খাগড়াছড়িতে বিএনপি’র ভরসা ওয়াদুদ জাতীয় পার্টি ও আঞ্চলিক দলগুলোও তৎপর

নিজস্ব প্রতিবেদক, খাগড়াছড়ি
Screenshot_1

বাংলাদেশের যে কটি জেলায় দশম জাতীয় সংসদের নির্বাচনের আগে ও পরে সাংগঠনিক কাঠামো সুদৃঢ় এবং দলীয় কর্মসূচিতে এগিয়ে রয়েছে; এর মধ্যে খাগড়াছড়ি বিএনপি অন্যতম। এ জেলার পুনর্বাসিত বাঙালিদের মধ্যে দলটির সমর্থন অধিক। তাছাড়া পাহাড়িদের নেতৃস’ানীয় অনেকে বিএনপি ঘরানার রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। খাগড়াছড়ির বিএনপি রাজনীতিতে সবসময়ই প্রভাবশালী ভূমিকাতেই ‘ভূঁইয়া’ পরিবার। এ পরিবারের ওয়াদুদ ভূইয়ার হাত ধরেই ১৯৯১ সাল থেকে খাগড়াছড়িতে বিএনপি রাজনীতির ধারা সূচিত হয়। সেই থেকে টানা তিনবার ওয়াদুদ ভূঁইয়া বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে বিএনপি-জামাত জোটের শাসনামলে তিনি ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড’-এর চেয়ারম্যান মনোনীত হয়ে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। এসময় তাঁর সাঙ্গপাঙ্গদের ধারাবাহিক সন্ত্রাস-টেণ্ডারবাজি-হামলা-মামলায় অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে জেলাবাসী। প্রাণভয়ে এলাকাছাড়া হন আওয়ামী লীগের কয়েক হাজার নেতাকর্মী। প্রাণ হারান অনেকে। এক পর্যায়ে তাঁর সাথে মতের অমিল হওয়ায় নিজ দলের বড় একটি অংশের ওপরও নেমে আসে হামলা-মামলা। এলাকাছাড়া হন বিএনপির অনেক নেতাকর্মীও।
‘ওয়ান-ইলেভেন’-এর সময়কালে তিনি প্রথমে আটক হন। পরে দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে বেশ কয়েক বছর জেল খাটেন। ফলে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের মনোয়ন পান চেয়ারপারসনের ঘনিষ্ঠ পাহাড়ি নেতা সমীরণ দেওয়ান। তিনি ১৯৮৯ সালে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে ১৯৯১ সালের দিকে বিএনপিতে যোগ দেন । কিন’ সে নির্বাচনে ওয়াদুদ ভূইয়ার নেপথ্য কলকাঠিতে বিএনপি’র ভরাডুবি ঘটে।
সেই থেকে ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত জেলা বিএনপি’র পৃথক কার্যক্রম দেখা গেলেও ওয়াদুদ ভূইয়ার প্রভাব কমেনি। বরং এক পর্যায়ে সমীরণ দেওয়ান পিছু হটেন।
জেলা বিএনপিতে এখন ওয়াদুদ ভূইয়ারই একচ্ছত্র প্রভাব। তাঁর অনুসারীরাই সকল কর্মকাণ্ডে সক্রিয়। আর সমীরণ দেওয়ান কেন্দ্রের নির্বাহী সদস্য পদে থাকলেও জেলার কর্মসূচিতে তাঁর উপসি’তি নেই বললেই চলে। তবু ‘পাহাড়ি-বাঙালি’ সাধারণ মানুষের কাছে ক্লিই ইমেজের মানুষ হিসেবে তাঁর ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। ফলে কোনো কারণে ওয়াদুদ ভূঁইয়ার মনোনয়ন ফসকে গেলে সমীরণের কপাল খুলতে পারে বলে কানাঘুষা চলছে। আগামী নির্বাচনে ওয়াদুদ ভূঁইয়ার ভাতিজা রামগড় উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শহীদুল ইসলাম ফরহাদের নামও আলোচনায় রয়েছে।
জেলা বিএনপি’র সভাপতি ওয়াদুদ ভূঁইয়া বলেন, বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে আমরাও নির্বাচনে যাবো। সেক্ষেত্রে কোনো প্রকার আইনি জটিলতা দেখা দিলে সে সময়েই করণীয় নির্ধারণ করা হবে। আর যদি দলের চেয়ারপারসন এবং দলের সিদ্ধান্তে অন্য কেউ মনোনয়ন পায় তাঁর পক্ষেই কাজ করব।
তিনি খাগড়াছড়িতে সরকারি দলের নিপীড়ন-অত্যাচার প্রসঙ্গে বলেন, হামলা-মামলা আর সভা-সমাবেশে পুলিশি বাধা অব্যাহত আছে। জেলার কয়েক হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে দুই শতাধিক মামলা চলমান রয়েছে।
সমীরণ দেওয়ান সম্পর্কে বলেন, তিনি মাঠে-ময়দানে কোথাও নেই। এমনকি দলীয় কার্যালয়েও আসেন না। সমীরণ বলেন, চেয়ারপারসনের সদিচ্ছায় অতীতেও দলের জন্য কাজ করেছি। এবারও মনোনয়ন চাইবো।
জাতীয় পার্টি : এরশাদ শাসনামলে ১৯৮৯ সালে খাগড়াছড়িতে ডজনে ডজন নেতা সৃষ্টি হয় বিতর্কিত ‘স’ানীয় সরকার পরিষদ’ (বর্তমান পার্বত্য জেলা পরিষদ) নির্বাচনের মাধ্যমে। নব্বইয়ে এরশাদ পতনের পর পর সবাই রাতারাতি হয়ে ওঠেন আওয়ামী লীগ-বিএনপি’র নেতা। ১৯৮৬ ও ৮৮ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টি থেকে দুইবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য একেএম আলিম উল্লাহ অনেকদিন ধরেই জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা। ২০১৪ সালের নির্বাচনে প্রেসিডিয়াম সদস্য ও চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি সোলায়মান আলম শেঠ মনোনয়ন পান খাগড়াছড়ি আসনে। পাল্টে যেতে জাতীয় পার্টির তৎপরতা। অতীতের চয়ে সাধারণ পাহাড়ি-বাঙালিদের কাছে জাতীয় পার্টি এখন অনেক বেশি জনপ্রিয়। ফলে আগামী নির্বাচনেও সোলায়মান আলম শেঠই দলের মনোনয়ন পাবেন বলে মনে করছেন সাধারণ নেতাকর্মীরা। শেঠ বলেন, যে জেলা পরিষদের ওপর ভিত্তি করে ‘পার্বত্য চুক্তি’ হয়েছে, সেই পরিষদ সৃষ্টি করেছেন পল্লীবন্ধু এরশাদ। এরশাদের শাসনামলেই পাহাড়ে বিদ্যুৎ, সড়ক, উপজেলা পরিষদ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারিকরণসহ ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। তাই আগামী নির্বাচনে এসব বিষয়কে সামনে রেখেই মেনিফেস্টো প্রণয়নের কাজ চলছে।
ইউপিডিএফসহ অন্যান্য আঞ্চলিক দল :
১৯৯১ এবং ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে এই আসনের পাহাড়িরা আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করলেও ‘শান্তিচুক্তি’ ইস্যুতে ২০০১ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয় ছিনিয়ে নেন বিএনপি’র প্রার্থী ওয়াদুদ ভূইয়া। সেই নির্বাচনে মাত্র তিন বছর বয়সী আঞ্চলিক দল ‘ইউপিডিএফ’র ব্যানারে প্রথমবারের মতো নির্বাচনে ৩২ হাজারেরও বেশি ভোট পেয়ে তাক লাগিয়ে দেন দলটির প্রতিষ্ঠাতা প্রধান প্রসিত বিকাশ খীসা। নবম এবং দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের বিপরীতে এ দলের প্রার্থী প্রসিত বিকাশ খীসা ও উজ্জলস্মৃতি চাকমা পান ষাট হাজারের বেশি ভোট।
ইউপিডিএফ প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ওঠে আসলেও জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) অংশের কর্মকাণ্ডে তৃণমূলে ইউপিডিএফ বেশ অস্বস্তির মধ্যেই আছে। গত নির্বাচনে সন’ লারমা’র নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতি ও ইউপিডিএফ’র গোপন বোঝাপড়ায় একে অপরকে ছাড় দেয়। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটবে না বলে মনে করছেন পাহাড়ি নেতারা।