গীতবিতানের বিষয়বিন্যাস

ইফতেখারুল ইসলাম

পাঠকের সুবিধের জন্য গীতবিতানের গানগুলো কয়েকটি নির্দিষ্ট বিষয়ে ভাগ করে সরলভাবে শ্রেণীবিন্যাস করে দেওয়া আছে। সে অনুযায়ী আছে সূচিপত্র। গানের প্রথম ছত্র অথবা মূল-বিষয় জানা থাকলে সূচি দেখে গানটি খুঁজে নেওয়া যায়। আমরা যারা প্রায়ই গীতবিতান পাঠ করি তাদের জন্য এটা সুবিধেজনক হলেও মাঝে মাঝে গানের বিষয়বস্তু, মূলভাব ও তার বিন্যাস নিয়ে প্রশ্ন জাগে। এই সমস্যা নিরসনের জন্য কেউ কেউ অন্যতর পদ্ধতির কথা ভেবেছেন। একটি গান অথবা একটি গীতিগুচ্ছের পেছনে যে দর্শন কার্যকর অথবা যে সাধারণ তত্ত্ব এতে অন্তর্নিহিত রয়েছে সেটা বের করে এনে তারই ভিত্তিতে গুচ্ছ-বিভাগ করার মতো একটি কাজে হাত দিতে চেয়েছেন কোনো কোনো প্রবন্ধকার (রুশিদান ইসলাম রহমান, দেড়শত বর্ষ পরে রবীন্দ্রভুবনে, মাওলা ব্রাদার্স, ফেব্রুয়ারি ২০১১)। কোনো প্রতিষ্ঠান অথবা রবীন্দ্র-গবেষক এ নিয়ে কোনো কাজ করছেন কি-না তা এখনো আমাদের জানা নেই।
এই সিদ্ধান্ত ও কাজের উদ্যোগটি হাতে নেবার আগে কিছু প্রশ্ন পুনরায় বিবেচনা ও বিশ্লেষণ করা দরকার। কাজের আগে নীতিগত বিষয়ের মীমাংসা অগ্রাধিকার দাবি করে। কোনো কোনো পাঠক মনে করেন, প্রেম, প্রার্থনা অথবা বর্ষা এ-রকম একটিমাত্র বিষয় দিয়ে একটি গানকে চিহ্নিত বা বিন্যস্ত করা যথার্থ নয়। তেমনি একটি মাত্র সুনির্দিষ্ট অন্তর্নিহিত তত্ত্বের মোড়কে অমিত-সম্ভাবনা ও বহুমাত্রা-সমৃদ্ধ একটি গান বা গীতিগুচ্ছকে আবৃত করার চেষ্টাও এক ধরনের অতিসারল্য। সেটা বিভ্রান্তিকর হবে। তাহলে কি ছোট্ট একটি গানের মধ্যে একাধিক বিষয় ও তত্ত্ব অন্তর্নিহিত রয়েছে ? অর্থাৎ, প্রধান প্রশ্নটি হলো একটি গীতিকবিতা একটি সুনির্দিষ্ট বিষয় ও ভাবকেই ধারণ করে কি? অন্তত রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে এটা সত্য নয় বলেই আমাদের ধারণা।
গানের মূলভাব এবং বিষয়-বিন্যাসের ক্ষেত্রে অনিষ্টকর অতি-সরলীকরণের শুরু স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের হাতেই। ‘বিজ্ঞাপন’ শিরোনামে ১৩৪৫ সালের ভাদ্রে গীতবিতানের ভূমিকায় তিনি লিখেছেন :
“গীতবিতান যখন প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল তখন সংকলন-কর্তারা সত্বরতার তাড়নায় গানগুলির মধ্যে বিষয়ানুক্রমিক শৃঙ্খলা বিধান করতে পারেননি। তাতে কেবল যে ব্যবহারের পক্ষে বিঘ্ন হয়েছিল তা নয়, সাহিত্যের দিক থেকে রসবোধেরও ক্ষতি করেছিল। সেই জন্য এই সংস্করণে ভাবের অনুষঙ্গ রক্ষা করে গানগুলি সাজানো হয়েছে। এই উপায়ে, সুরের সহযোগিতা না পেলেও পাঠকরা গীতিকাব্যরূপে এই গানগুলি অনুসরণ করতে পারবেন।”
ব্যবহারের বিঘ্ন ও রসবোধের ক্ষতি দূর করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ যে বিষয়বিন্যাস করেছিলেন তা আমাদের সাহিত্যে স্থায়ী সম্পদ হয়ে রয়েছে। তবে, এই বিষয়বিন্যাস থেকেই রবীন্দ্রসঙ্গীতকে আরো সুনির্দিষ্ট বিষয়ে খণ্ডিত, সীমিত ও নামাঙ্কিত করার বিনাশী আয়োজন শুরু। রবীন্দ্রনাথ নিজেই তাঁর বিন্যাস-প্রক্রিয়ায় শুধু বিষয়-শিরোনামে আবদ্ধ থাকতে পারেননি। বিপুলসংখ্যক গীতিকবিতাকে অর্থপূর্ণ ও ব্যবহারোপযোগী শ্রেণীবিন্যাস করতে গিয়ে তিনি বিষয় শিরোনামের সঙ্গে উপশিরোনামের সাহায্য নিয়েছেন। এভাবে পূজা পর্বের উপশিরোনাম হিসেবে এসেছে গান, বন্ধু, প্রার্থনা, বিরহ ইত্যাদি মোট একুশটি বিষয়। ‘প্রকৃতি’ শিরোনামের সঙ্গে বিষয় এসেছে মোট সাতটি। একটি ‘সাধারণ’ আর বাকি ছয়টি হলো ছয় ঋতুর নাম। রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যে বিষয়সূচি বা ইনডেক্সিং পদ্ধতির একটি দিকনির্দেশনা এভাবেই দিয়েছেন তাঁর গীতবিতানে। এখনকার গবেষকদের সহায়তার জন্য একটি প্রধান বিবেচ্য হলো এই বিষয়সূচিকে আরো কত আধুনিক, বিজ্ঞানসম্মত ও ব্যবহারোপযোগী করে তোলা যায়।
অন্তর্নিহিত ভাবের আলোকে রবীন্দ্রসঙ্গীতের একটি নতুন ও অর্থপূর্ণ বিন্যাস যদি করতেই হয় তাহলে একই গানকে একাধিক শিরোনাম ও উপশিরোনামে বিন্যস্ত করার বিকল্প নেই। এ বিষয়েও রবীন্দ্রনাথ নিজেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করে গেছেন। গীতবিতানে কিছু গানকে দুবার সন্নিবেশিত করেছেন। একবার গীতিনাট্যে আর একবার পূর্ণাঙ্গ গান হিসেবে। তথ্যবিজ্ঞানের বিপুল অগ্রগতি ও কম্পিউটার প্রয়োগের সুযোগে যে-কোনো রচনাকে সকল পাঠকের আগ্রহ ও অনুসন্ধিৎসা অনুযায়ী প্রাপ্য করে তোলা সম্ভব বিভিন্ন ধরনের শিরোনাম ও উপশিরোনাম আরোপের মাধ্যমে। এই ব্যবস্থার সুফল হচ্ছে এই যে বিশেষ এক অথবা একাধিক গবেষকের মননশীলতা বা আবেগ-অনুভূতি দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে সম্পূর্ণ নৈর্ব্যক্তিক উপায়ে একটি গানকে শ্রেনীবিন্যাস করা যাবে। শতবর্ষের পুরনো শ্রেণীবিন্যাস বাদ দিয়ে নতুন কোনো বিষয় ভিত্তি করে একটি গান খুঁজে বের করলে সম্পূর্ণ নতুন একটি দৃষ্টিকোণ থেকে সেই গানটির রসাস্বাদন সম্ভব।
আমরা ধরে নিই যে একটি গান বা গীতিকবিতায় একাধিক বিষয় বা মূলভাব থাকতে পারে। বিষয়সূচি তৈরির জন্য আমরা সম্ভাব্য সবগুলো বিষয়কেই বিবেচনায় নিতে চাই। এই রকম যতো শিরোনাম ও উপশিরোনাম ওই গানের জন্য প্রযোজ্য হতে পারে তার সবকটি দিয়ে একটি গানকে গ্রন্থিত করে রাখলে যে-কোনো প্রাসঙ্গিক বিষয়বস্তু দিয়ে কাঙ্ক্ষিত গান বা গানের গুচ্ছ খুঁজে আনা যাবে। তথ্য প্রযুক্তির সুবিধে না নেওয়ার কোনো যুক্তি নেই। তবু এরকম একটি নৈর্ব্যক্তিক বিষয়বিন্যাসের প্রস্তাবনা কারো কারো কাছে যান্ত্রিক এবং অ-রাবীন্দ্রিক মনে হতে পারে। তাঁদেরকে এর প্রয়োজন বোঝানোর জন্য একটি গানের উদাহরণ দিতে চাই।
খুবই পরিচিত হলেও পাঠকের সুবিধের জন্য পুরো গানটি দেওয়া হলো এখানে।
এবার ভাসিয়ে দিতে হবে আমার এই তরী
তীরে বসে যায় যে বেলা, মরি গো মরি।।
ফুল ফোটানো সারা করে বসন্ত যে গেল সরে,
নিয়ে ঝরা ফুলের ডালা বলো কী করি।।
জল উঠেছে ছলছলিয়ে, ঢেউ উঠেছে দুলে,
মর্মরিয়ে ঝরে পাতা বিজন তরুমূলে।
শূন্যমনে কোথায় তাকাস।
ওরে, সকল বাতাস সকল আকাশ
আজি ওই পারের ওই বাঁশির সুরে উঠে শিহরি।।

বিষয় বিন্যাসের দিক থেকে একে আমরা কোথায় স্থান দেব? এই গানের মর্মবাণী কী? পারাপারের প্রতীক্ষা, বসন্তবিদায়, ঝরাফুল-ঝরাপাতা, শূন্যতা, মৃত্যু না-কি কোনো অনন্ত যাত্রা? অনেক পাঠকের কাছে কৌতুক মনে হলেও সত্য হচ্ছে এই যে, রবীন্দ্রনাথ নিজে একে ‘প্রকৃতি’ পর্যায়ের ‘বসন্ত’ পর্বে স্থান দিয়েছেন। আবারও দৃষ্টি ফেরাই গানটির দিকে। ফুল আর পাতা ঝরা শেষে বিজন শূন্যতার একটা তীব্র হাহাকার-ভরা গান। শুধুমাত্র বসন্ত শব্দটি আছে বলেই, বসন্তের গান হিসেবে লিপিবদ্ধ হলো।
সাহিত্যের কোনো নবীন ছাত্র কবিতার এই ভাবার্থ করলে আমরা কী বলতাম ? আর নিজের গানের এই শ্রেণীবিন্যাস করেছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। এ কি অতি সারল্য, অযথা বিভ্রম, না-কি আমাদের মতো সামান্য পাঠকের জন্য কবিগুরুর কোনো বিলাসী বিদ্রুপ ?
আমরা যে-কোনো অস্বচ্ছ, অস্পষ্ট ও কৃত্রিম আবরণ সরিয়ে রবীন্দ্রনাথের গান সহজে খুঁজে বের করে তার রস আস্বাদন করতে চাই। ব্যবহার করব উপযুক্ত নতুন প্রযুক্তি। প্রাচীন ও বিভ্রান্তিকর বিষয়বিন্যাসের কারণে কোনো গান হারাতে চাই না। আর খোঁজার কাজটা কঠিন করে তুলতেও চাই না।