়ে পিএইচডির কাজ শুরু করেছিলাম। তার ওপর ১৯৭৪ সালে অধ্যাপক তপন রায়চৌধুরী আসেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি ইতিহাসের নানা ধারা সম্পর্কে অত্যন্ত মূলবান আটটি বক্তৃতা দেন। সেই বক্তৃতা থেকে সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসের প্রতি আমার আগ্রহ অনেক বৃদ্ধি পায়।
তখন আমি উনিশ শতকের বঙ্গদেশের সমাজ-সংস্কার বিষয়ে গবেষণা করতে শুরু করি। দেখতে পাই যে, এই সমাজ-সংস্কারমূলক কাজের চোদ্দো আনাই নারীদের অবস্থা উন্নয়ন করার সঙ্গে যুক্ত। মেলবোর্নে আমি এর মধ্য থেকে নারীদের অংশটাইকেই বেছে নিই। এবং বিষয়টাকে দেখি নারীমুক্তি ও নারীবাদের আলোকে। সেদিক থেকে তপন রায়চৌধুরী পরোক্ষভাবে আমার গুরু, প্রেরণাদাতা।

প্রশ্ন : আশির দশকের সূচনায় আপনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান। এ সময়ে আপনার একাধিক বই বাংলা একাডেমি প্রকাশ করে। কর্মক্ষেত্রে আপনার পদোন্নতি হয়। আর তখনই আপনি বিবিসি বাংলা বিভাগের চাকরি নিয়ে দেশ ত্যাগ করেন। আপনি কি তখনই বুঝতে পেরেছিলেন যে, আপনার গবেষক-জীবন তাতে বাধাগ্রস্ত হবে না?
মুরশিদ: আমি যখন গিয়েছিলাম, তখন ধারণা করেছিলাম যে, যাচ্ছি অল্প কয়েক বছরের জন্যে। এবং লন্ডনে আছে সোনার খনির মতো গবেষণার অফুরান উপকরণ। সেখানে গবেষণার উপকরণ সংগ্রহ করবো। কিন্তু কার্যকারণে লন্ডনেই থেকে যেতে হলো। ফেরা হলো না। চিরজীবন অধ্যাপনা করেছি।
সেখানকার কাজটাও ছিলো একেবারে অন্য ধরনের। কিন্তু কথায় বলে না, ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে! আমি তাই লন্ডন গিয়েও গবেষণা চালিয়ে যেতে থাকলাম। এবং পেছনের দিকে তাকিয়ে এখন বলতে হয় যে, লন্ডনে না-থাকলে আশার ছলনে: মাইকেল-জীবনী, কালান্তরে বাংলা গদ্য অথবা আঠারো শতকের বাংলা গদ্যের মতো গ্রন্থ কোনো কালে লেখা হতো না। এসব বইয়ের উপকরণ পেয়েছিলাম ব্রিটিশ মিউজিয়ম লাইব্রেরিতে, বিশেষ করে তার একাংশ ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে। আমার দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন এসেছিলো বিলেতের সমাজে বাস করার ফলে। গবেষণার সুযোগ এবং সময়ও পেয়েছিলাম।

প্রশ্ন : কিন্তু এসব গবেষণার ফলে আপনি তো আর্থিকভাবে লাভবান হননি। তাহলে এগুলো কেন করলেন?
মুরশিদ: মানুষ কি কেবল আর্থিকভাবে লাভবান হবার জন্যে কাজ করে? আমার পেশা যখন যাই হোক না কেন, গবেষণা ছিলো আমার সত্যিকার নেশা। আজও সেই প্রবল নেশা ছাড়তে পারিনি – যদিও অবসর নিয়েছি অনেক বছর আগে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমার ধান ভানার কাজ চালিয়ে যেতে চাই।

প্রশ্ন : বিবিসি বাংলায় আপনি বেশ কয়েকটি ধারাবাহিক অনুষ্ঠান করেছেন: কখনো গান নিয়ে, কখনো সংস্কৃতি নিয়ে। অব্যাহত রেখেছেন পড়াশুনা ও গবেষণা। ‘হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি’ এরই পরোক্ষ ফল। কিন্তু এ বই লিখতে দীর্ঘ দিনের প্রস্তুতি প্রয়োজন। সেই প্রস্তুতি কিভাবে নিয়েছিলেন?
মুরশিদ: এই প্রস্তুতি আমি আমার সারা জীবন ধরেই নিয়েছিলাম। আমি হচ্ছি ইংরেজিতে যাকে বলে জ্যাক অব অল ট্রেডস – সব বিষয়ই একটু একটু জানি। তা ছাড়া, বাঙালি সংস্কৃতি সম্পর্কে লেখার জন্যে যে-অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি দরকার, তা আমি সারা জীবন ধরে আত্মস্থ করেছিলাম। তপন রায়চৌধুরী, শিবনারায়ণ রায়, অসীম রায়, রবীন্দ্রকুমার দাশগুপ্ত, আনিসুজ্জামান প্রমুখ পণ্ডিতজনের সঙ্গে আলোচনা করেও উপকৃত হয়েছিলাম। যেসব বিষয় আমি জানতাম না, তা পড়ে নিয়েছি। যেমন স্থাপত্য। স্থাপত্যের কয়েকটি বই কিনে কয়েক মাস পড়ে আমি স্থাপত্য জিনিশটার ব্যাকরণ ও রীতি বোঝার চেষ্টা করেছি।

প্রশ্ন : আপনার একটি বই ‘কালাপানির হাতছানি: বিলেতে বাঙালির ইতিহাস’। বইটি প্রকাশিত হওয়ার পরে লনডন-প্রবাসীদের একটি অংশ আপনার উপরে ক্ষুব্ধ হয়েছিলো। সত্য উদ্‌ঘাটনের জন্য পর্যাপ্ত পরিশ্রমের পরে এই ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতিতে আপনার মনের অবস্থা কেমন হয়?
মুরশিদ: কালাপানির হাতছানি মৌলিক গবেষণার ফল। আমিই আবিষ্কার করি প্রথম বিলেতগামী বাঙালি হিন্দু ঘনশ্যাম দাসের কথা, যিনি রামমোহন রায়ের ষাট বছর আগে বিলেতে গিয়েছিলেন। আবিষ্কার করি আনন্দচন্দ্র মজুমদারের কথা।
এমন কি, প্রধানত সিলেট অঞ্চল থেকে যে-নাবিকরা গিয়ে বিলেতে স্থায়ীভাবে বাঙালিদের বসতি গড়ে তোলেন, সে সম্পর্কেও মৌলিক গবেষণা ছিলো। বইটির শেষ দুই অধ্যায়ে ছিলো বর্তমানে বাসরত বাঙালিদের কথা। বিতর্কটা সেই দুই অধ্যায় নিয়ে। যে-নাবিকরা গিয়েছিলেন, তাঁরা বেশির ভাগ লেখাপড়া জানতেন না, টিপসই করে পাসপোর্ট করেছিলেন। এই সত্যটা তাঁদের বংশধরেরা শুনতে রাজি ছিলেন না। তবে এই মনোভাব কিছু নতুন নয়। এর আগে মনিকা আলির উপন্যাস ব্রিক লেইন এবং শাকুর মজিদের লন্ডনী কইন্যা-ও তাঁদের ক্ষুব্ধ করেছিলো। মানিকা আলি এবং শাকুর মজিদ – দুজনই সিলেটের মানুষ।

প্রশ্ন : ২০১৩-১৪ সালে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়েছে আপনার সম্পাদিত ‘বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান’। এই অভিধানটি এ পর্যন্ত প্রকাশিত বৃহত্তম বাংলা অভিধান। এই অভিধানের অভিনবত্ব সম্পর্কে আপনার নিজের মূল্যায়ন কী?
মুরশিদ: বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধানে প্রতিটি শব্দের প্রথম লিখিত ব্যবহারের দৃষ্টান্ত ও অর্থ, এবং তারপর কয়েক শতাব্দী ধরে সেসব শব্দের রূপ এবং অর্থের যে-পরিবর্তন ঘটে, তার ইতিহাস উদ্ধার করা হয়েছে। দু শো বছর ধরে বাঙালিরা অসংখ্য অভিধান রচনা করেছেন। কিন্তু এ ধরনের অভিধান রচনা করেননি, অথবা তার কথা ভাবেনওনি। আমরা অন্য অভিধান থেকে শব্দ সংকলন করিনি। শব্দ এবং তাদের দৃষ্টান্ত সংগ্রহ করেছিলাম মূল পাণ্ডুলিপি এবং বই থেকে। এ অভিধানের কোনো তুলনা বাংলা অথবা উপমহাদেশীয় কোনো ভাষায় নেই। এটি একটি পথিকৃতের কাজ।

প্রশ্ন : এ বছর প্রকাশিত হয়েছে আপনার ‘রেনেসন্স বাংলার রেনেসন্স’। রেনেসন্স ও বাংলার জাগরণ নিয়ে প্রায় এক শতাব্দী ধরে নানা ধরনের আলোচনা হয়েছে। এতোকাল পরে এই বইয়ে আপনি নতুন কী কথা বলতে পেরেছেন বলে আপনার ধারণা?
মুরশিদ: ইটালিতে রেনেসন্স এসেছিলো প্রধানত চিত্রকলা এবং স্থাপত্যে। এটা বোঝানোর জন্যে অত্যাবশ্যক চিত্রকলা এবং স্থাপত্যের মধ্যে যে-নূতনত্ব এসেছিলো, তার দৃষ্টান্ত দিয়ে। কিন্তু সুশোভন সরকার, শিবনারায়ণ রায়, বিনয় ঘোষ প্রমুখ যে-লেখকরা রেনেসন্স নিয়ে আলোচনা করেছেন, তাঁরা ছবি দিয়ে জিনিশটা বোঝাননি, নিজেরাও বুঝেছিলেন কিনা সন্দেহ করি। তাঁরা লিখেছিলেন ইয়াকব বুর্কহার্টের রেনেসন্সের ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করে। বুর্কহার্ট যে-চিত্তজাগরণ সম্পর্কে লিখেছিলেন, তার অনেকটাই ঠিক রেনেসন্সের সময়কার নয়, তার পরবর্তী ‘এনলাইচেনমেন্টে’র সময়ে এেেসছিলো। আমার বিশ্বাস আমি ইটালির রেনেসন্সের দৃষ্টান্ত দিয়ে পরে তার সঙ্গে বঙ্গীয় রেনেসন্সের যে-আলোচনা করি, তা নতুন।

প্রশ্ন : মধুসূদনের জীবনী লেখার পরে অনেকেই আপনার কাছে নজরুলকে নিয়ে ঠিক একই ধরনের একটি জীবনী প্রত্যাশা করেছেন। আপনি সে কাজ শুরু করেছেন বলে শুনেছি। তার অগ্রগতি সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?
মুরশিদ: আমি ইতিমধ্যে দুটি অধ্যায় রচনা করেছি। কিংবদন্তীর ধুলো ঝেড়ে মধুসূদনকে আমি যেমন আবিষ্কার করেছিলাম, আমার লক্ষ্য নজরুলকেও তেমনি করে পুনর্নিমাণ করা। শোনা-কথা দিয়ে তাঁর যে-ভাবমূর্তি এ যাবৎ তৈরি হয়েছে, তাঁকে তা থেকে মুক্ত করা। কাজটা সহজ হবে না।

প্রশ্ন : আমাদের দেশের গবেষকদের একটা সাধারণ যুক্তি: তাঁরা ইংরেজি মাধ্যমে তাঁদের গবেষণাপত্র লেখেন, যাতে তা বিশ্বের সকলের নিকট পাঠযোগ্য হয়। আপনার ব্যাপারটা একটু ভিন্ন। আপনার দুটি বই সরাসরি ইংরেজিতে – ‘রিলাকট্যন্ট ডেবুট্যান্ট: রেসপন্স অব বেঙ্গলি উইমেন টু মডার্নাইজেশন’ এবং ‘হার্ট অব এ রেবেল পোয়েট’।
অন্যদিকে আপনার ‘আশার ছলনে ভুলি’ ও ‘হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি’ ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। বাংলাদেশ বিষয় নিয়ে যাঁরা গবেষণাপত্র লিখবেন, আপনার এই অভিজ্ঞতা নিয়ে তাঁদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?
মুরশিদ: আমার মনে হয়: ঝোঁক টা থাকা উচিত গবেষণার প্রতি, ভাষার প্রতি নয়। ভালো ইংরেজি জানলে ইংরেজিতেও লেখা যেতে পারে। কিন্তু বাংলায় লিখলে দেশের লোকেরা বুঝতে পারবেন।

প্রশ্ন : বাংলাদেশের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে আপনি জন্মেছিলেন। এখন আপনি বাংলাদেশের প্রথম সারির প্রাবন্ধিক ও গবেষক। এই পর্যায়ে উঠতে আপনাকে কী পরিমাণ অধ্যবসায় ও পরিশ্রম করতে হয়েছে, ভবিষ্যৎ গবেষকদের জন্য সে সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?
মুরশিদ: আমি স্বশিক্ষিত মানুষ। সত্যিকার লেখাপড়া শিখি বিশ্ববিদ্যালয়-জীবন শেষ হবার পরে। একবার তাতে আগ্রহ জন্মানোর পরে আমি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে লেখাপড়া করেছি – কারও চাপে নয়, স্বেচ্ছায়। ভালো লাগে বলে। পুরস্কার পাওয়ার লোভ নয়।
জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত লেখার কাজ চালিয়ে যাওয়া আমার লক্ষ্য। গবেষণা এবং লেখাপড়া সম্পর্কে আমার কথা হলো: এর কোনো সংক্ষিপ্ত পথ নেই। আরাম-আয়েশ করে গবেষণা করা যায় না। নিরাসক্ত দৃষ্টি এবং অজানা সত্যকে আবিষ্কারের উদ্দেশ্য নিয়ে আরামকে হারাম করে গবেষণায় নামা উচিত। অন্য বই থেকে নকল করে গবেষণা হয় না।

আপনার মন্তব্য লিখুন