খামারি নাজিম ৩০ টাকা থেকে কোটিপতি!

বিকাশ চৌধুরী, পটিয়া
Patiya-(CTG)-Picture-15.11

জীবনের প্রথম উপার্জন ছিল মাত্র ৩০ টাকা। এ সামান্য টাকা থেকেই আজ কয়েক কোটি টাকার মালিক হয়েছেন চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার খামারি নাজিম উদ্দিন হায়দার।
এটি কোনো সিনেমার গল্প নয়। বাস্তবে খামার শিল্পের মাধ্যমে কোটিপতি হওয়ার পাশাপাশি প্রান্তিক কৃষকের মুখে হাসি ফোটাতে এলাকায় কাজ করে যাচ্ছেন নাজিম।
তার কাছে উৎসাহ পেয়ে কর্ণফুলী ও পার্শ্ববর্তী পটিয়া উপজেলায় গড়ে ওঠেছে ৫ শতাধিক ছোট বড় মুরগি ও গরুর খামার। এসব খামার থেকে হাজার হাজার লিটার গরুর দুধ চট্টগ্রাম পেরিয়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যাচ্ছে। খামারি নাজিমের প্রচেষ্টায় এলাকায় গড়ে উঠেছে বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন লিমিটেডের (মিল্ক ভিটা) পশ্চিম পটিয়ার দুগ্ধ শীতলীকরণ কেন্দ্র। এখান থেকে দুধ শীতল
করে মিল্কভিটার ঢাকাস’ পূর্ণাঙ্গ কারখানায় নিয়ে প্রক্রিয়া ও প্যাকেটজাত করে তা আবারো দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাজারজাত করা হয়।
নাজিম উদ্দিন হায়দার ১৯৭৬ সালের ৪ নভেম্বর পটিয়া (বর্তমানে কর্ণফুলী) উপজেলার কর্ণফুলী থানাধীন উত্তর চরলক্ষ্যা গ্রামের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে জন্মগ্রহণ করেন। বাবার নাম মাস্টার রশীদ আহমদ ও মায়ের নাম সাহেরা বেগম। চার ভাই দু’ বোনের মধ্যে নাজিম তৃতীয়। নিজের রয়েছে এক ছেলে ও এক কন্যা।
কৈশোর থেকে শুরু করে প্রতিটি কাজে সাফল্য এনেছে তার প্রতিভা। ১৯৯১ সালে জীবনের প্রথম উপার্জন ৩০ টাকা। এ টাকা দিয়ে একটি দেশি মুরগি কিনে পালন করে বাচ্চাসহ তা চারশ টাকায় বিক্রি করেন তিনি। ১৯৯২ সালে নিজের চারশ টাকা, বাবার দেয়া একশ টাকা, নানি থেকে নেয়া আরো একশ টাকা মিলিয়ে ছয়শ টাকা জোগাড় করে একটি ছাগল কিনে পালন শুরু করে। কিছুদিন পর তা ৩ হাজার তিনশ টাকায় বিক্রি করেন। ছাগল বিক্রির টাকা দিয়ে একটি এঁড়ে (ষাঁড়) বাছুর কিনে বর্গা দেন। পরবর্তীতে তা ৩৫ হাজার টাকায় বিক্রি করা হলে নাজিম ভাগে পান ২৩ হাজার ৩৩৩ টাকা। ১৯৯৫ সালের শেষের দিকে নিজের ৩০ হাজার টাকা ও চাচাতো ভাই মো. আবছারের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা নিয়ে প্রথমে ৩শ বয়লার মুরগিসহ পোল্ট্রি খামার শুরু করেন নাজিম। ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে খামারের পরিধি। প্রবীণ এক আওয়ামী লীগ নেতার অনুপ্রেরণায় সানোয়ারা ডেইরি ফার্মে মুরগির পরিবেশক হিসেবে নিয়োগ পান তিনি। এরপর থেকেই পুরো দক্ষিণ চট্টগ্রামে খামারিদের উদ্দীপনা বাড়তে থাকে, জমজমাট হয়ে ওঠে পোল্ট্রি শিল্পের ব্যবসা।
১৯৯৬ সালে সানোয়ারা ডেইরি ফার্মের গরুর খামার পরিদর্শনে গিয়ে দুগ্ধ বাজারজাতকরণের স্বপ্ন দেখেন নাজিম। এরপর সানোয়ারা ডেইরি ফার্ম থেকে ৪৪ হাজার টাকায় একটি ফ্রিসিয়ান জাতের শংকর গাভী কেনেন। পাশাপাশি ব্রয়লার বাচ্চার নতুন ব্যাচ পালতে শুরু করে।
এক পর্যায়ে ২০১০ সালে বার্ড ফ্লু রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে কয়েক হাজার মুরগি মারা যায় তার। এতে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্তও হন নাজিম।
বর্তমানে তার খামারে ১০৭টি দুধেল গাভী, চারটি মহিষ, চারটি ভেড়া, চারটি উন্নতজাতের ছাগল ছাড়াও এক হাজার ব্রয়লার মুরগির আলাদা ফার্ম রয়েছে। প্রতিদিন তার খামার থেকে পাঁচশ লিটার দুধ মিল্ক ভিটার কারখানায় যাচ্ছে। তাছাড়া গরুর খামারের বর্জ্য দিয়ে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট করে ৩৫টি পরিবারের মাঝে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস সরবরাহ করে যাচ্ছেন।
নাজিম উদ্দিন হায়দার বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় লিমিটেডে (মিল্ক ভিটা) ২০১৫ সালে প্রথম পরিচালক নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি পুনরায় চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের পরিচালক নির্বাচিত হন। এ পর্যন্ত তিনবার শ্রেষ্ঠ সমবায়ী হিসেবে মিল্ক ভিটার পুরস্কারও পেয়েছেন। খামার শুরু করার সময় পশ্চিম পটিয়ার ডেইরি অ্যাসোসিয়েশন গড়ে সদস্য হন। পরবর্তীতে খামারিদের নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এ সংগঠনের উদ্যোগে খামারিদের কল্যাণে তিনি ভূমিকা রেখে চলেছেন। দুধের ন্যায্যমূল্যের দাবিতে তারই নেতৃত্বেই রাস্তায় দুধ ঢেলে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন খামারিরা। যা সেসময় সরকারের দৃষ্টিগোচর হয়।
নাজিমের একান্ত প্রচেষ্টায় এলাকায় দুুগ্ধ শীতল কেন্দ্র নির্মিত হয়েছে। যার পূর্ণাঙ্গ সহযোগিতায় ছিলেন সাবেক স’ানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক। বর্তমানে পশ্চিম পটিয়া-কর্ণফুলী এলাকায় মিল্ক ভিটার পূর্ণাঙ্গ কারখানা বাস্তবায়নাধীন।
২০১৩ সালে বিএনপি ও জাতায়াতের ডাকা হরতাল অবরোধ চলাকালে মিল্ক ভিটার দুধের গাড়ি পটিয়া থেকে ঢাকায় যেতে না পারার কারণে নাজিমের নেতৃত্বে খামারিরা ডোবায় দুধ ঢেলে প্রতিবাদ জানান। যা দেশবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক, ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, পটিয়ার সংসদ সদস্য সামশুল হক চৌধুরীকে স্মারকলিপির মাধ্যমে খামারিদের বিষয়টি অবগত করা হয়। পরবর্তীতে পুলিশ প্রশাসনের প্রটোকলে পটিয়া মিল্ক ভিটা থেকে ঢাকা মীরপুর মিল্ক ভিটার কারখানায় দুধ পাঠানো হতো।
সফল খামারি নাজিম উদ্দিন হায়দার বলেন, ‘কৈশোরে আমার প্রথম উর্পাজন মাত্র ৩০ টাকা। তা নিয়ে শ্রম দিয়ে, মেধা খাটিয়ে, আল্লাহর রহমতে আজ এতদূর এসেছি। বর্তমানে আমার খামারে দুধেল গাভীর সংখ্যা একশ পেরিয়েছে। খামারিদের জন্য দক্ষিণ জেলা ডেইরি অ্যাসোসিয়েশন নামে সংগঠনও গড়েছি, যেখানে বর্তমানে আমি সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছি। প্রান্তিক সমবায় কৃষকদের মুখে হাসি ফোটাতে সকলের সহযোগিতা ও দোয়া কামনা করি।’