খেসারত অনেক হয়েছে, আর ভোট বর্জন নয় : কামাল

সুপ্রভাত ডেস্ক

একবার ভোট বর্জন করায় অনেক খেসারত দিতে হয়েছে মনত্মব্য করে আর নির্বাচন বয়কটের আওয়াজ না তুলতে জোট নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ও গণফোরাম সভাপতি কামাল হোসেন। পাশাপাশি সরকারের প্রতি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি। খবর বিডিনিউজের।
এই দাবির পড়্গে যুক্তি দিয়ে কামাল হোসেন বলেছেন, দীর্ঘ দিন পরে দেশে একটি ‘গ্রহণযোগ্য’ নির্বাচন হতে চলায় প্রধান বিরোধী দলের নেত্রীকে কারাগারে রাখা সমীচীন হবে না, যেখানে অপর প্রধান দলের নেত্রী সরকার প্রধান থাকছেন।
পাঁচ বছর আগে জাতীয় নির্বাচন বর্জন ও প্রতিহতের ডাক দিয়ে ব্যর্থ হওয়া বিএনপিকে নিয়ে এবার ঐক্যফ্রন্ট গড়ে তুলেছেন কামাল হোসেন। এই জোট থেকেই এবার নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে বিএনপি।
নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার ও খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ বিএনপির দাবিগুলো পূরণ না হলেও দলটি নির্বাচনে আসায় দীর্ঘ দিন পর সরগরম হয়েছে রাজনীতির মাঠ। প্রার্থী বাছাইয়ে দলীয় মনোনয়ন ফরম বিতরণ ও জমা ঘিরে প্রতিদিন নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় ঘিরে ঘটছে হাজারো নেতাকর্মীর সমাবেশ।
তবে এর মধ্যে গত বুধবার নয়া পল্টনে পুলিশের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের পর নির্বাচন কমিশনে গিয়ে এর জন্য ড়্গমতাসীন আওয়ামী লীগকে দায়ী করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরম্নল ইসলাম আলমগীর। বিএনপির নির্বাচনে থাকা না থাকা সরকার ও নির্বাচন কমিশনের আচরণের ওপর নির্ভর করবে বলেও হুমকি দেন তিনি।
এই প্রেড়্গাপটে গতকাল ঢাকায় এক সমাবেশে কামাল হোসেন বলেন, ‘আমরা দ্রম্নত নির্বাচন চাই। অবাধ, নিরপেড়্গ, সুষ্ঠু নির্বাচন চাই। আর আমি সবাইকে হাতজোড় করে বলব, বয়কট বয়কট আমরা করব না।
‘একবার করে আমাদের যে খেসারত দিতে হয়েছে। এটা যাতে কোনো দিন আর না দিতে হয়।’
সুষ্ঠু ভোট নিশ্চিতে তরম্নণদের এগিয়ে আসার আহ্বান তিনি বলেন, ‘যত রকমের দশনম্বরি তারা করে, আমরা ভোট দেব। আপনারা তৈরি হন। আমরা হাজারে হাজারে গিয়ে ভোট দেব। আপনারা ঘরে ঘরে যাবেন। ভোট চাইবেন। এর জন্য দুই কোটি তরম্নণ ভোটারদেরও এগিয়ে আসতে হবে।’
রাজধানীর সুপ্রিম কোর্টেরআইনজীবী সমিতি প্রাঙ্গণে বিকেলে জাতীয় আইনজীবী ঐক্যফ্রন্ট আয়োজিত আইনজীবী মহাসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন পেশায় আইনজীবী কামাল হোসেন।
খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি ‘খুবই ন্যায়সঙ্গত’ মনত্মব্য করে তিনি বলেন, ‘দেশের একটি বিরোধী দলের প্রধান ছিলেন তিনি। যেহেতু একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন এতদিন পরে হতে যাচ্ছে, তাতে একটা দলের নেত্রী সরকারের প্রধান থাকবেন, আর আরেক দলের নেত্রীকে সেই সেন্ট্রাল জেলে রেখে অপমান করা হবে-এটা একদমই মেনে নেওয়া যায় না। উনাকে (খালেদা জিয়া) মুক্ত করা দরকার, যাতে উনি তার নেতাদের নিয়ে দেশের মানুষের কাছে গিয়ে নির্বাচনে ভোট চাইতে পারেন।’
খালেদা জিয়া ছাড়াও হাজার হাজার নেতাকর্মীকে কারাবন্দি করা হয়েছে অভিযোগ তুলে কামাল হোসেন বলেন, প্রতিদিনই নেতাকর্মীদের গ্রেফতারের তথ্য পাচ্ছেন তিনি।
‘এভাবে বৈষম্য সৃষ্টি করে গণতন্ত্র ফিরে আসবে না, সাংবিধানিক শাসনও থাকবে না। দেশ একটা অরাজকতার মধ্যে পড়বে। এজন্য তার (খালেদা) মুক্তি দেওয়া দরকার।’
ভোটগ্রহণে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধানেত্মর সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘সকলের মতামত উপেড়্গা করে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে কেন ইভিএম ব্যবহার করা হবে? এই সরকারের বড় ঘাটতি হল- এরা পাঁচজন যা মনে করে, তাই সিদ্ধানত্ম নিয়ে নেন। জাতীয় নীতির তোয়াক্কা না করে তারা এসব করছে।’
সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের প্রসঙ্গ টেনে এই আইনজীবী বলেন, ‘সাতজন বিচারপতি মিলে একটা রায় দিলেন কিন’ কথা শুনতে হলো সিনহা সাহেবকে। এতো লজ্জা আমি জীবনে পাইনি, যেদিন দেখলাম কোনো একজন মন্ত্রী যখন প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে বলেছিলেন, ‘তোকে কে নিয়োগ দিয়েছিল?’
‘একজন প্রধান বিচারপতিকে কেউ এভাবে বলতে পারে না। সে যে-ই হোক। যে এসব কথা বলেছে তার আদালত অবমাননা এখনো হতে পারে বলে আমি মনে করি।’
এই ঔদ্ধত্য দেখানোর ফল ভোগ করতেই হবে বলে মনে করেন কামাল হোসেন: ‘আজকে হোক, কালকে হোক- কেউ পার পাবে না। ড়্গমতায় থাকলে যে কেউ, যা খুশি করে পার পাবে না- এটাই বাংলাদেশ।’
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর সরকার গঠনের সমালোচনা করে কামাল হোসেন বলেন, ‘দুঃখজনক হলেও সত্যি গত পাঁচ বছর দেশ যেভাবে শাসিত হয়েছে এটাকে কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে আমি জানি না। ২০১৪ তে একটা নির্বাচন হয়েছিল। পরে বিষয়টা যখন কোর্টে আসলো অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে আমাকে ডেকেছিল। কোর্ট জিজ্ঞেস করেছিল, আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন। আমি বললাম যে, মূল্যায়ন করলে তো দুই মিনিটেই বলা যায় যে এটা কোনো নির্বাচনই ছিল না। আরেকটা নির্বাচন করতে হবে।
‘সরকার তো বলছে, দ্রম্নত আরেকটা নির্বাচন করবে। সরকারের পড়্গের লোকই সেখানে বলেছে, তাৎড়্গণিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য একটা সরকার করে নেওয়া হয়েছে, সকলের সঙ্গে আলোচনা করছি যেন দ্রম্নত একটা নির্বাচন করা যায়।’
ওই কথায় তিনিও আশ্বসত্ম হয়েছিলেন জানিয়ে প্রবীণ এই আইনজীবী বলেন, ‘তখন আমি কোর্টকে বললাম, আমার কিছু বলতে হবে না, তারা তো নিজেরাই বলছে যে, একটি পরিসি’তি মোকাবেলার জন্য করেছে, তারাও এটাকে ডিফাইন করতে পারছে না, বলছে দ্রম্নত আরেকটা নির্বাচন দেবে।’
এই দ্রম্নত মানে কি পাঁচ বছর?-প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ‘সরকার এত হালকা হয়ে গেছে যে, তারা এ রকম কথা বলে যে, তার অর্থও তারা বোঝে না। দ্রম্নত মানে কি পাঁচ বছর? আমি জানতে চাই। যারা আজ সরকারের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন তারা দেখেন ২০১৪ তে দাঁড়িয়ে আপনারা কী বলেছিলেন। যদি কথাগুলো মনে না থাকে তাহলে কোর্টের অর্ডার বের করে দেখেন।
‘১৬ কোটি মানুষের দেশ। এই দেশে সরকার যদি কোনো কথা বলে তবে দায়িত্ব নিয়ে কথা বলতে হয়। ষোলো কোটি মানুষকে যা-তা বলে পাঁচ বছর এ ধরনের শাসন বজায় রেখেছে।’
বাহাত্তরের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির প্রধান কামাল বলেন, ‘সংবিধানের মৌলিক কথা হচ্ছে, জনগণ ড়্গমতার মালিক। কিন’ জনগণ যদি তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দিয়ে তাদের ড়্গমতা না প্রয়োগ করাতে পারে তাহলে স্বাধীনতার উপরে আঘাত দেওয়া হয়। দেশ স্বাধীন থাকে না। এই দেশটাকে পরাধীন দেশ বানাতে দিতে পারি না। লড়্গ লড়্গ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে এই দেশ স্বাধীন হয়েছে। এই স্বাধীনতার অর্থ হলো জনগণ এই ড়্গমতার মালিক।
‘কিন’ এই পাঁচ বছরে মূলত এই দেশকে যেভাবে শাসন করা হয়েছে,তা জনগণের সাথে ভাওতাবাজি ছাড়া কিছু না।’
সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের কঠোর সমালোচনা করে গণফোরাম সভাপতি বলেন, ‘মন্ত্রী যে বলা হচ্ছে, এরা কারা? উপদেষ্টা, এরা কারা? তারপর যাদেরকে মেম্বার বলা হচ্ছে তারা কারা? আলহামদুলিলস্নাহ, অবৈধ ১৫৪ জন মনোনীত। তারা বলে এমপি। এই এমপি মানে মনোনীত প্রার্থী। এমপি যে মেম্বার অব পার্লামেন্ট- এটা কোনোভাবেই বলা যাবে না।
‘আমি বলি কিছু না, একটু লজ্জাবোধ ফিরে আসুক আমাদের যারা এগুলো করেন লজ্জাহীনভাবে। আমাদের মহামান্য যারা আছেন, এমপি, মন্ত্রীদের একটু লজ্জাবোধ ফিরে আসুক। মানুষের সনত্মানের লজ্জাবোধ থাকে। আপনারা লজ্জাহীনভাবে এগুলো করে যাবেন, এটা হয় না। পাঁচ বছর চালিয়ে গেছেন। বলছেন, আমি এমপি। আপনি কাদের এমপি? কে আপনাকে নির্বাচিত করেছে?
‘এটার জন্য নতুন কোনো শব্দ বের করতে হবে। বলতে হবে জিপি, ঘোষিত প্রতিনিধি। এখন থেকে আমাদের এমপি না লিখে জিপি লেখা শুরম্ন করতে হবে। ঘোষণার কত জোর? ঘোষণা করে দিল এমপি হয়ে গেল? ঘোষণা করে দিলাম মন্ত্রী হয়ে গেল? এই ঘোষণার শক্তিটা কোথা থেকে আসে, সংবিধনের কোথায় লেখা আছে?’
মহাসমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও জাতীয় আইনজীবী ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক জয়নুল আবেদীন। এতে প্রধান বক্তা ছিলেন বিএনপি মহাসচিব ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতা মির্জা ফখরম্নল ইসলাম আলমগীর।
এছাড়াও আইনজীবী সমাবেশে বক্তব্য দেন বিএনপির স’ায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ, জমির উদ্দিন সরকার, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন, গণফোরাম ও আইনজীবী নেতা সুব্রত চৌধুরী, জগলুল হায়দার আফ্রিক, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান ওমর, নিতাই রায় চৌধুরী, বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা তৈমুর আলম খন্দকার, বিনেপির যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, খালেদা জিয়ার আইনজীবী ছানাউলস্নাহ মিয়া প্রমুখ।
এছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলা বার থেকে আসা বিএনপিপনি’ আইনজীবীরাও সমাবেশে বক্তব্য দেন।
সভাপতির বক্তব্যে জয়নুল আবেদীন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও বিএনপির নেতাকর্মীদের নিঃশর্ত মুক্তিসহ ১১ দফা দাবি তুলে ধরেন।