গাজী শাহাবুদ্দিন আহমদ ও জাগরণের সচিত্র সন্ধানী

আ.ফ.ম মোদাচ্ছের আলী
Untitled-1

‘উজ্জল নতুন ভবিষ্যতের প্রয়োজনে বিস্মৃতির দায় থেকে যেন আমরা মুক্ত হই। এ জন্য একাত্তরের জাতির অবিনাশী মুক্তিযুদ্ধের সাহসী ঘটনাসমূহ, বিভিন্ন অঞ্চলের মরণপণ লড়াইয়ের কাহিনী সচিত্র সন্ধানী প্রকাশ করতে চায়। দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের তাই লেখার অনুরোধ করা হচ্ছে।’ এই আহবান রেখে যে সম্পাদক ‘আমরা তখন যুদ্ধে‘ শিরোনামে মুক্তিযোদ্ধাদের লেখা লড়াই সংগ্রামের অমর গাথা প্রতি সপ্তায় প্রকাশ করতো যে ম্যাগাজিন সেটি ‘সচিত্র সন্ধানী’। ষাট দশকের রুচিশীল ম্যাগাজিন ‘সচিত্র সন্ধানী’। মফিদুল হক এর ভাষায় ‘পঞ্চাশের দশকে ঢাকা পাকিস্তানী কূপমণ্ডূকতা থেকে বের হয়ে নগর হয়ে ওঠার যে প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে সেখানে সহিত্যচর্চা ভাষা ও নবসৃজনশীলতার উদ্যম বিশেষ গুরুত্ববহন করেছিল, আর গাজী শাহাবুদ্দিন আহমদ তাঁর মুদ্রণ ও প্রকাশনায় তাঁর বিশেষ আগ্রহ নিয়ে সেই নবসৃজনশীলতার ধারাকে বেগবান করেছিলেন।’ জন্ম ১৯৩৯ সালে নারিন্দায় নানা বাড়িতে। ষাটের দশকে সাড়া জাগানো রুচিশীল ম্যাগাজিন ‘সচিত্র সন্ধানী’। সম্পাদক ও প্রকাশক গাজী শাহাবুদ্দিন আহমদ। মুক্তিযুদ্ধের পর এই ম্যাগাজিনটির সাথে আমার পরিচিতি ঘটে। আমাদের বাসায়, বিচিত্রা, সন্ধানী, রোববার, তারকালোকসহ অনেক ম্যাগাজিন নেয়া হতো। এর মধ্যে বিচিত্রা ও সন্ধানী ছিল স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। ১৯৫৬ সালে সাংবাদিক আতাউস সামাদ ও বন্ধু অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে সাথে নিয়ে একটি সাইকেল ও অল্প কিছু টাকা সম্বল করে সন্ধানীর প্রকাশনা শুরু করেন। শুরুর দিকে এটি ছিল রম্য ও কার্টুন পত্রিকা। পরবর্তীতে সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন হিসেবে আত্মপ্রকাশ। ১৯৫৯ সালে ৪১ নয়াপল্টনে সন্ধানী প্রেসের জন্ম, আশির দশকের শেষ দিকে ‘সচিত্র সন্ধানী’ ম্যাগাজিনে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ হতে থাকে খালা শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’। একাত্তরে তাঁর সন্তান রুমীর বীরত্বগাথাকে কেন্দ্র করে তাঁর জীবনের ঘটে যাওয়া ট্রাজেডি, রুমী, বদি, জুয়েল, আলম, মায়াদের মতো বীরদের সাথে আমাদের পরিচয় ঘটে, আর সচিত্র সন্ধানী প্রতি সপ্তায় শহীদ জননীর লেখা সেই সময়গুলোকে আমাদের সামনে উপস্থাপন করতো। আমরা চাতকের মতো প্রতি সপ্তায় এই ম্যাগাজিনটির জন্য অপেক্ষা করতাম। পরবর্তীকালে সন্ধানী প্রকাশনী থেকে ‘একাত্তরের দিনগুলি’ নামেই বইটি প্রকাশ করা হয়। কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমদের ‘আগুনের পরশমণি’ উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয় সচিত্র সন্ধানীর বিশেষ সংখ্যায়। বাংলাদেশের কিংবদন্তী ফুটবলার কাজী সালাহউদ্দিন এর লেখা ‘ছেড়ে এলাম ফুটবল’ ধারাবাহিক কলামটি নিযমিত ছেপেছে এই ম্যাগাজিন, কালজয়ী চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের লেখা ‘হাজার বছর ধরে’ এই অসাধারণ ও ঐতিহাসিক উপন্যাসটি প্রকাশ করেছিল সন্ধানী প্রকাশনী। ১৯৬৯/৭০ সালে অর্ধডজন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বিজয়ী জহির রায়হানকে তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র তারকা হোটেল হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে সংবর্ধনা দেন গাজী শাহাবুদ্দিন আহমদ তাঁর সন্ধানী প্রকাশনী থেকে। ষাট/সত্তর বা আশির দশকে আমাদের প্রকাশনা শিল্প সমৃদ্ধ ছিল না। সেই সময়ে এই শিল্পকে বেগবান করতে শওকত ওসমান, সৈয়দ শামসুল হক, আব্দুল গাফফার চৌধুরী, শামসুর রাহমান, সাইয়িদ আতিকুল্লাহ, হাসান আজিজুল হক, সেলিনা হোসেন, বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, লায়লা সামাদ, ফজল শাহাবুদ্দিন, আলমগীর কবির, বেলাল চৌধুরী, নির্মলেন্দু গুণ, শফিক রেহমানসহ অনেক প্রথিতযশা কবি/লেখকদের বই ছাপিয়েছে সন্ধানী প্রকাশনী। এদের বেশিরভাগই গাজী শাহাবুদ্দিনের বন্ধু ছিলেন। শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী তাঁর একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন যিনি সচিত্র সন্ধানীর উপদেষ্টাও ছিলেন।
৮০র দশকে যখন আমি ছাত্র, রাজনীতির পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবে কাজ করতাম সন্ধানীর সাহিত্য ও সংস্কৃতির পাতায় চট্টগ্রাম মুসলিম হলের বইমেলা, পদাবলীর কবিতা সন্ধ্যা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক ফোরামের কার্টুন প্রদর্শনী, চট্টগ্রাম গ্রুপ থিয়েটার সমন্বয় পরিষদের নাট্য উৎসবকে নিয়ে আমার লেখা অনেক প্রতিবেদন সচিত্র সন্ধানী যত্ন সহকারে ছাপিয়েছে।
সারা দেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতির পুরো সাতদিনের চালচিত্র পাওয়া যেত এই সাপ্তাহিক ম্যাগাজিনটিতে। সেই সময় কম্পিউটার ছিল না, সাদা কাগজে প্রতিবেদন লিখে সাদাকালো ছবিসহ পোস্ট অফিস বা মাত্র শুরু হওয়া কুরিয়ারের মাধ্যমে পাঠাতাম। সেটি যত্ন করে ছাপাতেন সন্ধানী। সারাদেশ থেকে পাঠানো সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদন ছাপতেন সচিত্র সন্ধনী সম্পাদক গাজী শাহাবুদ্দিনের সুনিপুণ সম্পাদনায় কিছু সম্মানীও দিতেন যা আমার কাছে ছিল অপ্রত্যাশিত।
গাজী শাহাবুদ্দিন আহমদ এর মতো মুক্তমনা ও পরিচ্ছন্ন মানুষদের পৃষ্ঠপোষকতার কারণেই এগিয়েছে আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতি। এই মানুষটি না ফেরার দেশে চলে গেছেন। থেকে গেছে তাঁর অসামান্য অবদান। বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় বিদায় জানাই এই মানুষটিকে স্মরণ করবো বারবার।