ফিরে দেখা থাইল্যান্ড

কো সামুইয়ের আকর্ষণে

রিজওয়ানুল ইসলাম
itled-1-copy

সুইজারল্যান্ডের তিচিনোক্যান্টনের অন্যতম প্রধান শহর লোকার্নো। লাগো মাজজিওরের উত্তর পাড়ে মনোরম এই শহর। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এখানে শীতের তীব্রতা থাকে কম, রোদ থাকে বছরের অনেকটা সময়। লেক থেকে আসা হাওয়া আর পাম গাছের সারি শহরটিকে কিছুটা ভূমধ্যসাগরীয় আবহ দেয়।
শুধু সুইজারল্যান্ডে নয়,আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও লোকার্নোর পরিচিতি রয়েছে। তার প্রধান কারণ বোধ হয় সেখানে অনুষ্ঠিত হওয়া বার্ষিক চলচ্চিত্র উৎসব। প্রতি বছর আগস্ট মাসের প্রথমার্ধে দশ দিন ধরে চলে এই উৎসব। সারা বিশ্বের নামকরা সব প্রযোজক-পরিচালকরা তাঁদের ছবি নিয়ে আসেন এই উৎসবে। সাথে আসেন চলচ্চিত্রের সাথে জড়িত খ্যাতিমান সব লোক। আর দর্শক তো অবশ্যই। প্রায় আট হাজারের মত দর্শকের সমাগম ঘটে এই উৎসবে।এ বছর (২০১৭)এর সত্তর বছর পূর্ণ হলো। বাংলাদেশও সেখানে অংশ গ্রহণ করে; আর এ বছর তো একাধিক পুরস্কার এনেছেন আমাদের তরুণ চিত্র পরিচালকগণ।
কান চলচ্চিত্র উৎসবের মত লোকার্নোর উৎসব কোনো হলের ভেতর অনুষ্ঠিত হয় না। খোলা আকাশের নিচে এক বিরাট চত্বরে বড় বড় পর্দা টাঙিয়ে দেখানো হয় উৎসবে আসা সব ছবি। আর দর্শকেরা চত্বরে বসেই দেখেন সেগুলো। সেই চত্বরের নাম পিয়াৎজা গ্রন্দে। লেকের পাড় থেকে লোকার্নোর পুরনো শহরের দিকে হাঁটতে থাকলে তার প্রবেশ পথেই এই পিয়াৎজা।
লোকার্নোতে আমাদের মূল আকর্ষণ ছিল পিয়াৎজা গ্রন্দে আর পুরানো শহর। ইউরোপের পুরানো শহরগুলোর একটা বিশেষ আবহ রয়েছে। অনেক জায়গায় দেখা যায় পাথরে বাঁধানো সরু রাস্তা আর রাস্তার একেবারে ধার ঘেঁষে উঠে যাওয়া দালানকোঠা, যেগুলো স্থাপত্যের দিক থেকে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। এই ধরনের শহর দেখতে আমার কোনো ক্লান্তি নেই। আর তার ওপর ছিল চলচ্চিত্র উৎসবের জায়গাটি দেখা।
লুগানো থেকে লোকার্নোর দুরত্ব বেশি নয়; ট্রেনে গেলে সওয়া ঘণ্টার মত লাগে। লুগানো থেকে প্রতি ঘণ্টায় ট্রেন যায় তিচিনো ক্যান্টনের রাজধানী বেলিনজোনা। সে ট্রেনে বেলিনজোনা পৌঁছবার আগেই আসে জিওভিয়াসকো; সেখানে ট্রেন বদল করে ধরতে হয় লোকার্নোর ট্রেন। তবে আমরা যাওয়ার সময় ট্রেন বদলের ব্যাপারটা ভালো করে লক্ষ করিনি। তাছাড়া টিকেট এবং সময়সূচি লেখা ছিল ইতালীয় ভাষায়। কেন জানিনা, আমরা ধরে নিয়েছিলাম যে একই ট্রেন বেলিনজোনা হয়ে যাবে লোকার্নো। তাই আমরা বদল না করে ট্রেনেই বসে রইলাম। ভুলটাটের পেতে একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল; আরিট্রেন ততক্ষণে লুগানোর দিকে ফেরৎ যাচ্ছে। তাই পুরো ব্যপারটায় আমাদের দু’ঘণ্টা সময় নষ্ট হয়ে গেল।
বৃষ্টি শেষ হয়ে গিয়েছিল আগের দিন রাতেই; কিন্তু আকাশে চলছিল রোদ আর মেঘের খেলা, আর বাতাসও ছিল বেশ।আমরা অবশ্য তার জন্য প্রস্তুত ছিলাম এবং হালকা শীতবস্ত্র সাথে নিয়েছিলাম। ট্রেন থেকে নেমেই বুঝলাম এটি পর্যটক-বান্ধব শহর। স্টেশনের বাইরেই একটি তথ্য কেন্দ্র, যেখান থেকে পেলাম শহরের ম্যাপ এবং সাথে কিছু মৌখিক নির্দেশনা, পিয়াৎজা গ্রন্দে কতদূর, কোন পথে যেতে হবে সেখানে। যদিও সঠিক রাস্তাটা ধরতে দু’মিনিট সময় লাগলো, আমরা গন্তব্যে পৌঁছে গেলাম বেশ সহজেই।
রাস্তাটাই শেষ হয় এক বিশাল খোলা চত্বরে, যার বাকি তিন পাশে বিভিন্ন ধরনের দালানকোঠা। এক পাশের দালানগুলোর অনেকগুলোরই নিচের তলায় রেস্তোরাঁ বা অন্য ধরনের দোকান। রেস্তোরাঁগুলো প্রায় সবই পিত্‌জারিয়া অথবা বড় ইতালীয় খাবারের জায়গা। আমরা অবাক হলাম না, কারণ লুগানোতেও তাই দেখেছি। আর হবেই বা না কেন! আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে সে জায়গা তো শুধুমাত্র রাজনৈতিকভাবেই সুইজারল্যান্ডে, সাংস্কৃতিকভাবে তা মোটামুটি ইতালির অংশ বলেই মনে হচ্ছিল। দুপুরের খাবারের সময় হয়ে গিয়েছিল। তাছাড়া আমরা ভুল করে দ্বিগুণ ট্রেন যাত্রা করেছি বলে কিছুটা ক্লান্তও ছিলাম। সুতরাং আমরা লাঞ্চ সেরে নেবার সিদ্ধান্ত নিলাম।
ইউরোপের শহরগুলোতে বসন্ত আসবার সাথে সাথেই রেস্তোরাঁগুলো তাদের সামনের ফুটপাথ বা চত্বরে টেবিল চেয়ার পেতে দেয়, এবং সে ব্যবস্থা চলে বসন্ত,গ্রীষ্ম, এবং শরৎকাল জুড়ে। এখানেও তার ব্যতিক্রম ছিল না। কোনো কোনো জায়গায় ঠান্ডা থেকে খদ্দেরদের বাঁচাবার জন্য বাইরেই হিটিং-এর ব্যবস্থা থাকে। কোথাও কোথাও হালকা কম্বলও রাখতে দেখেছি। তবে সেদিন পিয়াৎজা গ্রন্দে বাতাস থাকা সত্ত্বেও রোদ ছিল বলে ঠান্ডা তেমন ছিল না।আমরা একটি ছাতার তলায় টেবিলে বসে চত্বরের বিশালতা এবং খাবার দুইই উপভোগ করলাম।
অবশ্য আমরা তখন পর্যন্ত জানি না ঠিক কোন জায়গাটিতে চলচ্চিত্র উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। সে ব্যাপারে আমাদের ওয়েটার গাইডের কাজ করলেন। ভারতীয় চেহারার এক লোক তিনি; ইংরেজি বলেন ভালো। তিনি জানালেন যে আমরা যেখানে বসে আছি তার উল্টো দিকেই স্থাপন করা হয় মঞ্চ, আর লাগানো হয় বিশালাকৃতির সব পর্দা ু যেগুলোতে সিনেমা দেখানো হয়। আর এই চত্বরেই বসে যায় হাজার হাজার দর্শক। খাওয়া সেরে আমরা হেঁটে বেড়ালাম পিয়াৎজার এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত। তার বিভিন্ন দিক থেকে সরু সরু রাস্তা চলে গিয়েছে পুরানো শহরের ভেতরে। যে কোনো একটি ধরে হাঁটতে থাকলেই চলে যাওয়া যায় সেদিকে। তবে হেঁটে সে জায়গা দেখতে গেলে সময় লাগবে অনেক। তাছাড়া ইতালীয় রেস্তোরাঁতে খাওয়া ভালোই হয়েছিল বলে আমরা কেউই বেশি হাঁটার পক্ষে ছিলাম না। তাহলে কীভাবে দেখা যায় পুরানো শহর! চিন্তা নেই; আমাদের মত লোকের জন্য সেখানেও রয়েছে মিনি ট্রেন।
লেকের পাড়ে একটি জায়গায় ঘাট, যেখান থেকে জাহাজ যায় লেকে ভ্রমণের জন্য। লাগো লুগানোর মত লাগো মাজজিওরেতেও রয়েছে নৌকা ভ্রমণের বিভিন্ন রুট। তবে আমাদের সময় ছিল না আবার একটি নৌকা ভ্রমণের। তাছাড়া আমরা পুরানো শহর দেখতে বেশি উৎসাহী। বন্দরের সামনের রাস্তাতেই পেয়ে গেলাম মিনি ট্রেন, যা লেকের পাড়ে এক চক্কর দিয়ে যাত্রীদেরকে নিয়ে যায় পুরানো শহরের ভেতরে। আমাদের জন্য সেটা আদর্শ; সুতরাং আমরা চড়ে বসলাম তাতে।
মজার ব্যাপার, সেই মিনি ট্রেনের দ্বিতীয় স্টপই ছিল পিয়াৎজা গ্রন্দে, যা আমরা ইতিমধ্যেই দেখে এসেছি। তবে ভালই লাগলো আর একবার সুন্দর জায়গাটা দেখতে। ট্রেন সেখান থেকে পাশের একটা রাস্তা ধরে দু’পাশে শহরের দোকান পাট রেখে যেতে থাকলো, এবং কিছুদুর গিয়ে বাঁক নিয়ে ঢুকে পড়ল পুরানো শহরে। যেমন ভেবেছিলাম ঠিক তেমনি, পাথরে বাঁধানো সরু সরু সব রাস্তা -যাতে কোনো গাড়ি নেই, আর দু’পাশের দালানগুলো প্রাচীন স্থাপত্যের নির্দেশক। কয়েকটা রাস্তা ঘুরেই ট্রেন পৌঁছে গেল একটি ছোট্ট চত্বরে, যার একপাশে সপ্তদশ শতকের একটি গির্জা, কলেজিয়াটা সেন্টঅ্যান্টোনিও। সেখানে থেমে গির্জাটির ভেতরে একটু সময় কাটাতে পারলে ভালো লাগত, কারণ ইন্টারনেটে ছবিতে দেখেছিলাম, এর ভেতরটা দারুণ সুন্দর। দেয়াল এবং ছাদের কারুকাজ আর রঙিন দেয়ালচিত্র এই গির্জাটিকে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছে। চারশ’ বছরেরও বেশি পুরানো এরকম একটি স্থাপনা যে কোনো সমাজের জন্যই গর্বের বিষয় হতে পারে।
মিনি ট্রেনের রুটে শুধু পুরানো শহর নয়, ছিল লাগোমাজজিওরের একপাড়ের বেশ খানিকটা জায়গা। যার ফলে লেকটির সৌন্দর্য বেশ উপভোগ করা গেল। যথাসময়ে ট্রেন আমাদেরকে নামিয়ে দিয়ে গেল সেই ঘাটে যেখান থেকে আমরা শুরু করেছিলাম যাত্রা। ততক্ষণে আমাদের চা-কফি খাবার সময় হয়ে গিয়েছে।বসন্তকালে ইউরোপে ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা এগিয়ে যায়, আর দিনও বড় হয়ে যায় অনেক। সূর্য তখনও অনেক ওপরেই ছিল। কিন্তু আমাদের লুগানো ফেরার ট্রেন ধরতে হবে। সুতরাং অন্য অনেক দেখার জায়গা থাকলেও চা খেতে খেতে আমরা ঘড়ির দিকে তাকালাম। আর নিজেদেরকে মনে করালাম যে এবার আর জীওভিয়াসকোতে ট্রেন বদল করার কথা ভুললে চলবে না।