গভীর শূন্যতার আগস্ট

সফিক চৌধুরী

বছর ঘুরে আবার এলো শোকাবহ আগস্ট। আমাদের কাছে আগস্ট আর ১৫ শুধু একটি দিন আর মাস নয়, তা আমাদের শোক আর সেই শোক থেকে দেশের প্রতি দেশের জনগণের প্রতি জাতির জনকের ভালোবাসা, আদর্শ আর ত্যাগকে জেনে আর তা হৃদয়ে ধারন করে সে অনুযায়ী নিজেকে দেশপ্রেমে উজ্জীবিত করার ক্ষণ।
বঙ্গবন্ধু একদিনে ‘বঙ্গবন্ধু’ ‘জাতির জনক’ আর হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি হয়ে উঠেননি। মানুষের প্রতি তাঁর অসীম মমত্ববোধ, ভালোবাসা আর সর্বোপরি দেশের প্রতি তাঁর সীমাহীন ভালোবাসা তাঁকে আমাদের কাছে মহান করে তুলেছে। আজকে আমাদের আত্মকেন্দ্রিক, ভঙ্গুর সমাজব্যবস্থায় বঙ্গবন্ধু’র আদর্শ আর তাঁর দিক নির্দেশনা বড় বেশি প্রয়োজন।
কারণ ’৭৫ পরবর্তী আমাদের সমাজের বিভাজন আজ বড্ড বেশি কদাকার। বঙ্গবন্ধু’র রাষ্ট্র ও সমাজ চিন্তায় প্রথমেই প্রাধান্য পেত দেশের সাধারণ মানুষ। তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পাঠে আমরা তাঁর প্রমাণ পাই’..একজন মানুষ হিসেবে সমগ্র মানবজাতি নিয়েই আমি ভাবি। একজন বাঙালি হিসাবে যা কিছু বাঙালিদের সাথে সম্পর্কিত তাই আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। এই নিরন্তর সম্পৃক্তির উৎস মানুষের ভালোবাসা, অক্ষয় ভালোবাসা, যে ভালোবাসা আমার রাজনীতি এবং অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে।”
কিন্তু বর্তমানে গণমানুষের জন্য তাঁর মতো এমন জননেতা কই?
দেশ স্বাধীনের পর পাকিস্তান কারাগারের বন্দিদশা থেকে বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরেন ১০ জানুয়ারি ১৯৭২। দেশে ফিরেই নতুন বাংলাদেশকে নব উদ্যমে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেন তিনি।
তৃতীয় বিশ্বের যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের জন্য নতুন অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, শিক্ষানীতি ও পররাষ্ট্রনীতি এবং দেশের জনমানুষের জন্য বাস্তবসম্মত সংবিধান প্রণয়নসহ এমন অনেক কাজ যা ছিল অনেক কঠিন ও দুরূহ, কিন্তু বঙ্গবন্ধু খুব অল্প সময়ে তা সম্পন্ন করেন তাঁর প্রজ্ঞা ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাজনৈতিক জ্ঞান দিয়ে। আজকের বাংলাদেশে নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছেই যা অজানা।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জড়িয়ে আছেন বাংলার গণমানুষের হৃদয়জুড়ে। এমন একজন মহানায়কের কথা লিখতে গিয়ে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় আবেগ জড়িয়ে ধরে বারবার।
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। এটা কেবল নিছক চাওয়া ছিল না। তাঁর জন্য তিনি তাঁর পুরো জীবন অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন।
আজকে যদি আমরা বঙ্গবন্ধুকে সত্যিকারের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা জানাতে চাই, তবে আমাদের অবশ্যই স্বাধীনতাকে অর্থপূর্ণ করতে হবে। আর তা করতে হলে, আমাদের দরকার সুশাসন, মানবাধিকার আর জবাবদিহিতাপূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থা।
আজকে আমাদের ভাবনার সময় এসেছে, আমরা আসলেই বঙ্গবন্ধুকে কতটুকু ধারণ করতে পেরেছি? আমরা কি আদৌ বঙ্গবন্ধু’র এই দেশের প্রতি ও দেশের জনগণের প্রতি তাঁর ভালোবাসাকে আমাদের নিজেদের মাঝে স্থান দিতে পেরেছি? তাঁর আদর্শ আর রাজনৈতিক দর্শন আমাদের কয়জন রাজনৈতিক নেতার মধ্যে দেখতে পাই?
বঙ্গবন্ধু হত্যার দীর্ঘ অনেক বছর পর আমরা বিচার নিশ্চিত করতে পেরেছি, যদিও অনেকে পলাতক আছেন। তাদেরও অচিরেই দেশে ফিরিয়ে আনা হবে, এই প্রত্যাশা আমাদের সকলের।
সেই সাথে এও প্রত্যাশা, শুধু মুখেই বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ নয়, আমাদের কাজে ও দেশচিন্তায়ও বঙ্গবন্ধু’র পরমতসহিষ্ণুতা ও মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন অন্যান্য রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতি সম্মান স্থান পাবে। স্বপ্নের সোনার বাংলা ফিরিয়ে আনার সংগ্রামটাই এখন চলছে।

লেখক : বিতার্কিক