গাজাবাসী চোখে এখন শর্ষেফুল দেখছে

হোসাইন আনোয়ার

গত ১০ অক্টোবর কায়রোতে ফিলিস্তিনের ক্ষমতাসীন দল ফাতাহ ও জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের সংগঠন হামাস তাদের মধ্যকার আলাপ-আলোচনার পর যে ঐক্যমতের বিবৃতি দিয়েছিল তার মূল সুর ইতিবাচক হলেও গাজায় বসবাসরত ২০ লাখ মানুষ আজ ইতিহাসে সবচাইতে ভয়ংকর বিপর্যয়ের মুখোমুখি। হামাস’কে চাপে রাখতে এমন কোনো পথ নেই যা ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস অবলম্বন করেননি।
গাজার বিদ্যুৎ সুবিধা বন্ধ করাসহ, সরকারি চাকুরিজীবীদের বেতন-ভাতার একটি অংশ কেটে নেয়ার এক নির্বাহী আদেশে তিনি সই করেছেন। পাশাপাশি ইসরায়েল ও মিশর গাজায় পণ্য আমদানি-রপ্তানির গোপন সুড়ঙ্গগুলো বন্ধ করে দেয়ায় গাজার অর্থনীতি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। এতদিন গাজায় বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য হামাস ও ইসরায়েলকে অর্থসহায়তা দিত ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ। তবে গত বছর হামাস তার নিজস্ব কর ব্যবস’া চালু করায়, ওই অর্থসরবরাহ বন্ধের নির্দেশ দেন ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। এরপর থেকেই গাজাবাসী মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি। সেখানকার হাসপাতালগুলোতে এখন দিনে ১২ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না। জেনারেটর দিয়ে কোন রকমে বিদ্যুৎ ব্যবস’া সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে সেখানকার মানবিক বিপর্যয় এখন চরমে উঠেছে।
ফাতাহ’র সঙ্গে লড়াইয়ের পর তাদের বিতাড়িত করেই হামাস ২০০৭ সালে গাজার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছিল। ২০০৬ সালের নির্বাচনে জেতার পরও (হামাস) ফাতাহ তা মেনে নেয়নি। সে কারণে গাজার উপত্যকায় প্রশাসনিক ব্যবস’াপনার জন্য হামাসকে তার নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ও সংস’া তৈরি করতে হয়েছিল। বর্তমান গাজার জনজীবনের সবকিছুই হামাস নিয়ন্ত্রণ করছিল। সেখানকার শিক্ষা, স্বাস’্যসেবা, হাসপাতাল, রাজস্ব সংগ্রহ নিরাপত্তা আর মিসর ও ইসরায়েলের সঙ্গে সীমান্ত ব্যবস’াপনা- এ সবই হামাস নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এক কথায় গত ১০ বছর যাবৎ গাজায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে হামাস গাজায় পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রব্যবস’া কায়েম রেখেছিল।
গেল অক্টোবরে হামাস-ফাতাহ মতৈক্যের পর ফিলিস্তিনিদের মৃদু আশাবাদ তৈরি করেছিল। কিন’ ফাতাহ’র রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা বা আগ্রাসন সে আশাবাদকে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। হামাস ও ফাতাহ’র মধ্যে এখনো অনেক বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি, ফলে মধ্যপ্রাচ্যের অপশক্তিগুলো এখন ফাতাহ’কে নিয়ে খেলছে। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে- গাজা কার হাতে থাকবে? দীর্ঘ এক দশক ধরে গাজার নিয়ন্ত্রণ ভার রয়েছে হামাসের হাতে।
গত অক্টোবরে হামাস-ফাতাহ’র মধ্যে মতৈক্য হয়েছে, তার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে গাজা কার হাতে থাকবে, আর গাজার সরকারি কর্মচারীদেরই বা কি হবে। কী হবে হামাসের সামরিক শাখার ভবিষ্যৎ। এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে হামাস ও ফাতাহ’কে এক হতে হবে। যারা রামাল্লায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কাছে দায়বদ্ধ তাদেরকেই ঐক্যমতের ফর্মুলা আবিষ্কার করতে হবে।
এটা পরিষ্কার যে একত্রীকরণ প্রক্রিয়া কেমন হবে সে সম্পর্কে হামাস-ফাতাহ’র বিবৃতিতে বিস্তৃত নির্দেশনা না থাকার কারণে আজ গাজায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে উভয়পক্ষের শীর্ষনেতাদের কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। তা না হলে এই মতৈক্য ব্যর্থ হতে বাধ্য। ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস একাধিকবার এ কথা বলেছেন, এই সমঝোতার চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে গাজার উপর ফিলিস্তিনিদের পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। অক্টোবরের শুরুতেই তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, ফিলিস্তিনি ভূমিতে একটি শক্তি, একটি আইন ও একটি নিরাপত্তা ব্যবস’া বহাল থাকবে। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলো এই সমঝোতা প্রক্রিয়ার ব্যাপারে আপত্তি প্রত্যাহার করলেও এটা ধরে নেওয়া যাবে না যে, গাজার অস্ত্রভাণ্ডার সম্পর্কে অনন্তকাল বোবা হয়ে থাকবে। কারণ এই অস্ত্রগুলো গাজার বিভিন্ন গোষ্ঠীর সামরিক শাখার কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এদের মধ্যে আছে হামাস, ইসলামিক জিহাদ, ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অব প্যালেস্টাইন ও পপুলার রেসিস্টান্স কমিটি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলিদের দুশ্চিন্তার কারণ এখানেই।
হামাস অনেক আগেই ঘোষণা দিয়েছে এবং এটা শতভাগ নিশ্চিত করেছে যে, হামাসের সশস্ত্র শাখার ভবিষ্যৎ সমঝোতা প্রক্রিয়ার উপর নির্ভর করবে না। আর গাজার মতৈক্যের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে তারা তাদের সশস্ত্র শাখার বিলুপ্তি ঘটাবে না। হামাস নিজ সশস্ত্র সেনাদের আশ্বস্ত করেছে তাদের ভবিষ্যৎ রক্ষার দায়িত্ব তাদের। এই বাস্তব অবস’ার পরিপ্রেক্ষিতে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ও মিসরীয় কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে একেবারে শেষপর্যায়ে আলোচনা করার মত দিয়েছিলেন। কিন’ এখন যদি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ পশ্চিমতীরের মতো গাজায়ও একই ধরনের এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস’া কায়েম করতে অগ্রসর হন, তবে কী হামাস তা মেনে নেবে?
এই অঞ্চলের সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক কারণে হামাস এখন কঠিন অবস’ার মধ্যে পড়ে গেছে। বিদেশে অবস’ানরত হামাস নেতারা সিরিয়ার বিষয়ে উচ্চাশা ত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছেন। মিসরে ব্রাদারহুডবিরোধী আবদেল ফাত্তাহ আল সিসির উত্থানের কারণে রাফা সীমান্ত সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে।
সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত হামাসকে সমর্থন দেয়া বন্ধ করতে কাতারের উপর ব্যাপক চাপ দিয়ে যাচ্ছে। এ সব কারণে হামাস এখন চোখে অন্ধকার দেখছে। তার উপর ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ গাজায় যে নিরাপত্তা ব্যবস’া চালু করতে চাইছে, তার অর্থ হলো, ইসরায়েলের সামরিক সশস্ত্রযান যেন গাজার প্রান্ত পর্যন্ত চলে আসতে পারে। যার অর্থ হলো-সীমান্ত নিরাপত্তার সামান্যতম ব্যত্যয় ঘটলেও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কাজ হবে তা ইসরায়েলকে অবহিত করা। আর ইসরায়েলের নিরাপত্তা বাহিনীর কাজ হবে, গাজায় কোনো কারখানায় হামাসের জন্য কোনো অস্ত্র বানানো হচ্ছে কিনা তা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা, যাতে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ অতি দ্রুততার সঙ্গে সেই কারখানা মাটিতে মিশিয়ে দিতে সক্ষম হয় এবং সদস্যদের তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেফতার করতে পারে। এসব বিষয় আগাম ফাঁস হওয়া হামাসের জন্য চূড়ান্তভাবেই ক্ষতিকারক। তারা কি এই অবস’াকে মেনে নেবে? চূড়ান্ত কথা হচ্ছে, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ যদি হামাসের কাছ থেকে গাজার নিরাপত্তার দায়িত্ব কেড়ে নেয় তা হলে গাজা সীমান্তে ইসরায়েলিদের ঘন ঘন বা বিরতিহীন অনুপ্রবেশ, তার বিমান হামলা ও ইসলায়েলি নৌ-সেনাদের হাতে প্রতিদিন গাজার জেলেদের হেনস্তা হওয়া এসব কিছুর দায়িত্ব তাকে নিতে হবে।
দুষ্ট লোকেরা বলছে, ইরানকে শায়েস্তা করার জন্য সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে যেমন গোপন সমঝোতা রয়েছে, তেমনি একটি গোপন সমঝোতা ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের মধ্যে রয়েছে হামাসকে গাজা থেকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য। বিষয়টি হামাসের জন্য দুঃস্বপ্নের মতো। যা এখন হামাসকে ভাবিয়ে তুলছে।
ইসরায়েল ইতিমধ্যেই গাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ধ্বংস করেছে। হামাসের উপর ভূমি ও সমুদ্রপথে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইসরায়েলের এই অবরোধ নিরসনের বহু চেষ্টা করেছে কোনো কাজ হয়নি। তার উপর রয়েছে প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের অবরোধ। মাহমুদ আব্বাস গাজার জ্বালানি খরচ দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন, গাজার বিদ্যুৎ সুবিধা বন্ধ করে দিয়েছেন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বন্ধ করে দিয়েছে, তার উপর ইসরায়েল-মিশর চোরাই পথে গাজায় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য আমদানি-রপ্তানির জন্য গাজাবাসী দিনরাত পরিশ্রম করে যে সুড়ঙ্গপথ তৈরি করেছিল, সেখানে দেয়াল তুলে দিয়েছে। গাজাবাসী এখন চোখে শর্ষেফুল দেখছে। তারা জানে না কী তাদের ভবিষ্যৎ। ফাতাহ তাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কি গাজার বিষয়ে মুখ খুলবে না। গাজার মানুষকে বাঁচানোর জন্য কোনো সাহায্য নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়াবে না? কে দেবে এ প্রশ্নের উত্তর।