খাবার শেষ, এখনও উদ্ধার পাইনি : মুসা ইব্রাহীম

সুপ্রভাত ডেস্ক

ইন্দোনেশিয়ার কারস্টেনজ পিরামিডে অভিযান শেষে ফেরার পথে বেইজ ক্যাম্পে আটকা পড়া বাংলাদেশের মুসা ইব্রাহীমসহ তিন অভিযাত্রীকে এখনও উদ্ধার করা যায়নি। এভারেস্টজয়ী মুসার সঙ্গে এই অভিযানে আছেন ভারতের এভারেস্টজয়ী পর্বতারোহী সত্যরূপ সিদ্ধান্ত ও নন্দিতা চন্দ্রশেখর। বিরূপ আবহাওয়ার কারণে গত চারদিন ধরে তারা আটকে আছেন সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪ হাজার ২৫৭ মিটার উচ্চতায় মাউন্ট কারস্টেনজের বেইজ ক্যাম্পে।
রোববার সকালে তাদের উদ্ধারের জন্য হেলিকপ্টার রওনা হলেও আবহাওয়া খারাপের দিকে গেলে হেলিকপ্টার ফিরে যায়।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের পক্ষ থেকে রোববার দুপুরে সত্যরূপের স্যাটেলাইট কমিউনিকেটরে যোগাযোগ করা হলে সাড়া দেন মুসা।
তিনি জানান, যে ক্যাম্পে তারা আছেন সে জায়গার নাম লেক ফ্যালি। খাবার শেষ হয়ে যাওয়ায় আগের ক্যাম্পারদের ফেলে যাওয়া খাবার খুঁজে নিয়ে তাই দিয়ে কাজ চালাতে হচ্ছে।
পর্বতারোহী রেইনল্ড মেসনারের তালিকা অনুসারে সাত মহাদেশের সাত সর্বোচ্চ পর্বত চূড়ার (সেভেন সামিট) একটি হল কারস্টেনজ পিরামিড, যা ওশেনিয়া অঞ্চলের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। ইন্দোনেশিয়ার পাপুয়া প্রভিন্সে কারস্টেনজ পর্বতমালায় ৪ হাজার ৮৮৪ মিটার উঁচু ওই শৃঙ্গ স’ানীয়ভাবে পুঞ্চাক জায়া নামেও পরিচিত।
এই অভিযানে অংশ নেওয়ার জন্য ২৯ মে ইন্দোনেশিয়ার বালি হয়ে পাপুয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন মুসা ইব্রাহীম। বালিতে তার সঙ্গে যোগ দেন সত্যরূপ ও নন্দিতা। পরে পাপুয়ার নাবির থেকে শুরু হয় মূল অভিযান, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ এক্সপেডিশন টু মাউন্ট কারস্টেনজ পিরামিড’।
সত্যরূপের স্যাটেলাইট কমিউনিকেটরের রেকর্ড অনুযায়ী, ৬ জুন সুগাপা পুলিশ স্টেশন থেকে ছয় দিন ট্রেকিং করে তারা প্রথমবার বেইজ ক্যাম্পে পৌঁছান। বাংলাদেশ সময় ১৩ জুন সকাল ৮টা ৪৯ মিনিটে তিন অভিযাত্রী পৌঁছান কারস্টেনজের চূড়ায়।
এভারেস্টজয়ী ভারতীয় পর্বতারোহী সত্যরূপের বর্ণনা অনুযায়ী, সামিটে পৌঁছানোর আগে যে দুর্গম পথ আর বিরূপ আবহাওয়ার মুখোমুখি তাদের হতে হয়েছে, তাতে এই অভিযানকে নির্দ্বিধায় ‘সব অ্যাডভেঞ্চারের বাবা’ বলা যায়। চূড়া থেকে সেদিন বিকালেই বেইজ ক্যাম্পে ফিরে আসেন তিন অভিযাত্রী। পরদিন ফিরতি পথে রওনা হওয়ার কথা থাকলেও আটকা পড়েন তারা।
এর মধ্যে রসদে টান পড়ায় এবং আবহাওয়ার উন্নতি না হওয়ায় ১৫ জুন ট্রেকিং বাদ দিয়ে হেলিকপ্টারে করে ফেরার কথা ভাবতে শুরু করেন মুসারা। স্যাটেলাইট ফোনে যার যার দেশে যোগাযোগও শুরু করেন।
তাদের আটকা পড়ার খবর বাংলাদেশে পৌঁছালে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে শুরু হয় আলোচনা। মুসার পর্বতারোহণ সংগঠন নর্থ আলপাইন ক্লাবের সদস্য এবং বেশ কয়েকজন বন্ধু-সুহৃদ সাহায্যের আবেদনও ছড়িয়ে দেন। তাদের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলমের সঙ্গে।
শাহরিয়ার আলম রোববার ভোরে ফেইসবুকে জানান, স্যাটেলাইট কমিউনিকেটরের মাধ্যমে সত্যরূপের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়েছে।
‘আমাদের দূতাবাস একটু আগে জানিয়েছে, তিমিকাতে হেলিকপ্টার প্রস্তুত আছে। আবহাওয়া ভালো হলেই তারা তাদের আনতে যাবে। আশা করি আজ সকালেই। আসিয়ান দপ্তর, আমাদের দূতাবাস এবং ভারতীয় দূতাবাস তদারকি করছে।’
কিন’ মুসার স্ত্রী উম্মে সরাবন তহুরা রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বলেন, সোয়া ১০টার দিকে মুসা তাকে জানিয়েছেন, হেলিকপ্টার একবার রওনা হলেও খারাপ আবহাওয়ার কারণে ফিরে যায়।
মুসার বোন নূর আয়েশা ফেইসবুকে জানান, হেলিকপ্টারের ব্যবস’া করা হয়েছিল, ভোরে আবহাওয়াও কিছু সময়ের জন্য ভালো ছিল। কিন’ পাপুয়ার তিমিকা বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ওড়ার অনুমতি দিতেই চার ঘণ্টা সময় লাগিয়ে দেয়। এর মধ্যে ওই এলাকা নতুন করে মেঘে ঢেকে যাওয়ায় হেলিকপ্টার ফিরে যায়।
বেলা সাড়ে ১২টার দিকে এক বার্তায় একই কথা জানান মুসা। আর বিকাল ৫টা ২২ মিনিটে সত্যরূপের সর্বশেষ যে বার্তাটি স্যাটেলাইট কমিউনিকেটরের রেকর্ডে এসেছে, সেখানেও তাদের অবস’ান দেখানো হয়েছে একই যায়গায়। পাপুয়ায় তখন রাত ৮টা ২২।
নর্থ আলপাইন ক্লাবের সদস্য রাফা উদ্দিন জানান, দুপুরে সর্বশেষ যোগাযোগে মুসা তাকে জানিয়েছেন, ক্যাম্পে আগের যে খাবার তারা খুঁজে পেয়েছেন, তাতে রাতটা চলে যাবে।
রাতে আর হেলিকপ্টার পাঠানোর সুযোগ না থাকায় রোববার আর মুসাদের উদ্ধারের কোনো সম্ভাবনা নেই বলে জানান তিনি।
নূর আয়েশা জানিয়েছেন, মুসাদের লোকাল গাইড ফ্র্যাঙ্কি কোওয়াস ইন্দোনেশিয়ায় বাংলাদেশের হাই কমিশনারকে উদ্ধারের বিষয়ে আশ্বাস্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, ওই বেইজ ক্যাম্পের কাছে আরও একটি অভিযাত্রী দল আটকে আছে; সুতরাং মুসারা একা নয়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে সোমবার সকালে আবারও এই অভিযাত্রী দলকে উদ্ধারের চেষ্টা করা হবে বলে জানিয়েছেন আয়েশা।
২০১০ সালের ২৩ মে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এভারেস্ট জয় করেন মুসা ইব্রাহিম। এবার তিনি যে চূড়ায় অভিযানে গেছেন, সেই কারস্টেনজ পিরামিডে ২০১৫ সালের নভেম্বরে লাল-সবুজ পতাকা উড়িয়ে সেভেন সামিট পূর্ণ করেন এভারেস্টজয়ী দ্বিতীয় বাংলাদেশি নারী ওয়াসফিয়া নাজরীন।