গরীব-নওয়ায মুঈনুদ্দীন চিশতী (রহ.) এ মাসে যাঁর বেসাল

হাফেজ মুহাম্মদ আনিসুজ্জমান

মহান আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু সমস্ত প্রশংসার প্রকৃত মালিক, যেহেতু তিনি মানুষের উপকারার্থেই পৃথিবীর সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। তিনি পবিত্র সকল ক্রটি ও অক্ষমতা হতে, যিনি তাঁর হাবীবকে সমস্ত মানবীয় দোষ-ত্রুটি হতে মুক্ত, পবিত্র রূপে সৃষ্টি করেছেন। আর তাঁকে লা-মকানের মেহমান বানিয়েছেন। তাঁর কৃতজ্ঞতা জানাই, যিনি আমাদেরকে নবী প্রদর্শিত হেদায়েতে প্রতিষ্ঠিত রাখতে হক্কানী পীর মাশায়েখকে তাঁর নায়েব ও প্রতিনিধিরূপে আমাদের মাঝে প্রেরণ করে থাকেন।
আল্লাহ্ এক, অদ্বিতীয়। তিনিই একমাত্র উপাস্য। আল্লাহ্ ছাড়া আর কোন উপাস্য নেই। তাঁরই দয়ায় সকল সৃষ্টির অস্তিত্ব। তিনি স্রষ্টা, মালিক, প্রভু, পালনকর্তা ও রিযকদাতা। আমাদের হেদায়তের সর্বশ্রেষ্ঠ ওয়াসীলা, মোরাজের দুলহা হয়রত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর নিকটতম বান্দা ও তাঁর প্রিয়তম রাসূল।
আল্লাহ্ আমাদের জীবনে আরেকটি রজব মাসের সাক্ষাৎ ঘটালেন। তাঁর অফুরন্ত শোক্র আদায় করি। রজব অতি বরকতময় একটি মাস। চারটি হারাম মাসের অন্যতম। এ চাঁদেই রয়েছে মহান লাইলাতুর রাগায়িব। অর্থাৎ এ মাসে প্রথম জুমুআহ্র রাত। এ রাতে ইবাদত-বন্দেগীর মধ্যে কাটানোতে অনেক ফযীলত রয়েছে। এ মাসে বড় বৈশিষ্ট্য হল, প্রিয় নবীকে আল্লাহ তাআলা এ চাঁদেরই ২৭ তম রাতে মি’রাজ তথা একান্ত নৈকট্যে, নিবিড় সান্নিধ্যে নিয়ে যান, যেখানে তাঁর উম্মতের জন্য পঞ্জেগানা নামাযের তোহ্ফা প্রদত্ত হয়। ইবাদতের বিশেষ মাসত্রয়ের প্রথম মাস। এ ছাড়াও এ মাসে পাক-ভারত-বাংলা উপমাহাদেশের শ্রেষ্ঠতম ইসলাম প্রচারক আধ্যাত্মিক মহাসাধক, আতায়ে রাসূল গরীব-নওয়ায, খাজা মুঈনুদ্দীন হাসান চিশতী আজমেরী হাসানী হুসাইনী (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)’র ওফাতের মাস। এ অঞ্চলের সুন্নী মুসলমানের জন্য সবিশেষ উল্লেখযোগ্য উপলক্ষ হলে ইমানে আহ্লে সুন্নাত আল্লামা গাজী শেরে বাংলা (আলাইহির রাহমাহ্)’র বার্ষিক উরস শরীফ, যা সর্বস্তরের সুন্নী জনতার মিলন মেলায় পরিণত হয়।
মর্যাদা ও গুরুত্বের ব্যাপকতা বিবেচনায় মে’রাজের প্রসঙ্গ-ব্যাপ্তি অধিকতর। প্রথমত: এটি রাসূলে খোদার মু’জিযা, এর সম্পর্ক আক্বীদা-ঈমানের সাথে, পবিত্র কুরআন-সুন্নাহ্ এ প্রসঙ্গ সরাসরি বর্ণনা করেছে এবং মে’রাজুন্নবী রজব মাসের শেষ দিকে সংঘটিত। তাই এ মাসের প্রারম্ভে এ উপমহাদেশে ইসলাম ও মুসলমান’র প্রচার-প্রসার এবং গৌরব-মহিমা বৃদ্ধিতে সবচেয়ে অগ্রণী ও মৌলিক অবদান যাঁর। সেই মহান আধ্যাত্মিক সম্রাট সুলতানুল হিন্দ্ খাজায়ে খাজেগান গরীব-নওয়ায হয়রত খাজা মুঈনুদ্দীন চিশতী (রহমতুল্লাহি আলাইহি)’র আলোচনাই এ পর্যায়ে বিধেয়।
তাঁর জন্মসন নিয়ে দু’টো মত আছে। ৫৩০ বা ৫৩৭ হিজরী, তবে রজবের ১৪ তারিখ তার জন্ম তারিখ এবং সোমবার এতে দ্বিমত হয়নি। সানজার তাঁর পবিত্র জন্মস’ান। এ কারণে তিনি সানজারী হিসাবেও অধিক খ্যাত। তবে আধ্যাত্মিক সাধনায় যে সিলসিলায় তিনি দীক্ষিত তা চিশতিয়া এবং তিনি এ ক্ষেত্রে ব্যাপক অবদান রাখ। এ সিলসিলায় তাঁর নাম সমুজ্জ্বল হয়ে তিনি ‘চিশতী’ নামেও ব্যাপক প্রসিদ্ধি পেয়ে অসংখ্য মুমিনের মনের মণিকোঠায় প্রদীপ্ত হয়ে আছেন। পিতার নাম খাজা গিয়াসউদ্দীন। মাতা উম্মুল ওয়ারা মাহ্নূর। পিতৃ-মাতৃ উভয়কুলে তিনি সায়্যিদ বংশ লতিকায় একাদশ পুরুষে পিতৃকুল হোসাইনী, মাতৃকুলের দশম পুরুষে হাসানী, দু’ধারা শেরে খোদার সাথে বেলায়তের মোহনায় মিলিত।
আমরা জানি, আল্লাহ্ তাআলা প্রকাশিত হতে চেয়ে প্রথম যে সৃজন কর্মের সূচনা করেন তা তাঁর সবচেয়ে প্রিয়তম সৃষ্টি, তাঁর সৃজনী-ধারার পবিত্র প্রেরণা ‘নুরে মুহাম্মদী।’ (আলাইহিস সালাওয়া-তু ওয়াত তাসলীমা-ত) এ প্রিয়তম সৃষ্টির মুহাব্বত ও অনুরাগ থেকে তিনি পরবর্তী অসংখ্য সৃষ্টি জগতের অস্তিত্ব দান করে যান। বলতে পারি, সৃষ্টিকুলে অনাগত কালব্যাপী যত মান-মর্যাদা আদর-কদর, সৌন্দর্য-মহিমার প্রকাশ দৃষ্ট হবে-এসব কিছুর মহান ওয়াসীলা তাঁর সর্বপ্রথম, সর্বশ্রেষ্ঠ ও প্রিয়তম সৃষ্ট হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। তাই সৃষ্টি সেরা মানুষের মত মর্যাদা আল্লাহর কাছে পছন্দনীয় তা নিঃসন্দেহে সেই প্রিয়তম সত্তার সাথে সম্পর্কেরই মানদণ্ডে বিচার্য। আল্লামা ইকবালের মন্তব্য তাই যথার্থই, ‘আ-বরোয়ে মা যেনামে মুস্তফা।’ আমাদের মান-সম্মান যে নবী মুস্তফা’র নামে। তাঁরই উম্মত পরিচয়েই শেষ বিচারের দিন আমাদের শ্রেষ্ঠতম উম্মতের মর্যাদায় ভূষিত করা হবে। যদি তাঁর আনুগত্যের সে গৌরবদীপ্ত পরিচয় সেখানে উদ্ভাসিত করতে পারি।
খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী, যাঁর মূল নাম সায়্যিদ হাসান (আলাইহির রাহমাতু ওয়ার রিদ্বওয়ান) জন্মসূত্রে নবী বংশের উজ্জ্বলতম এক মহান আধ্যাত্মিক জ্যোতিষ্ক ইতোপূর্বে বর্ণিত হয়েছে যা। হাশরের দিন একমাত্র রাসূলেকরীম’র বংশধারা ছাড়া আর কারো বংশীয় পরিচয় থাকবে না। এটা স্বয়ং রাসূলের ফরমান। কাজেই যাঁদেরকে আল্লাহ সেদিন সেই বিশেষ সম্মানে ধন্য করবেন, খাজা মুঈনুদ্দীন হাসান চিশতী সেই বিরল সম্মান ‘নিসবতে রাসূল’ নিয়েই পৃথিবীতে আসেন। রাসূলের আওলাদের জন্য ভালবাসা ও সম্মানের ব্যাপারে স্বয়ং রাসূলই নিজ উম্মতের কাছে দাবী করেছেন। তা স্বয়ং স্রষ্টা আল্লাহ্ তাআলারই নির্দেশে। (সুরা শুরার ২৩তম আয়াত দ্র.) আল্লাহর রাসূল ইরশাদ করেছেন, আমি তোমাদেরকে আমার পরিবারবর্গের ব্যাপারে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি।’ এ কথাটি গুরুত্বের জন্য তিনি দু’বার উল্লেখ করেছেন। মুসলিম শরীফের এ হাদীস মিশকাত গ্রন’কার নিজগ্রনে’ সংকলন করেন।(পৃ.৫৬৮)
খাজা মুঈনুদ্দীন চিশতী (রাহমাহু মাহি আলাইহি) শুধু নবী বংশোদ্ভূত বলেই বরেণ্য, শ্রদ্ধেয় ও মান্যবর নয়; বরং তিনি আতায়ে রাসূল। অর্থাৎ আল্লাহর রাসূল ভারতবাসীর কাছে তাঁর নুরানী সত্তাকে প্রতিনিধিত্বের নিশান শিক্ষা অর্পণ করে উম্মতের কাছে অনুগ্রহের তোহফা স্বরূপ পাঠিয়েছেন। এজন্য তাঁর উপাধি আতায়ে রাসূল। রাসূল’র দ্বীন প্রচারে তিনি যাঁকে নির্দেশপূর্বক প্রেরণ করেন তাঁকে তো ঈমানদার ঈমান’র কৃতজ্ঞতায় হৃদয়ে স’ান দেওয়াই সমীচীন। দ্বিতীয় বার হজ্ব সমাপনান্তে রাসূলে পাক’র দরবারে হাজির হন, তখন দৈব বাণীর মত আল্লাহর রাসূল’র রওযা শরীফের অভ্যন্তর হতে আওয়াজ আসে, “হে মুঈনুদ্দীন, আপনি হিন্দুস্তানে গমন করুন; আমি আপনাকে হিন্দুস’ানে বেলায়তের সম্রাট বানিয়ে দিলাম।” (প্রায় জীবনী গ্রনে’ এ তথ্য সন্নিবেশিত) পরবর্তীতে তাঁকে স্বপ্নে এই উপমহাদেশের বিশেষত রাজস’ানের আজমীর’র ভৌগোলিক চিত্র ও নকশা দেখানো হয়। তিনি দুর্গম পথে ক্লান্তি ক্লেশ সহ্য করে ধর্ম প্রচারের গুরু দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে শেষতক আজমীরে আগমন করেন।
খাজা মুঈনুদ্দীন চিশতীর আরেক পরিচিতি হল, তিনি এতদঞ্চলে ব্যাপকভাবে ‘গরীব নওয়ায’ উপাধিতে স্মরণীয়। তিনি গরীবকে অত্যধিক দয়া করেন। এটা আল্লাহর রাসূলের রহমতুল্লিল আলামীন’র সন্তান হিসাবে তাঁর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত দয়া দক্ষিণার পবিত্র উত্তরাধিকার। রহমাতুল্লিল আলামীন যেভাবে একজন উম্মতও বেহেশতে প্রবেশ করার বাকী থাকলে তিনি সন’ষ্ট হবেন না, তেমনি গরীব নওয়াযও আল্লাহর দরবারে এ আবদার করে তাঁকে এ মার্মে রাজী করিয়েছেন যে, তাঁর একজন অনুরক্ত যেন দোযখে না যায়। তাঁর এত বিশাল বর্ণাঢ্য জীবন কর্মের সারবত্ত বর্ণনা করা এ সংক্ষিপ্ত বর্ণনায় কখনো সম্ভব হবার নয়। শুধু তাঁকে কিঞ্চিত স্মরণ করার প্রয়াস তাঁর রূহানী দয়া পাবার জন্য।