ক্যারিবীয়দের দ্বিতীয় শিরোপা

মাহবুব মীর গ্ধ

ক্রিকেট গৌরবময় অনিশ্চিয়তার খেলা। গতকাল কলকাতার ইডেন গার্ডেনের ফাইনালে এ কথার যথার্থতাই আবারো প্রমাণিত হলো। দ্বিতীয় শিরোপা জিততে শেষ ওভারে ১৯ রান দরকার ছিলো ওয়েস্ট ইন্ডিজের। স্ট্রাইকে তখন কার্লোস ব্রাফেট। ওয়েস্ট ইন্ডিজের জার্সি গায়ে কয়েক ম্যাচ খেলে ফেললেও ব্রাফেট এখনো নতুন মুখই। বল হাতে বেন স্টোকস। তখন ইংল্যান্ডের জয়টা মনে হচ্ছিলো সময়ের ব্যাপার। কিন’ না! বাধ সাধলেন ব্রাফেট। স্টোকসের প্রথম চার বলেই চারটি ছক্কা হাকিয়ে ক্যারিবীয়দের এনে দেন দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টি শিরোপা। ৩৪০.০০ স্ট্রাইকরেটে ব্রাফেট করেছেন ১০ বলে ৩৪ রান। তার মিনিট দুয়েকের ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে ইংলিশদের স্বপ্ন। ম্যাচ শেষে তাই অনেকের প্রশ্ন কে এই ব্রাফেট!
চতুর্থ ছক্কাটির সাথে সাথে ইডেন গার্ডেনে শুরু হয়ে গেছে উদ্দাম ক্যারিবীয় নৃত্য। আর ইংল্যান্ড শিবিরে তখন শ্মশানের নিরবতা। ব্র্যাফেটের আগের কাজটা কিন’ করেছেন সেই মারলন স্যামুয়েলসই। ২০১২ বিশ্বকাপের ফাইনালের মতো এবারো খেলেছেন অপরাজিত ৮৫ রানের এক অতিমানবীয় ইনিংস। ম্যাচ সেরার পুরস্কারটা তাই স্যামুয়েলসের হাতেই উঠেছে।
বছরটাই যেনো ক্যারিবিয়দের। মাস দুয়েক আগেই বাংলাদেশ থেকে অনুর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের শিরোপা নিয়ে গেয়ে উইন্ডিজ যুবারা। আর গতকাল শিরোপা জিতলো ওয়েস্ট ইন্ডিজের মেয়ে ও ছেলে উভয় দলই। দুই মাসের মধ্যেই তিন শিরোপা ঘরে তুলেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
ব্যাট হাতে কিছু না করতে পারলেও গতকাল একটা রেকর্ডই করে ফেললেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলপতি ড্যারেন স্যামি। প্রথম অধিনায়ক হিসেবে দু-দুবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতেছেন এই সেন্ট লুসিয়ান। তার জন্মের মাস পাঁচেক আগেই অস্তনমিত হয়ে গিয়েছিল ক্যারিবীয় সূর্য। সেই স্যামির হাতেই ক্রিকেটে আবারো শুরু হলো উইন্ডিজ অধ্যায়। হোক না সেটা টি-টোয়েন্টিতে।
কলকাতার ইডেন
গার্ডেনে টসে জিতেই ইংল্যান্ডকে ব্যাটিংয়ের আমন্ত্রণ জানান। উদ্দেশ্যে পরিস্কার – কম রানে ইংলিশদের বেঁেধ ফেলা। আর জন্যই প্রথম ওভারেই বল হাতে তুলে দেন তার আক্রমণ ভাণ্ডারের সেরা অস্ত্র স্যামুয়েল বাদ্রির হাতে। অধিনায়কের আস্তার প্রতিদান দিতেও বেশি সময় নেননি বাদ্রি। দ্বিতীয় বলেই লেগ স্ট্যাম্প উপড়ে দেন ইংলিশদের অন্যতম ভরসা জেসন রয়ের। দ্বিতীয় ওভারে ফিরেন অ্যালেক্স হেলসও। এবারো দৃশ্যপটে বাদ্রি। তবে এবার বোলারের ভূমিকায় নয়, আন্দ্রে রাসেলের বলে ফাইন লেগে ক্যাচ নিয়েছেন তিনি। পঞ্চম ওভারে আবারো আক্রমণে আসেন বাদ্রি। এসে ফেরান ইংলিশ অধিনায়ক এউইন মরগানকে। ২৩ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে তখন কাঁপছে ইংল্যান্ড। এরপরই রুট ও বাটলারের ব্যাটে প্রতিরোধ। যদিও এটাকে প্রতিরোধ না বলে পাল্টা আক্রমণ বলাই শ্রেয়। চতুর্থ উইকেটে দুজনের ৬১ রানের জুটিই ইংল্যান্ডকে ম্যাচে ফিরিয়ে আনে। বিপজ্জনক বাটলারকে ফেরান কার্লোস ব্রাফেট। ২২ বলে ৩ ছক্কা ও এক চারে বাটলারের অবদান ৩৬ রান। পঞ্চম উইকেটে রুট-স্টোকসের ২৬ রানের জুটিতে যখন মনে হচ্ছিলো বড় স্কোরই গড়তে চলেছে ইংল্যান্ড তখনই নামে ধ্বস। ৪ বলের ব্যবধানে সাজঘরে ফিরে যান বেন স্টোকস, মঈন আলী ও জো রুট। শুরুটা হয়েছিল বেন স্টোকসকে দিয়ে। ডোয়াইন ব্রাভোর স্লো বাউন্সার বুঝতে না পেরে সিমন্সের হাতে ক্যাচ তুলে দেন তিনি। এক বল পর উইকেটরক্ষক রামদিনকে ক্যাচ দেন মঈন আলী। রানের খাতাই খুলতে পারেননি এই অলরাউন্ডার। পরের ওভারেই প্রথম বলেই ফাইন লেগে ক্যাচ দেন ইংল্যান্ডের ভরসা জো রুট। আউট হওয়ার আগে ৩৬ বলে ৫৪ রানের এক অনবদ্য ইনিংস উপহার দিয়েছেন এই বিস্ময়বালক। শেষদিকে ডেভিড উইলি ও ক্রিস জর্ডানের ব্যাটে দেড়শ’ পার করে ইংল্যান্ড। বল হাতে দুর্দান্ত ছিলেন অলরাউন্ডার কার্লোস ব্রাফেট। ৪ ওভারে ২৩ রানে নিয়েছেন ৩ উইকেট। ডোয়াইন ব্রাভোও নিয়েছেন ৩ উইকেট তবে তিনি ছিলেন যথেষ্ট খরুচে। ক্যারিবীয়দের মধ্যে সবচেয়ে মিতব্যয়ী ছিলেন টি-টোয়েন্টি র্যাঙ্কিংয়ের সেরা বোলার স্যামুয়েল বাদ্রি। ৪ ওভারে ১ মেডনেসহ ১৬ রানে নিয়েছেন ২টি উইকেট। আন্দ্রে রাসেলের ঝুলিতে গেছে একটি উইকেট।
ফাইনালে রান তাড়া করে জেতা সহজ নয়। লক্ষ্যটা ১৫৬ হলেও উইন্ডিজের জন্য কাজটা সহজ হবেনা সেটা অনুমেয়ই ছিল। ডেভিড উইলির প্রথম ওভার থেকে আসে মাত্র ১রান। দ্বিতীয় ওভারে মরগান বল তুলে দেন জো রুটের হাতে। রুটের প্রথম বলেই আকাশে তুলে দেন জনসন চালর্স। স্টোকসের অসাধারণ ক্যাচে সাজঘরে চালর্স। পরের বলেই গেইলের চার। এরপরই আসে বড় ধাক্কাটা। রুটকে ছক্কা হাকাতে বাউন্ডারিতে স্টোকসের তালুবন্দি গেইল। ইংলিশ শিবিরে তখন বাঁধভাঙ্গা উল্লাস। খানিকবাদে বিদায় নেন লেন্ডল সিমন্সও। ডেভিড উইলির বলে গোল্ডেন ডাক মারেন সেমিফাইনালে ভারত-বধের নায়ক। ১১ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে ধুঁকতে থাকা উইন্ডিজকে টেনে তুলেন মারলন স্যামুয়েলস। চতুর্থ উইকেটে ৭৫ রান যোগ করেন দুজন। এরপর ব্রাভো, রাসেল ও স্যামি ফিরে গেলেও দলকে জিতিয়েই মাঠ ছাড়েন স্যামুয়েলস-ব্রাফেট। টুর্নামেন্টসেরা হন বিরাট কোহলি।

আপনার মন্তব্য লিখুন