গণপরিবহনে নিশ্চিত হোক নারীর নিরাপত্তা

ফিরোজা আক্তার হীরা

বাংলাদেশের সড়কগুলো নারীদের চলাচলের জন্য দিন দিন যেন নরকে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। সমপ্রসারণশীল যুগে নানাবিধ কারণে নারীদের ঘরে বাইরে ব্যস্ততা বেড়ে গেছে। বিশেষ করে দেশে শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে তাদের পদচারণা বেড়েছে। প্রতিদিন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা কর্মস’লে যেতে হয় তাদের। এসবের পাশাপাশি সংসার ও ব্যক্তিগত কারণে নারীদের এক স’ান থেকে অন্যস’ানে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা পড়ে। এজন্য বেশিরভাগ নারীকেই যাতায়াতের জন্য গণপরিবহনের ওপর ভরসা রাখতে হয়। অথচ গণপরিবহনে যাতায়াত নারীদের জন্য বিড়ম্বনার বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তো এসব গণপরিবহন নারীর হয়রানি ও লাঞ্ছনার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সমপ্রতি একশন এইড বাংলাদেশ এক জরিপে বলছে, ৮৭ শতাংশ নারী বাস টার্মিনাল বা ট্রেন স্টেশনের মতো যায়গায় হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন। এ সংখ্যাটা রাস্তায় ৮০ শতাংশ আর স্কুল কলেজের বাইরে প্রায় ৭০ শতাংশ নারী। গত কয়েক বছরে দেশে পিছু নেয়া পুরুষের হাতে এমনকি খুন হয়েছেন স্কুল পড়ুয়া কয়েকজন মেয়ে। এমনকি পরিবহনে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন অনেক কর্মজীবী নারী।
জরিপের তথ্যগুলোর সত্যতা ফুটে উঠবে সামপ্রতিক সময়ের ঘটনাপঞ্জিগুলোর দিকে তাকালেই। চলন্তবাসে নারীদের যৌন হয়রানি ও লাঞ্ছনার খবর এখন স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের কোন না কোন স’ানে চলন্ত বাসে চালক কিংবা হেলপার দ্বারা নারীদের এমন নিগ্রহের কথা ওঠে আসছে সংবাদ মাধ্যমে। কয়েক মাস আগে রূপা ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় চার জনের ফাঁসির খবর আমরা জানি। এই চারজন ২০১৭ সালের আগস্ট মাসের শেষ দিকে রূপা নামক ঐ কলেজ ছাত্রীকে চলন্ত বাসে ধর্ষণের পর হত্যা করে। শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা দিয়ে তিনি বগুড়া থেকে কর্মস’ান ময়মনসিংহে যাওয়ার জন্য ছোঁয়া পরিবহনের একটি বাসে উঠেছিলেন। রূপা হত্যাকাণ্ড ভাবিয়ে তুলেছিল দেশের সচেতন নাগরিকদের। পরবর্তীতে এই মামলার দ্রুত বিচারের ফলে আশা করা হয়েছিল এইসব দানবীয় কার্মকাণ্ড থেকে রক্ষা পাবেন নারীরা। কিন’ না, নারীরা আজও অসহায়। তারা প্রতিনিয়তই লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছেন চলন্ত বাস শ্রমিকদের মাধ্যমে। এটি এতটাই মহামারি আকার ধারণ করেছে যে, নারীরা এখন রীতিমত নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। আর এজন্য অনেক নারীই নিজেদের আত্মরক্ষার জন্য সঙ্গে ছুরি নিয়ে বাসে যাতায়াত করছেন।
সমপ্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি ভিডিও ছড়িয়ে যায়। যেখানে দেখা যায়, এক কলেজ ছাত্রী রাজধানী ঢাকার ধানমন্ডি থেকে আজমপুর যাওয়ার জন্য বাসে ওঠেন সকাল ৬টার দিকে। শুক্রবার হওয়ায় যাত্রী খুব বেশি ছিল না। এক পর্যায়ে বাসটি খালি হয়ে গেলে সেই বাসের হেলপার তার শ্লীলতাহানির চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে উপায় না দেখে সেই ছাত্রীটি সাথে থাকা ছুরি দিয়ে হেলপার লোকটিকে আক্রমণ করে চলন্ত বাসটি থেকে লাফিয়ে নিজ সম্ভ্রম রক্ষা করে, এবং কিছু দূরে দাঁড়ানো ট্রাফিক সার্জেন্টকে সব খুলে বলে বাসটিকে আটকানোর অনুরোধ জানায়। কিন’ সে ট্রাফিক উল্টো মেয়েটি রক্তাক্ত ছুরির কারণে ফেঁসে যাবে বলে সেখান থেকে সরে যেতে বলেন।
এভাবে বাসসহ গণপরিবহনগুলোতে নারীদের চলাফেরা কঠিন হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। তবে প্রতিরোধও কিছুটা শুরু হয়েছে। নারীরাও এখন সাহসী হয়ে উঠছেন। গত সপ্তাহে ঢাকার উত্তরার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করলে সেই ছাত্রী গিয়ে তার বন্ধুদের জানায়। পরে তার বন্ধুরা রাস্তা নেমে সেই তুরাগ পরিবহনের সকল বাস আটকে রাখে। শেষ পর্যন্ত প্রশাসন সেই চালক ও হেলপারকে আটক করলে ছাত্ররা শান্ত হয়। আবার গত শনিবার (৫ মে) চট্টগ্রামে চলন্ত বাসে চালক ও হেলপার এক ছাত্রীর শ্লীলতাহানি করেছে। পরে বাস থেকে লাফিয়ে পড়ে নিজেকে রক্ষা করেন ওই ছাত্রী। এরপর ছাত্রীটি অন্য বাসে ক্যাম্পাসে এসে সহপাঠীদের বিষয়টি জানান। দুপুরের দিকে সহপাঠীদের সঙ্গে নিয়ে নগরীর ওয়াসা মোড়ে গিয়ে বাসটি শনাক্ত করেন। এ সময় প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা চালক ও সহকারীকে পিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করেন। তারা বাসটি ভাঙচুরও করেন।
একের পর এক এসব ঘটনা জানান দেয় নারীরা কতটা অসহায় গণপরিবহন শ্রমিকদের কাছে। নারীদের অবাধ ও নিরাপদ চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস’া না নিলে তারা ঘর থেকে বের হওয়ার সাহস পাবে বলে মনে হয় না। তাই এখনই সরকারকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত।
এজন্য গণপরিবহনের নিবন্ধন এবং সেগুলোর চলাচলের মনিটরিং করা প্রয়োজন। সে সাথে গণপরিহনগুলোতে সিসি ক্যামেরা স’াপনের পাশাপাশি গণপরিবহনে কোনো নারী যৌন হয়রানির শিকার হলে যাতে সঙ্গে সঙ্গে অভিযোগ জানাতে পারেন, সে ব্যবস’াও করতে হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম