কোটাবিরোধী আন্দোলন সফল হবে

রাজু আহমেদ

দেশে আজও ৫৬ শতাংশ কোটা বহাল রয়েছে; সাম্যের ভালে এ করুণ উপহাস বটে। যে কারণে শুধু মেধাবীরা তাদের ন্যায্য অধিকার বঞ্চিত হচ্ছে না বরং রাষ্ট্র বৃহৎ পরিসরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে যোগ্যদের সেবা প্রাপ্তি থেকে। তাইতো কোটার বিরুদ্ধে আন্দোলন চাকরিতে কোটা প্রথা চালুর দিন থেকে নিরবে-নিভৃতে চলছে। ধীরে ধীরে এ আন্দোলন সুসংগঠিত হয়ে ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাত্রা পেয়ে বর্তমান অবস’ায় পৌঁছেছে। রাষ্ট্রের নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েও কোটা সংস্কারের দাবিতে যারা আন্দোলনরত, তারা দমে যায়নি। গ্রেফতার, হয়রানি, লাঠিচার্জ কিংবা কাঁদানে গ্যাস শিক্ষার্থীদেরকে ন্যায্য দাবির পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। ইতিহাস সাক্ষী, অন্তত বাংলাদেশের পূর্বাপর ইতিহাসে ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে এমন নজির বিরল।
আশার কথা, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ করেছে দেশপ্রেমিক সম্প্রদায়। আমরা আশা করি, রাষ্ট্র বিষয়টির গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা অনুধাবন করে অচিরেই কোটা সংস্কারের যৌক্তিক দাবি সুবিবেচনা করত বঙ্গবন্ধুর বৈষম্যহীন স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশকে মেধার পুষ্প-পল্লবে পরিস্ফুটিত করার যাত্রায় সঙ্গী হবেন।
স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৭ বছর পরে কোটা সংস্কারের দাবি জোরালো হওয়ার যৌক্তিক কারণ, মেধাবী বেকারের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। সাম্প্রতিক তথ্যমতে, দেশে বেকারের সংখ্যা কোটির সংখ্যা ছাড়িয়ে। এমন কোন চাকরির পরীক্ষা দেশে অনুষ্ঠিত হয়না যেখানে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা লাখের নিচে। কাজেই লাখ লাখ চাকরি প্রার্থীর স্বপ্ন যখন কোটার ফাঁদে আটকে যায় তখন বিষ্ফোরণ অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়ায়। রাষ্ট্র যদি সমাধানের পথে না হাঁটে তবে দিনে দিনে এ আন্দোলন দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। শিক্ষার্থীরা কখনো দাবি আদায়ের প্রশ্নে সংহিসতার পথে হাঁটে না তবে অতীত ইতিহাস কখনো কখনো তেমন পথে হাঁটাতেও বাধ্য করেছে।
শিক্ষার্থীরা শিক্ষাঙ্গনের পাঠকেন্দ্রিক তাদের রুটিন সাজায়, চাকরি প্রার্থীরা তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী রাষ্ট্রের সেবা করার স্বপ্ব বাস্তবায়নের মাধ্যমে সমাজে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার স্বপ্ন দেখে। অথচ সেথায় অযৌক্তিক কোটা যে প্রতিবন্ধকতার বাঁধ উঠিয়েছে তাতে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত হচ্ছে এবং কার্যকারণ নিয়ম অনুসৃত হয়ে মানুষের ভোগান্তি দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
বর্তমান আন্দোলনে ছাত্রলীগের ভূমিকা নিন্দনীয় বটে। স’ানীয় পর্যায়ের অনেক ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীর আচরণ ও কথাবার্তায় মনে হচ্ছে তারা কোটাবিরোধী আন্দোলনের সমর্থন করে কিন’ উপরের নির্দেশনার অভাব কিংবা বারণ পালনে তারা কোটাবিরোধী আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের কাতারবদ্ধ হতে পারছে না। এই উপরমহল যে কত উপরে তার নাগাল পাওয়া মুশকিল।
গণমাধ্যমের ভূমিকায় আমরা কিছুটা হতাশ। কোটা বিরোধী আন্দোলনের সংবাদ প্রচার ও এ বিষয়ে জনমত গঠনে গণমাধ্যম কেন যেন কিছুটা কার্পণ্যের দৃষ্টান্ত স’াপনের পথে হাঁটছে। অন্যান্য সংবাদের মত দায়সারাভাবে কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীদের কিছু চিত্র প্রকাশ করেই যেন তারা দায়িত্ব থেকে মুক্তি পেতে চায়। গণমাধ্যম বিশেষ করে সংবাদপত্রের কাছে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা বিশাল। শিক্ষার্থীদের সকল আন্দোলনে সংবাদপত্র সহযাত্রীর ভূমিকা নিয়েছে। আমরা আশা করি, সংবাদপত্রগুলো কোটাবিরোধী আন্দোলনে মুখপাত্রের ভূমিকা পালন করবে। জনমত গঠন, কোটাবিরোধিতার ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের ইতিবাচক চিন্তা ও লেখা প্রকাশের আহ্বান সম্পাদক সমীপে থাকলো। চিরাচরিত নিয়মে সংবাদপত্র সত্যের সাথে ছিল এবং ভবিষ্যতেও তাদের এ যাত্রা অব্যাহত থাকবে বলে বিশ্বাস করি।
শিরোনামে বলেছি, কোটা বিরোধী আন্দোলন সফল হতে বাধ্য। এভাবে বলার শক্তি পেলাম কোথায়? শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের অতীত ইতিহাসের সাফল্যগাঁথার এ আন্দোলনের সাফল্য সম্পর্কে আগাম বলতে প্রেরণা দিয়েছে। রাষ্ট্রের সামনে সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থীরা একবারও দাবি করেনি, কোটা প্রথা বাতিল করতে হবে। শুধু দাবি জানিয়েছে, এ প্রথা সংস্কার করতে হবে। বাতিল আর সংস্কারকে যেন গুলিয়ে ফেলা না হয়।
বাংলাদেশের বাস্তবতার প্রেক্ষিতে কিছু ক্ষেত্রে কোটা আরও কিছুকাল বহাল রাখতে হবে। শিক্ষার্থীদের দাবি , কোটা সংস্কার করে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা হোক। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সেটা ১৫-২০ শতাংশ পর্যন্ত বহাল রাখার দাবি এখনও যৌক্তিক।
কিন’ কোটাবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়েছে বলে আগের নীতি ‘কোটাধারী না পাওয়া গেলে মেধাবী থেকে কোটা পূরণ করা হবে’ বাতিল করে নির্দিষ্ট কোটাধারী না পাওয়া গেলে কোটা দিয়ে কোটা পূরণ করার নীতি চালু করা আদৌ কি সমাধানের পথ? আমরা কেন ভুলে যাই, যারা রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারক, তাদের সন্তান-নাতিতুল্যরাই তো কোটা বিরাধী আন্দোলন করছে।
জেদের প্রশ্নে কে কাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে! সব যুগের শিক্ষার্থীরাই সরল কথাগুলো সহজে শুনতে ও মানতে অভ্যস্ত। দমন-পীড়নের ভয়ে এরা দমার নয়-অন্তত ইতিহাস সেকথাই কয়!

লেখক : কলামিস্ট