বিশ্ব পানি দিবস আজ

গভীর নলকূপের পানির বিশুদ্ধতা নিয়ে আশঙ্কা

পরীক্ষণ ছাড়াই পান করা হচ্ছে নগরীর প্রায় ৩০ হাজার গভীর নলকূপের পানি

ভূঁইয়া নজরুল

আজমির হোসাইন চৌধুরী একটি শীর্ষস’ানীয় শিপিং কোম্পানিতে চাকরি করেন। ভাড়াটিয়া হিসেবে তিনি বসবাস করেন নগরীর কর্নেলহাট এলাকায়। দীর্ঘদিন ধরে সেই ভবনে ব্যবহৃত হয়ে আসছে গভীর নলকূপের পানি, যদিও এখন ওয়াসার সংযোগ রয়েছে। তবে সেই গভীর নলকূপের পানির গুণাগুণ পরীক্ষা না করেই এতোদিন ধরে পান করে আসছেন ভবনের বাসিন্দারা। এই চিত্র শুধু আজমির হোসাইনের ক্ষেত্রে নয়, নগরীর ৯৯ শতাংশ গভীর নলকূপের ক্ষেত্রে একই চিত্র। অর্থাৎ গভীর নলকূপের পানি নিরাপদ ভেবে পরীক্ষা ছাড়াই পান করে আসছে বাসিন্দারা।
আসলে কি গভীর নলকূপের পানি নিরাপদ? চট্টগ্রাম ওয়াসা, পরিবেশ অধিদপ্তর, বিএসটিআই এবং পানি নিয়ে কাজ করা চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, শহরের গভীর নলকূপের পানি সব জায়গায় নিরাপদ নয়। এই পানিতে কোথাও যেমন রয়েছে মাত্রাতিরিক্ত লবণের উপসি’তি, আবার কোথাও পনিতে রয়েছে আয়রন কিংবা পানি ঘোলা ।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস’াপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল্লাহ বলেন, ‘আমরা হালিশহর এলাকায় কোনো গভীর নলকূপ বসাতে পারিনি। ফলে এই এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পানির কষ্ট পেয়েছে।‘
কিন’ কেন পারেননি প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এখানকার পানিতে আয়রন ও লবণের পরিমাণ বেশি।
২০১৫ সালের অক্টোবর মাসের পানির পরীক্ষা রিপোর্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা-১৯৯৭ অনুযায়ী এক লিটার পানিতে ১০ মিলিগ্রাম ঘোলা থাকার কথা থাকলেও এখানকার পানিতে পাওয়া গেছে ৪৫ দশমিক ২ মিলিগ্রাম। প্রতি লিটার পানিতে যেখানে ২০০ থেকে ৫০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম কার্বনেট থাকার কথা সেখানে পাওয়া গেছে ১৯৫০ মিলিগ্রাম। প্রতি লিটার পানিতে ১৫০ থেকে ৬০০ মিলিগ্রাম লবণ থাকার কথা থাকলেও পাওয়া গেছে ৬২০০ মিলিগ্রাম। পানিতে দ্রবীভূত পদার্থের পরিমাণ প্রতি লিটারে ১০০০ থাকার কথা থাকলেও পাওয়া গেছে ১০ হাজার ৬৬০। প্রতি লিটার পানিতে শূন্য দশমিক ৩ থেকে এক মিলিগ্রাম আয়রন থাকার কথা থাকলেও পাওয়া গেছে ৬। হালিশহর এলাকায় বৈধ বা অবৈধভাবে বসানো হাজারো গভীর নলকূপের ক্ষেত্রে একই চিত্র পাওয়া যাবে বলেই ধারণা করা যায়।
প্রসঙ্গত গত বছর ওই এলাকার মানুষ পানিবাহিত রোগে গণহারে আক্রান্ত হয়, তখন এর কারণ হিসেবে ওয়াসার পানিকে দোষারোপ করা হয়। কিন’ দেখা গেছে ওয়াসার পানির মানমাত্রা ঠিক থাকলেও বাসিন্দাদের রিজার্ভার কিংবা গভীর নলকূপের পানি মানমাত্রা অনুযায়ী ছিল না।
পানির মানের এই চিত্র শুধু হালিশহরের নয়, নগরীর বিভিন্ন এলাকায় এই সমস্যা রয়েছে বলে জানান চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. স্বপন কুমার পালিত। তিনি বলেন, নগরীর হালিশহর, কর্নেলহাট, ষোলশহর, বাকলিয়া, পতেঙ্গা, পাথরঘাটা প্রভৃতি এলাকার পানিতে আয়রন, লবণ কিংবা আর্সেনিকের প্রাধান্য বেশি। তবে গভীর নলকূপে আর্সেনিকের সমস্যা নেই।
চট্টগ্রাম মহানগরীর পানযোগ্য পানির উৎস দুটি। একটি হলো ভূ-গর্ভস’ পানি এবং অপরটি কর্ণফুলী ও হালদার পানি পরিশোধন করে সরবরাহ করা। নদীর পানি পরিশোধন করে ওয়াসা সরবরাহ করে থাকে। কিন’ গভীর নলকূপের পানি কখনো পরিশোধন করা হয় না বলে জানান চট্টগ্রাম ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ওয়াসা পরিচালিত গভীর নলকূপগুলোর পানি কালুরঘাট আয়রন রিমুভ্যাল প্ল্যান্ট থেকে পরিশোধন করা হলেও গ্রাহক পর্যায়ের গভীর নলকূপের পানি পরিশোধন করা হয় না।
তার মানে কি নগরীতে গ্রাহক পর্যায়ে বসানো গভীর নলকূপের পানি বিশুদ্ধ নয়? এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, যেহেতু নগরীর ভূ-গর্ভস’ পানিতে আয়রন রয়েছে, আর তা যদি পরিশোধন করে খাওয়া না হয় তাহলে তা বিশুদ্ধ হবে কেন? মানুষজন বছরের পর বছর ধরে সেই পানি পান করে আসছে কোনো ধরনের পরীক্ষা ছাড়াই। এই শহরের ৯৯ শতাংশ গভীর নলকূপের পানি পান করা হচ্ছে পরীক্ষা ছাড়া। এক শতাংশ মানুষ হয়তো তা পরীক্ষা করে।
নগরীতে কী পরিমাণ গভীর নলকূপ রয়েছে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস’াপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল্লাহ বলেন, ‘আমাদের অনুমোদিত রয়েছে প্রায় তিন হাজার, কিন’ আমাদের অনুমোদনের বাইরে রয়েছে প্রায় ৩০ হাজার।’
গভীর নলকূপের পানি অবশ্যই পরীক্ষা করে পান করা উচিত বলে জানান পরিবেশ অধিদপ্তরের গবেষণাগারের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ জমির উদ্দিন। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন এলাকার পানিতে আয়রনসহ অন্যান্যা ধাতব পদার্থ ও লবণাক্ততা রয়েছে। অনেক আয়রন আছে যা পানিকে ঘোলা করে না কিন’ এর উপসি’তি রয়েছে এবং পরীক্ষায় শনাক্ত হয়। এজন্য পানি পরীক্ষণ করে পান করা প্রয়োজন।
এই পরীক্ষণের কাজটি কোথায় করা যায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, চট্টগ্রাম ওয়াসার গবেষণাগার, পরিবেশ গবেষণাগার, বিএসটিআই কিংবা বালুছরায় বিসিসিআইসি গবেষণাগারেও করা যায়। বিশুদ্ধ পানি পান না করার কারণেই আমাদের বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ হচ্ছে।
তবে নগরবাসীকে গভীর নলকূপ থেকে সরে আসতে হবে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস’াপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল্লাহ। তিনি বলেন, ঝুঁকি নিয়ে গভীর নলকূপের পানি পান করার প্রয়োজন নেই। ওয়াসা আগামীতে সব ঘরে সংযোগ দেবে। ইতিমধ্যে ওয়াসার ৪০টি গভীর নলকূপ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে বাকিগুলোও বন্ধ করা হবে। নগরবাসীও যাতে তাদের নলকূপগুলো বন্ধ করে দেয়।
এসব গভীর নলকূপ বন্ধ করে দিলে পরিবেশের জন্যও সহায়ক হবে জানিয়েছেন অধ্যাপক ড. স্বপন কুমার পালিত। তিনি বলেন, ভূ-গর্ভস’ পানি উত্তোলন কমিয়ে দিতে হবে এবং তা যাতে রিচার্জ হয় সেজন্য সবুজায়নের পরিমাণ বাড়াতে হবে।
উল্লেখ্য, আজ বিশ্ব পানি দিবস। চট্টগ্রাম ওয়াসা বর্তমানে তিনটি পানি শোধনাগার প্রকল্প ও গভীর নলকূপের মাধ্যমে নগরবাসীকে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করছে। তবে এর বাইরেও নগরবাসী নিজেদের উদ্যোগে গভীর নলকূপ বসিয়ে পানযোগ্য পানি উত্তোলন করছে ।