কোতোয়ালী-বাকলিয়া আসন নিয়ে কৌতূহল

আওয়ামী লীগে আলোচনায় ব্যারিস্টার নওফেল বিএনপিতে ডা. শাহাদাত এবার সংশয়ে জাপার জিয়া উদ্দিন বাবলু

সালাহ উদ্দিন সায়েম

হযরত শাহ আমানতের পুণ্যভূমি চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালী-বাকলিয়া (চট্টগ্রাম-৯) আসনে যে দল জেতে তারাই সরকার গঠন করে। বিষয়টি কাকতালীয় কিংবা যাই হোক, ১৯৯১ সাল থেকে পাঁচটি জাতীয় নির্বাচনে এমনটাই হয়ে আসছে। তাই চট্টগ্রামে এটি বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ আসন হিসেবে স্বীকৃত।
প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনে রাজনীতি সচেতন ব্যক্তিদের নজর থাকে আলোচিত কোতোয়ালী-বাকলিয়া আসনের দিকে। গুরম্নত্বপূর্ণ এই আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি থেকে কে কে প্রার্থী হয় তা নিয়ে কৌতূহল থাকে দুই দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের।
একাদশ সংসদ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকরা তাকিয়ে আছেন এই আসনের দিকে। দুই দলের শেষ পর্যনত্ম কে কে প্রার্থী হচ্ছেন এখানে, তা নিয়ে যত কৌতূহল তাদের। বর্তমানে এই আসনের ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৯১ হাজার ৬১২ জন।
কোতোয়ালী-বাকলিয়া আসনে এবার আওয়ামী লীগ থেকে একাধিক মনোনয়ন প্রত্যাশী থাকলেও দলের মধ্যে জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছে ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের নাম। তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক। সাবেক সিটি মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি প্রয়াত এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর ছেলে তিনি।
বিএনপি থেকেও এই আসনে বেশ কয়েকজন মনোনয়ন প্রত্যাশী রয়েছেন। তবে দলের মধ্যে জোরালো আলোচনায় আছেন নগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন।
কিন’ ব্যারিস্টার নওফেল নৌকা ও ডা. শাহাদাত ধানের শীষের মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু?
২০১৪ সালের একপেশে নির্বাচনে কোতোয়ালী-বাকলিয়া আসনে
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট থেকে মনোনয়ন পান জাতীয় পার্টির নেতা ও সাবেক মন্ত্রী জিয়া উদ্দিন আহমেদ বাবলু।
তখন রাজনৈতিক প্রেড়্গাপটের কারণে নির্বাচনী সমীকরণে আওয়ামী লীগ জোটগতভাবে জাতীয় পার্টিকে চট্টগ্রাম নগরীর গুরম্নত্বপূর্ণ এই আসনটি ছেড়ে দিয়েছিল।
কিন’ এবার সেই রাজনৈতিক প্রেড়্গাপট নেই। তবে এবারও জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের সাথে জোটগতভাবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। যদিও এখনো পর্যনত্ম আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টিকে আসন বণ্টন করে দেয়নি।
আসন ভাগাভাগি না হলেও এবারও কোতোয়ালী-বাকলিয়া আসন নিজেদের পকেটে নিতে চায় জাতীয় পার্টি।
এই আসনে লড়তে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য জিয়া উদ্দিন আহমেদ বাবলু এবারও দলের মনোনয়ন ফরম নিয়েছেন। আওয়ামী লীগ গত জাতীয় নির্বাচনের মতো এবারও জোটগতভাবে আসনটি জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেবে বলে তাঁর বিশ্বাস।
তিনি সুপ্রভাতকে বলেন, ‘এই আসনে মনোনয়নের বিষয়টা আমার ব্যক্তিগত নয়, দলীয়। আওয়ামী লীগ ভাগাভাগিতে আসনটি জাতীয় পার্টিকে দিলে এখানে আমি প্রার্থী হবো। আওয়ামী লীগ গতবার যেহেতু আসনটি আমাদের ছেড়ে দিয়েছে, এবারও জোটগতভাবে এটি আমাদের কাছে থাকবে বলে মনে করছি।’
কিন’ আওয়ামী লীগ এবার আসনটি জাতীয় পার্টি থেকে পুনরম্নদ্ধার করতে চায়।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় দায়িত্বে থাকা চট্টগ্রামের দুই জন গুরম্নত্বপূর্ণ নেতার সাথে কথা বলে জানা গেছে, কোতোয়ালী-বাকলিয়া আসনে এবার আওয়ামী লীগের প্রার্থী দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আর জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেওয়ার সম্ভবনা ড়্গীণ। জাতীয় পার্টি যদি বেশি চাপাচাপি করে, তাহলে হয়তো নগরীর অন্য কোনো একটা আসন ছেড়ে দেওয়া হতে পারে।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রে দায়িত্বে থাকা চট্টগ্রামের নেতারা মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মহিউদ্দিন চৌধুরীকে মন্ত্রী করতে চেয়েছিলেন। কিন’ তিনি সে প্রসত্মাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। মহিউদ্দিন চৌধুরী নওফেলকে প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দিয়ে যান। নওফেল অত্যনত্ম দড়্গতার সাথে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর আস’া অর্জন করেছেন। প্রধানমন্ত্রী হয়তো মহিউদ্দিন চৌধুরীর অপূর্ণতা ঘোচাতে তাঁর ছেলে নওফেলকে কোতোয়ালী আসনে মনোনয়ন দিতে পারেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল সুপ্রভাতকে বলেন, ‘কোতোয়ালী-বাকলিয়া আসনে দলীয় নেতাকর্মীরা এবার নৌকার প্রার্থী চায়। সেটা আমিও হতে পারি কিংবা অন্য কেউ। তবে নেত্রী দলীয় কিংবা জোটের যাকেই মনোনয়ন দেবেন সেটা দলীয় নেতাকর্মীরা মেনে নেবে।’
কোতোয়ালী-বাকলিয়া আসনে আওয়ামী লীগের জোটের সমীকরণ থাকলেও বিএনপিতে তা নেই।
এই আসনে নগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেনের দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আছেন শিল্পপতি শামসুল আলম। চট্টগ্রামের খ্যাতনামা শিল্প প্রতিষ্ঠান মেসার্স ইলিয়াছ ব্রাদার্সের (দাদা গ্রম্নপ) ব্যবস’াপনা পরিচালক তিনি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে এই আসনে বিএনপি থেকে প্রার্থী ছিলেন শামসুল আলম। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য।
দলীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, সাংগঠনিক কর্মকা- ও দলের আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রাখার বিবেচনায় বিএনপির কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারকদের কাছে শামসুল আলমের চেয়ে ডা. শাহাদাত হোসেনের গ্রহণযোগ্যতা বেশি। দলের আন্দোলন-সংগ্রামে নিস্ক্রিয় থাকা শামসুল আলমের ভূমিকা বিএনপির কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারকদের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ।
গত ৭ নভেম্বর ঢাকা সিএমএম কোর্টে কারাবন্দি নেতাকর্মীদের সাথে সাড়্গাৎ করতে গিয়ে গ্রেফতার হন ডা. শাহাদাত। তিনি এখনো কারাবন্দি।
গ্রেফতার হওয়ার আগে ডা. শাহাদাত কোতোয়ালী-বাকলিয়া আসনে মনোনয়নের ব্যাপারে সুপ্রভাতকে বলেছিলেন, ‘দলের আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা বিবেচনায় প্রার্থী হিসেবে আমার অগ্রাধিকার থাকবে। অন্য যারা মনোনয়ন প্রত্যাশী রয়েছেন, দলের আন্দোলন-সংগ্রামেতারা কতটুকু ভূমিকা রেখেছেন, হাইকমান্ড তা বিবেচনা করে প্রার্থী চূড়ানত্ম করবেন।’
নির্বাচনের আগমুহূর্তে গ্রেফতার হওয়াতে ডা. শাহাদাতের ভাগ্য খুলে যেতে পারে বলে মনে করছেন নগর বিএনপি নেতারা।
নগর বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, ডা. শাহাদাত ২০০৮ সালে মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পর থেকে সংগঠনের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। দলের আন্দোলন-সংগ্রামে মামলা মাথায় নিয়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন’ শামসুল আলম আন্দোলন-সংগ্রামে আত্মগোপনে ছিলেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শামসুল আলম সুপ্রভাতকে বলেন, ‘শাহাদাত যেহেতু নেতৃত্বে আছেন স্বাভাবিকভাবে আমার চেয়ে দলের আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি ভূমিকা বেশি রাখবেন। আমি তো এখন নগরের দায়িত্বে নেই, কেন্দ্রে আছি। আর নগর বিএনপির আগের কমিটি যেভাবে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিল, বর্তমান কমিটি ততটা নেই।’
এ আসনে ১৯৯১-২০১৪ সাল পর্যনত্ম পাঁচটি জাতীয় নির্বাচনের চিত্র
১৯৯১ সালে এই আসনে নগর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি প্রয়াত এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে হারিয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন বিএনপি প্রার্থী আবদুলস্নাহ আল নোমান। সরকার গঠন করে বিএনপি।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনে এই আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী (প্রয়াত এম এ মান্নান) জয়লাভ করলে সরকারও গঠন করে দলটি। এম এ মান্নানের কাছে হেরে যান বিএনপি প্রার্থী আবদুলস্নাহ আল নোমান।
কিন’ ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী আবদুলস্নাহ আল নোমানের কাছে হেরে যান আওয়ামী লীগ প্রার্থী এম এ মান্নান (প্রয়াত)। ড়্গমতাও হারায় আওয়ামী লীগ।
২০০৮ সালের নির্বাচনে এই আসনে বিএনপি প্রার্থী শামসুল আলমকে হারিয়ে বিজয়ী হন আওয়ামী লীগ প্রার্থী নুরম্নল ইসলাম বিএসসি। ড়্গমতায়ও আসে আওয়ামী লীগ।

সর্বশেষ ২০১৪ সালের একপেশে নির্বাচনে এই আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট প্রার্থী জাতীয় পার্টি নেতা জিয়া উদ্দিন আহমেদ বাবলু। তখন মহাজোট সরকার গঠন করে।