স্কুলছাত্রী ইলহাম হত্যা মামলা

খুনি কে?

আলামতে আসামি রাজুর ডিএনএ প্রোফাইল পাওয়া যায়নি, মিলেছে ২ নারীর ধর্ষণের প্রমাণ মেলেনি

মোহাম্মদ রফিক

নগরের আলোচিত স্কুলছাত্রী ইলহাম হত্যায় শিক্ষানবিশ আইনজীবী রিজুয়ান কবির রাজু জড়িত থাকার শতভাগ তথ্য-প্রমাণ এখনও পায়নি মামলার তদন্ত সংস’া সিআইডি। তবে তাকে এখনও প্রধান সন্দেহভাজন আসামি হিসেবেই বিবেচনা করছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিদর্শক স্বপন কান্তি বড়-য়া।
এদিকে সিআইডির ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরটরির ফলাফলে ইলহাম হত্যার বিষয়ে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। ২০১৮ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ইলহাম হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন আলামতের ডিএনএ পরীক্ষা শেষে একটি অ্যানালাইসিস রিপোর্ট পাঠিয়েছে সিআইডি।
এতে বলা হয়, ছুরি, দা এবং ইলহামের সালোয়ার থেকে প্রাপ্ত রক্তে একজন নারীর পূর্ণাঙ্গ ডিএনএ প্রোফাইল পাওয়া গেছে অপরদিকে বেডশিড এবং রজঃস্রাব (সোয়াব) থেকে প্রাপ্ত রক্তে অপর একজন নারীর পূর্ণাঙ্গ ডিএনএ প্রোফাইল পাওয়া গেছে।
এছাড়া ডিএনএ পরীক্ষায় ইলহামকে ধর্ষণের কোনো আলামত মেলেনি। আসামিপক্ষের আইনজীবীর দাবি, আলামত পরীক্ষার ফলাফলে রাজুর ডিএনএ প্রোফাইল পাওয়া যায়নি। সেখানে পাওয়া গেছে দুজন নারীর পূর্ণাঙ্গ ডিএনএ প্রোফাইল। এর মধ্যে একজন ভিকটিম হলে অপর ডিএনএ প্রোফাইলটি কার? ইলহাম খুনে রাজুর সংশ্লিষ্টতা থাকলে ডিএনএ রিপোর্টে পুরুষের প্রোফাইল পাওয়া গেল না কেন, প্রশ্ন আইনজীবীর।
জানা গেছে, ২০১৮ সালের ১৫ জুলাই প্রথম দফায় মোট ৮টি আলামত ডিএনএ পরীক্ষার জন্য সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পাঠান মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। আলামতগুলো হলো ভ্যাজাইনাল সোয়াব (ভিকটিমের রজঃস্রাব), ছুরি, দা, সালোয়ার-কামিজ, বেডশিড, চাবি এবং টিস্যু পেপার। এর সপ্তাহখানেক পর দ্বিতীয় দফায় অভিযুক্ত শিক্ষানবিশ আইনজীবী মো. রিজুয়ানুল কবির রাজুর রক্তের নমুনাও সিআইডির ল্যাবে পাঠানো হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা স্বপন কান্তি বড়-য়ার দাবি, বিছানায় মেয়ের লাশ দেখে নিজের হাতে ছুরি চালিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা চালান ইলহামের মা। এ কারণে আলামত পরীক্ষায় তার (মায়ের) ডিএনএ প্রোফাইলটি পাওয়া গেছে। দশটি আলামত পরীক্ষার ফলাফলে আসামি রাজুর আঙুলের ছাপ, রক্তের নমুনা পাওয়া গেল না কেন, প্রশ্ন করলে স্বপন কুমার বলেন, ‘আসামি পেশায় একজন আইনজীবী। খুনের মামলায় অপরাধ প্রমাণিত হলে কি সাজা হবে সেটি রাজু ভালো করে জানেন। এ কারণে রিমান্ডে আনা হলেও হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেননি রাজু। খুনের পর রাজু হয়তো আলামত নষ্ট করে দিয়েছেন। তবে রাজুই যে ইলহামকে খুন করেছে, এর শতভাগ তথ্য-প্রমাণ আমরা এখনও পাইনি।’
স’ানীয় একটি অভিযোগ, এক গৃহশিক্ষকের সঙ্গে পরকীয়া সম্পর্ক ছিল ইলহামের মায়ের। ওই শিক্ষকের সঙ্গে সম্পর্কের জের ধরেই খুনের এ ঘটনা ঘটতে পারে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জানান, ইলহামের দুজন গৃহশিক্ষক ছিল। এর মধ্যে একজন নারী। ঘটনার দুমাস আগে ইলহামকে পড়ানো ছেড়ে দেন ওই গৃহশিক্ষক। এ দুজনকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডে তাদের কোনো লিংক পাওয়া যায়নি। এছাড়া মেয়ের লাশ দেখে ইলহামের মা কেন আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন এ ব্যাপারেও ইলহামের মাকে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। হতাশা থেকে এ কাণ্ড করেছেন বলে জানিয়েছেন ইলহামের মা।’
রাজুর পরিবারের অভিযোগ, ইলহামের প্রকৃত খুনিকে রক্ষা করতে রহস্যজনক ভুমিকা পালন করছে সিআইডি। ফরেনসিক প্রতিবেদনে রাজুর কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া না গেলেও না অদৃশ্য ইশারায় রাজুকে ইলহামের খুনি বানানোর চেষ্টা চলছে। ঘটনার পর রাজুকে আটক করে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে গিয়ে শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমে ইলহাম হত্যায় জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করেছে পুলিশ।
রাজু বর্তমানে ইলহাম হত্যা মামলায় জামিনে আছেন বলে জানা গেছে।
গত বছর ২৭ জুন বাকলিয়া থানার ল্যান্ডমার্ক আবাসিক এলাকায় নিজ বাসায় ইলহামকে গলাকেটে হত্যা করা হয়। সে নগরের মেরনসান স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। তার বাবা মো. নাছির উদ্দিন সৌদিআরব প্রবাসী। এ ঘটনায় ২৮ জুন দিবাগত রাতে ইলহামের নানা নাসির উদ্দিন বাদি হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ওই মামলায় সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে ইলহামের কথিত মামা শিক্ষানবিশ আইনজীবী রিজুয়ান কবির রাজুকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। রাজু ইলহামের গলাকাটা লাশ চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান ।