যৌন নিগ্রহ-সমকাম

খোলামেলা বললেন মনীষা ও নন্দিতা

সুপ্রভাত ডেস্ক

‘মি টু’ আন্দোলনের ঢেউয়ে যখন ধুঁকছে বলিউড সে সময় ঢাকায় এক আলোচনায় অংশ নিয়ে মুম্বাইয়ের রুপালি পর্দার জগতে যৌন নিপীড়ন, নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি ও সমকাম নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করলেন ভারতের জনপ্রিয় দুই অভিনেত্রী মনীষা কৈরালা ও নন্দিতা দাস। খবর বিডিনিউজ।
ঢাকা লিট ফেস্টের অষ্টম আসরের দ্বিতীয় দিন গতকাল শুক্রবার সকালে বাংলা একাডেমিতে আয়োজিত ‘ব্রেকিং ব্যাড’ নামের এক সেশনে অংশ নিয়ে ঢাকার ভক্তদের নানা প্রশ্নের জবাব দেন তারা।
নেপালের একটি রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম নেওয়া মনীষা কৈরালা শোনান তার বলিউড যাত্রা, অভিনেত্রী হিসেবে নানা সময়ের বাধা, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বলিউডের #মি টু আন্দোলন নিয়ে নিজের ভাবনা।
দুই নারীর সমকাম নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘ফায়ার’-এ অভিনয়ের জন্য আলোচিত নন্দিতা দাশও বলিউডসহ ভারতবর্ষের পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনামুখর হয়েছেন। সাহসের সঙ্গে যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়তে নারীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
গত বছর অক্টোবরে হলিউড অভিনেত্রী অ্যালিসা মিলানো প্রযোজক হার্ভে উইনস্টেইনের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে #মি টু আন্দোলনের সূত্রপাত করেন। এরপর একে একে মুখ খুলতে থাকেন হলিউডের অভিনেত্রীরা। নীরবতা ভেঙে যৌন নিগ্রহের কথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানান দিতে থাকেন নারীরা।
পরে এর ধাক্কা এসে লেগেছে ভারতেও। অভিনেত্রী ও সাবেক মিস ইন্ডিয়া তনুশ্রী দত্ত অভিযোগ তুলেছেন বর্ষীয়ান অভিনেতা নানা পাটেকারের বিরুদ্ধে। ‘হাউজফুল’ নির্মাতা সাজিদ খানের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্তার অভিযোগ করেছেন অভিনয় ও সাংবাদিকতা পেশায় থাকা তিন নারী। এ নিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচনার মধ্যেই ঢাকার মঞ্চে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন আসে মনীষার কৈরালার কাছে।
নিজের অবস’ান ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘আমি সব সময় নিপীড়নবিরোধী। অবিচার আমি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারি না। তবে আমি সোশ্যাল মিডিয়া ট্রায়ালও সমর্থন করি না। তদন্ত সাপেক্ষে প্রমাণ মিললে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস’া নিতে হবে। দোষ প্রমাণিত হলে কোনো ছাড় দেওয়া চলবে না।’ এ সময় নারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘তোমরা নিপীড়নের শিকার হলে মুখটি বুজে থেকো না। বেরিয়ে এসো তোমরা। কথা বল। যখন তোমরা নিজেদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে পারছ, তবে নিজেদের ওপর হওয়া জুলুমের কথা কেন বলছ না? তোমাদের কঠোর উচ্চারণ থামাতে পারে এসব নিপীড়ন।’
এ প্রসঙ্গে অভিনেত্রী-পরিচালক নন্দিতা দাশ বলেন, ‘কোনো ধরনের যৌন নিপীড়ন আমি একেবারেই সহ্য করব না। নারীদের বলছি, তোমরা নিজেদের উপর বিশ্বাস রাখো, বিশ্বাস হারিও না। সহ্য করতে করতে নিপীড়করা পার পেয়ে যাচ্ছে। আর না, এবার এসো প্রতিবাদ করো।’
নন্দিতার কথায় উঠে আসে ‘ফায়ার’ চলচ্চিত্রটি মুক্তি পাওয়ার পর তাকে নানাভাবে বিব্রত হতে হওয়ার কথা।
তিনি বলেন, ‘এখন ভারতের আদালতে সমকামকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। কিন’ সে সময় একজন নারী অভিনেত্রী বোল্ড ক্যারেক্টার প্লে করবে, তাও আবার সমকামী নারীর চরিত্রে, ভূভারতের সংস্কৃতি কি তা মেনে নেবে? সমাজ নারী স্বাধীনতার কথা বললেও সে সময় আমাদের সে সিনেমাটিকে তারা মেনে নিতে পারেনি।
‘আমার পরিচিতজনেরা দেখা হলেই বলত, আচ্ছা আপনি এই বাজে সিনেমাটিতে কেন অভিনয় করলেন বলুন তো! আচ্ছা আপনি তো সমকামী চরিত্রে অভিনয় করেছেন, বাস্তবেও কি আপনি সমকামী? আমি যখন বিমানে উঠেছি অন্য দেশে যাব বলে, তখনও সেই প্রশ্ন। প্রশ্ন পিছু ছাড়েনি আমাকে।’
দীপা মেহতার পরিচালনায় এই চলচ্চিত্রে এক সমকামী নারীর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন নন্দিতা। কট্টরপনি’দের কঠোর সমালোচনা ও প্রেক্ষাগৃহে হামলার ঘটনায় সেন্সর বোর্ড একাধিকার এই চলচ্চিত্রের প্রদর্শন বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিল। পরে অবশ্য আটকে রাখা যায়নি।
বলিউডে পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে নারী অভিনেত্রীদের দেখার কথা তুলে ধরেন মনীষা কৈরালা।
‘এখনও মনে করা হয়, বয়স ৪০ পেরিয়ে গেছে তো ওকে মা-নানীর চরিত্রে দিয়ে দাও। অথচ একজন অভিনেত্রী যে কোনো বয়সে যে কোনো চরিত্রে অভিনয় করতে পারে, এটা এখনও অনেকে মানতে চায় না। হ্যাঁ, অনেক অভিনেত্রী সেই বয়সের সীমারেখা পেরিয়ে এসে ভীষণ সাহসী চরিত্রে অভিনয় করছেন, প্রশংসাও কুড়িয়েছেন। কিন’ সেই অভিনেত্রীদের দেখার দৃষ্টিকোণ এখনও সীমাবদ্ধ।’
সিনেমাতে মুখ্য বা কেন্দ্রীয় চরিত্রে একজন নারী থাকবে. তা বলিউডের অনেক পরিচালকের চোখে এখনও ‘হাস্যকর ব্যাপার’ বলে মন্তব্য করেন মনীষা।
বলিউডে নারীদের এগিয়ে চলার পথ প্রশস্ত হলেও নারীর অধিকারের বিষয়ে আরও অনেক দূর যেতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
বলিউডের আরেক আলোচিত চলচ্চিত্র ‘ফিরাক’র পরিচালক নন্দিতা দাশ বলেন, ‘এই সিনেমাটি মুক্তির পর সবাই ভাবল, এই সেরেছে! একজন নারী অভিনেত্রীর সিনেমা মুক্তি পেল! পরিচালক হিসেবে নয়, আমার পরিচয় হল আমি নারী, আমার পরিচালক সত্তার কথা বেমালুম ভুলে গেলো ওরা।’
তবে তার চলার পথে এটা কোনো বাধা হতে পারেনি জানিয়ে নন্দিতা বলেন, ‘আমি মোটেও দমে যাইনি। এতটুকুও লজ্জা পাইনি। নিজের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড আমি নিজেই করে নিয়েছি।’
নারীর গায়ের রং উজ্জ্বল করার প্রসাধনী সামগ্রীর বিজ্ঞাপন নিয়ে খেদ প্রকাশ করেন নন্দিতা দাশ।
তিনি বলেন, ‘একটু কালো বর্ণের মেয়েদের কেমন করে দেখছে সমাজ! ভাবুন তো। বিউটি প্রডাক্ট বেড়েই চলেছে। চামড়া ফর্সা করার জন্য কত ধরনের ফেইসওয়াস যে বাজারে এসেছে! আমার মতে, এই পণ্যগুলো নারীদের মনোবল একেবারে চুরমার করে দিয়েছে। আমি যখন নারীদের নিয়ে একটি ক্যাম্পেইন করেছি, তখন দেখলাম বিউটি প্রডাক্টগুলো ওদের মনকে কীভাবে ছোট করে দেয়। কেউ কেউ তো আত্মহত্যা করতেও গিয়েছিল।’
এ প্রসঙ্গে মনীষা বলেন, ‘চল্লিশের পর নারীদের এজিং সমস্যা শুরু হয়। তখন বলিউডে কাজ পেতে যদি সমস্যা হয়, তখন অনেকে সার্জারিও করতে গিয়েছে। এসব ধারণা পরিবর্তন হওয়া উচিত।’
বলিউডের আইটেম গানগুলোতে নারীদের বাজেভাবে প্রদর্শনেরও কঠোর সমালোচনা করেন নন্দিতা।
‘কয়েকজন পরিচালকের মুখ্য উদ্দেশ্যই হচ্ছে, নারীদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোকে কীভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তুলবেন। ভায়োলেন্সের ব্যাপারটা কীভাবে নান্দনিকভাবে ফুটিয়ে তুলবে, সেটাই ভাবতে থাকে ওরা। ব্যাপারটি ভীষণ অস্বস্তিকর।’
সামাজিক বিষয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনের নানা বাঁক নিয়েও কথা বলেন মনীষা কৈরালা। তার জীবনের নানা কাহিনী, বলিউড যাত্রা আর নিজের মূল্যবোধ তিনি প্রকাশ করেছেন ‘হিল্ড’ নামের একটি বই। বইটি নিয়ে ঢাকা লিট ফেস্টের তৃতীয় দিনেও দর্শকের সামনে কথা বলবেন তিনি।
বইটি নিয়ে মনীষা বলেন, ‘নিজের জীবনের নানা কথা, অভিজ্ঞতা, সফলতা আর ব্যর্থতার কথা আমি এই বইতে তুলে ধরেছি। আমার দাম্পত্য জীবনের ব্যর্থতার কথাও কিন’ উঠে আসবে। স্ত্রী হিসেবে আমি কতটা ব্যর্থ, সে কথা উঠে এসেছে এই বইয়ে। আমি কীভাবে ক্যান্সার জয় করে এলাম, সে কথাও রয়েছে এখানে।’
মনীষা কৈরালার জন্ম ১৯৭০ সালে, কাঠমাণ্ডুর কৈরালা পরিবারে। কমিউনিস্ট নেতা ও নেপালের প্রথম প্রধানমন্ত্রী বিপি কৈরালা মনীষার ঠাকুরদা, চাচা গিরিজা প্রসাদ কৈরালাও পরে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। মনীষার বাবা প্রকাশ কৈরালা সামলেছেন নেপালের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব।
কমিউনিস্ট পরিবারে জন্ম হলেও শিশুকালেই মনীষাকে টেনেছিল রূপালি জগত। স্কুলবেলাতেই তিনি নাম লেখান মডেলিংয়ে। পরে পড়তে আসেন ভারতে, আর সেখানে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে পেয়ে যান খ্যাতি।
মনীষা প্রথম অভিনয় করেছেন ১৯৮৯ সালে ‘ফেরি ভেতওলা’ নামের একটি সিনেমাতে। পরে বলিউডে এসে থিতু হতে একটু সময় লাগলেও খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি তাকে। তিনি নজরে পড়ে যান ডাকসাইটে পরিচালক সুভাষ ঘাইয়ের; তার সিনেমা ‘সওদাগর’ এর মাধ্যমেই হয়ে যায় মনীষার বলিউডি অভিষেক।
মনীষাকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। সে সময়ে ‘ইয়ালগার’ ‘নাইনটিন ফোরটি টু অ্যা লাভ স্টোরি’, ‘ক্রিমিনাল’, ‘আকেলে হাম আকেলে তুম’, ‘মন’, ‘ছুপা রুস্তম’, ‘তুম’, ‘অগ্নিসাক্ষী’, ‘গুপ্ত’, ‘দিল সে’,‘লজ্জা’, ‘কোম্পানি’-র মতো কমার্শিয়ালে গ্ল্যামারাস অবতারে দেখা যায় তাকে।
কমার্শিয়ালের বাইরে এসে মনীষা বেশ কয়েকটি অন্য ধারার চলচ্চিত্রেও কাজ করেছেন। স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের হিন্দি, মালায়লাম সিনেমাতে অভিনয় করেও দ্যুতি ছড়িয়েছেন তিনি। অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে চারবার ঝুলিতে পুরেছেন ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড।
২০১০ সালে মনীষা বিয়ে করেন সম্রাট দাহাল নামে এক নেপালি ব্যবসায়ীকে, যার সঙ্গে পরিচয়ের মাধ্যম ফেইসবুক। দাম্পত্য দীর্ঘস’ায়ী হয়নি তাদের। দুই বছরেই হয়ে যায় বিচ্ছেদ।
এরপরই মনীষার ক্যারিয়ারে আসে একটা বিরতি। ওভারির ক্যান্সার সনাক্ত হওয়ার পর নিজেকে গুটিয়ে নেন মনীষা। চিকিৎসার উদ্দেশ্যে যান যুক্তরাষ্ট্রে। টানা পাঁচ বছর ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে ফিরে আসেন বলিউডে।
সম্প্রতি তিনি সঞ্জয় দত্তের বায়োপিক ‘সঞ্জু’ তে তার মা নার্গিস দত্তের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন।
মনীষা বলেন, অভিনয় জীবনের শুরুতে একটি ভালো চরিত্র পেতে বেশ কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে তাকে।
‘বাণিজ্যিক সিনেমাতে গতানুগতিক চরিত্রে অভিনয় করতে আমার মোটেও ভালো লাগত না। আমি একটু ব্যতিক্রম হতে চাইতাম। সবাই যা করছে, তার চেয়ে একটু আলাদা কিছু করতে পারলে খুব ভালো লাগত। হ্যাঁ, তখন আমি বাণিজ্যিক সিনেমাতে প্রচুর কাজ করেছি। কিন’ আমার মন পড়ে থাকত আর্ট ফিল্মে।
‘তখন আমি গল্প খুঁজতাম, বিষয় খুঁজতাম। একটি ভালো চরিত্রের জন্য আমি অপেক্ষা করেছি। আমি ভাগ্যবতী যে, পরিচালকরা তেমন গল্প আর চরিত্র নিয়েই এসেছেন আমার কাছে। সুযোগটা আমার কাছে এসেছে, কিন’ অপেক্ষাও করতে হয়েছে। নিজেকে প্রমাণ করতে হয়েছে।’
মনীষা জানান, অভিনয় জীবনে তিনি সব সময়ই জীবনঘনিষ্ঠ চরিত্রের জন্য ব্যাকুল ছিলেন এবং এখনও তা রয়ে গেছে।
‘এ চরিত্রগুলো আমার কাছে ভীষণ চ্যালেঞ্জিং মনে হয়েছে। আমাকে যে তখন চ্যালেঞ্জটা নিতে হত। তখন আমার উঠতি সময়। এমন একটি চরিত্র যখন করতাম, তখন নিজের আনন্দ বেড়ে যেত বহুগুণে। আমি আজও সেই জীবনঘেঁষা চরিত্র খুঁজি।’
আলোচনায় বলিউডের সিনেমার গতিপ্রকৃতি এবং নিজেদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নানা প্রশ্নের জবাব দেন মনীষা ও নন্দিতা।