গাইডিং স্টার ধ্রুবতারা

অনিক শুভ
pole-star-universe-today

সন্ধ্যার পরপরই আকাশে দেখা যায় তারাদের আধিপত্য। কিন্তু জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের ভাষায় এরা সবাই তারা নয়। রাতের আকাশে প্রধানত দুটি তারা দেখা যায়, শুক্র ও বৃহস্পতি। সন্ধ্যা হবার পর প্রায় সব তারা পশ্চিম দিকে চলে যায়। যদিও এরা মূলত পৃথিবীকে কেন্দ্র করে প্রদক্ষিণ করে না, তবুও পৃথিবীর আবর্তনের জন্য এমন হয়। যখন প্রায় সব তারা পশ্চিম দিকে চলে যায়, তখন একটি তারা আছে যেটা সবসময় উত্তর মেরুর দিকে থাকে। সে নড়ে চড়ে না। একে দেখলে মনে হয় আকাশের সব তারা একে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। এই তারার নাম ধ্রুব তারা। ইংরেজিতে বলে পোলারিস বা মেরু তারা (পোল স্টার)। উত্তরে থাকে বলে একে আবার নর্থ স্টারও বলে। ল্যাটিনে একে ডাকা হয় লোদোস্তার, যার অর্থ হল সংকেত তারা। এছাড়া গাইডিং স্টার বলে অবিহিত করা হয়। প্রাচীনকালে দিক নির্ণয় যন্ত্র আবিষ্কারের পূর্বে সমুদ্রে জাহাজ চালাবার সময় নাবিকরা এই তারার অবস্থান দেখে দিক নির্ণয় করতো।
সেই প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের কাছে পৃথিবীর আকাশে দৃশ্যমান তারাদের মধ্যে সবচেয়ে রহস্যময় হল, ধ্রুবতারা। পৃথিবীর আকাশে যেকোনো গ্রহ, নক্ষত্র, ধূমকেতু দেখা যাক না কেন, সে তার স্থান পরিবর্তন করবেই। কারণ পৃথিবী ঘূর্ণনশীল এবং মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তুই ঘূর্ণনশীল। সে কারণে পৃথিবীর আকাশে যা-ই দেখা যাক না কেন তার উদয় এবং অস্ত আছে। আর এসব বিবেচনায় প্রশ্ন আসতেই পারে, তাহলে কি ধ্রুবতারা ঘোরে না? আর না ঘুরলে তার রহস্য কি?
আসলে মহাবিশ্বের সকল বস্তু ঘুরতে বাধ্য। মহাবিশ্বে নিশ্চল রয়েছে এমন কিছুর অস্তিত্ব নেই। সবকিছুর মতো ঘুরছে ধ্রুবতারাও। কিন্তু এই তারাটি পৃথিবীর অক্ষের ওপর এর ঘূর্ণনের সঙ্গে একই গতিতে সামাঞ্জস্যপূর্ণভাবে আবর্তিত হয়। যে কারণে আপাতদৃষ্টিতে পৃথিবী থেকে ধ্রুবতারাকে মনে হয় নিশ্চল। এ কারণেই মনে হয় ধ্রুবতারার উদয় নেই, অস্ত নেই, গতি নেই।
পৃথিবীর সবদেশ থেকেই একমাত্র ধ্রুবতারাকে সারাবছরই আকাশের উত্তরে নির্দিষ্ট স্থানে দেখা যায়। আর এই তারাকে চিনতে পারলেই উত্তর দিকের সন্ধান পাওয়া যায়, যা থেকে অন্য সকল দিকের সন্ধান পাওয়া যায়।
আমাদের বাংলাদেশের আকাশে ধ্রুবতারাকে বেশি উঁচুতে দেখা যায় না। ঢাকা থেকে ধ্রুব তারার উচ্চতা ২৩ ডিগ্রি ৪৩ মিনিট। দিগ্‌বলয় থেকে আকাশের প্রায় চারভাগের একভাগ উঁচুতেই এই তারাটির মতো উজ্জ্বল আর কোনো তারা নেই বলে একে চিনতে বিশেষ অসুবিধা হয় না। তবে বাংলাদেশ থেকে যতই উত্তরে যাওয়া যাবে, ধ্রুবতারা ততই ওপরে দেখা যাবে।
ধ্রুবতারাকে চিনতে গেলে প্রথমে সপ্তর্ষিমণ্ডল চেনা দরকার। মার্চ এপ্রিল মাসে আকাশের উত্তর-পূর্ব দিকে দ্বিতীয় শ্রেণীর সাতটি তারা এবং আশেপাশের আরো কয়েকটি তারা নিয়ে গ্রীকরা একটি বিরাট ভাল্লুকের কল্পনা করে থাকে। যে কারণে একে তারা ডাকতো বৃহৎ ভাল্লুক মণ্ডল বা ‘উরসা মেজর’। এই সাতটি তারা দিয়ে আকাশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তারকামণ্ডল এবং ধ্রুবতারা পাওয়া যায়। সাতটি তারা দিয়ে যে হাতাওয়ালা পেয়ালা কল্পনা করা হয় সেই পেয়ালার হাতলের উল্টোদিকে যে দুটো তারা পাওয়া যায় সেই দুটো তারার উত্তর দিকে ওপরের তারাটি হল ধ্রুবতারা। এই দুটো তারার দূরত্ব হল ৫ ডিগ্রি করে। আর সেখান থেকে ধ্রুবতারার দূরত্ব হল ৩০ ডিগ্রি।
এছাড়া পেয়ালার হাতলের তিনটি তারা যে বৃত্তচাপ গঠন করে সেই বৃত্তচাপটিকে পাঁচগুণ বাড়িয়ে দিলে বুটিস মণ্ডলের প্রথম তারাটি পাওয়া যায়। এই উজ্জ্বল তারাটি আমাদের দেশে স্বাতী নক্ষত্র নামে পরিচিত। এছাড়া পেয়ালার হাতলের সোজাসুজি নিচের দিকে আসলে যে উজ্জ্বল তারাটি পাওয়া যায় সেটি হল সিংহ রাশির প্রধান তারা মঘা নক্ষত্র।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের ধারণা, পৃথিবীর প্রথম থেকে একটি তারকাই কখনো ধ্রুবতারা রূপে বিরাজ করে না। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন তারা উত্তর মেরুর নিকটে থেকে ধ্রুবতারা রূপে বিরাজ করেছে। এবং এই তারাগুলো প্রায় ২৬০০০ বছরের জন্য একটি বৃত্তাকার গতিপথে ভ্রমণ করার সময় পৃথিবী থেকে দৃশ্যমান হয়। তবে ধ্রুবতারার ইতিহাস এখনো সেভাবে সঠিকরূপে কেউ নির্ণয় করতে পারেনি। কোনো সভ্যতার ইতিহাস থেকেও তেমন কোনো সংকেত মেলেনি, যে কারণে এখনো পর্যন্ত ধ্রুবতারার নিশ্চলতার কারণ আবিষ্কৃত হলেও এর ইতিহাস সম্পর্কে তেমন নির্দিষ্ট করে কিছু বলা কঠিন।