সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার জলাবদ্ধতা নিরসন মেগাপ্রকল্প

খালের চওড়া একই থাকছে!

ভূঁইয়া নজরম্নল

সাগরিকা জহুর আহমদ চৌধুরী বিভাগীয় স্টেডিয়ামের পশ্চিমে মহেশখালের একাংশে দীর্ঘদিন ধরে লাল পতাকা বসানো রয়েছে। খালের পানি পাইপের মাধ্যমে অপসারণ করে সেখানে মাটি কাটার জন্য দুই প্রানেত্ম দেয়া হয়েছে বাঁধ। জলাবদ্ধতা নিরসনে সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার মেগাপ্রকল্পের কাজ চলছে এ খালে। এই চিত্র শুধু মহেশখালেই নয়, নগরীর ১১টি খালে এভাবে খ- খ- হয়ে চলছে মাটি উত্তোলনের প্রস’তি।
খাল খনন কাজের কয়েকটি স’ান ঘুরে দেখা যায়, বিদ্যমান খালের মধ্যে দিয়েই পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা হচ্ছে। অর্থাৎ খালের বর্তমান প্রশসত্মতা (চওড়া) ঠিক রেখে মাটি খননের কাজ করা হচ্ছে। খালটি আর নতুন করে চওড়া করা হচ্ছে না। তবে গভীরতা বাড়ানো হবে।
এবিষয়ে প্রকল্পের পরিচালক ও সিডিএ’র নির্বাহি প্রকৌশলী আহমেদ মাঈনুদ্দিন বলেন, ‘আমরা ডিজাইন অনুযায়ী যেখানে যে চওড়া করতে বলা হয়েছে সেই অনুযায়ী চওড়া করবো। তবে বেশিরভাগ ড়্গেত্রে বিদ্যমান চওড়া থাকছে।’
তাহলে খালের সীমানা নির্ধারণ কীভাবে হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিএস শিট অনুযায়ী খালের সীমানা নির্ধারিত হচ্ছে। আর সেই অনুযায়ী খালের জায়গা উদ্বার করে আমরা রাসত্মা নির্মাণ করবো।
এবিষয়ে সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম বলেন, আমরা কোনোভাবেই খালের ভেতরের জায়গায় রাসত্মা নির্মাণ করবো না। রিটেনিং দেয়াল দেয়ার পর খালের বাইরের অংশে ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হবে।
সিডিএ চট্টগ্রাম ওয়াসার মাস্টারপস্ন্যানের আলোকে এই জলাবদ্ধতা নিরসনে মেগাপ্রকল্পটি নিয়েছে। আর সেই মাস্টারপস্ন্যানে কাজ করা ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘খালের কোন অংশে প্রশসত্মতা কতটুকু থাকবে বা গভীরতা কী হবে তা যাতে গবেষণা অনুযায়ী নির্ধারণ হয়। তা না হলে প্রকল্পের সুফলতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে।’
জলাবদ্ধতা বিষয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করা সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য এবং ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশ চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী এম আলী আশরাফ বলেন, ‘মেগাপ্রকল্পের কোথায় কীভাবে কাজ হচ্ছে তা আমাদের জানা নেই। আর এই না জানার কারণে প্রকল্পটি নিয়ে কোনো সুপারিশও দেয়া যাচ্ছে না। তবে আমাদের পরামর্শ থাকবে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান যে নকশা বা ডিজাইন দিয়েছে সেই অনুযায়ী যাতে খালের গভীরতা ও চওড়া এবং সিল্ট ট্র্যাপ বাসত্মবায়ন হয়।’ পরামর্শক
প্রতিষ্ঠানের ডিজাইনের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই জানিয়ে প্রকল্প অনুমোদনকারী সংস’া চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপড়্গের (সিডিএ) চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম বলেন, ‘পরামর্শক প্রতিষ্ঠান যে ডিজাইন দেবে সেই অনুযায়ী প্রকল্পের বাসত্মবায়ন সেনাবাহিনীর মাধ্যমে করা হচ্ছে। এতে বিন্দু পরিমাণ ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই।’
এদিকে গতকাল বিকেলে নগরীর পাথরঘাটা মরিয়ম বিবি খালের অংশে গিয়ে দেখা যায়, খালের মাটি উত্তোলনের কাজ চলছে। একইসাথে খালের উভয় পাশের অবৈধ স’াপনা উচ্ছেদও চলছে। উচ্ছেদে স’ানীয়দের নিজ উদ্যোগে স’াপনা সরিয়ে নেওয়া অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। সাইটে থাকা ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড (এনডি) নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মহাব্যবস’াপক প্রকৌশলী আবদুস সোবহান বলেন, ‘নিজ উদ্যোগে অবৈধ স’াপনা সরিয়ে নিতে তাদের সময় দেয়া হচ্ছে। আর এতে কাজও হচ্ছে।’
প্রকল্পের আওতায় কী কী কাজ করা হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘খালের মাটি উত্তোলনের পাশাপাশি রিটেনিং দেয়াল, ওয়াকওয়ে ও খালের মুখে রেগুলেটর নির্মাণের কাজ রয়েছে। আর এসব কাজ এগিয়ে রাখতে চলতি শুষ্ক মৌসুমে বেশি কাজ করতে হবে।’
জানা যায়, সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার মেগাপ্রকল্প বাসত্মবায়নে নগরীতে প্রাথমিকভাবে ১১টি খালে কাজ শুরম্ন হয়েছে। খালগুলো হলো- বির্জা খাল, মির্জা খাল, ডোমখালী খাল, মহেশখাল, মহেশখালী খাল, গয়নাছড়া খাল, খন্দকিয়া খাল, নোয়া খাল, ফিরিংগি বাজার খাল, চাক্তাই খাল ও রাজাখালী খাল-২।
এসব খালে কতোজন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে জানতে চাইলে প্রকল্পের পরিচালক আহমেদ মাঈনুদ্দিন বলেন, ‘১৭ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান খাল খননের কাজ করছে।’
উলেস্নখ্য, বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টি হলেই পানিতে ডুবে যায় নগরীর বিভিন্ন এলাকা। কখনো সাগর থেকে আসা জোয়ারের পানির প্রভাবে, আবার কখনো অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে, কখনো সড়ক থেকে নালা ও খালে পানি আটকে যাবার কারণে পানিবন্দি থাকে নগরবাসী। এই দুর্ভোগ নিরসনে ২০১৭ সালের ৯ আগস্ট একনেকে (জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহি কমিটি) ৫ হাজার ৬১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেয়। প্রকল্পের আওতায় নগরীর ৩৬টি খাল আরএস শিট অনুযায়ী পূর্বের অবস’ায় নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি, খালের উভয় পাশে ১৫ ফুট চওড়া রোড ও খালের মুখে ৫টি সস্নুইচ গেইট বসানো, ৪২টি সিল্ট ট্র্যাপ (বালি জমার স’ান), ৫টি জলাধার নির্মাণ, ৩৬টি খাল খননের মাধ্যমে ৫ লাখ ২৮ হাজার ২১৪ ঘনমিটার মাটি উত্তোলন, ৪২ লাখ ঘনমিটার কাদা অপসারণ, নতুন করে ১০ দশমিক ৭৭ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণ, ১ লাখ ৭৬ হাজার মিটার দীর্ঘ রিটেনিং দেয়াল নির্মাণ এবং খালের উভয় পাশে ৮৫ দশমিক ৬৮ কিলোমিটার রাসত্মা নির্মাণ করার কাজ রয়েছে।