কেনাকাটায় জমজমাট চট্টগ্রামের মার্কেটগুলো

কামরুন নাহার সানজিদা
Eid-Shoping_Mimi-supar-Market-(5)

চট্টগ্রামের বিভিন্ন মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে, দেশীয় ও স্থানীয় ফ্যাশন ডিজাইনারদের তৈরি করা পোশাক ও দেশের বাইরে থেকে আমদানি করা পোশাকের ধরনে রয়েছে বেশ পার্থক্য। মার্কেটে ডিজাইনারদের ফ্যাশন হাউসে বাংলাদেশের আবহাওয়া ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে প্রাধান্য দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ঈদ পোশাক। আর ভারত, চায়না, পাকিস্তান, থাইল্যান্ডসহ বিদেশী পোশাকগুলোতে কেবল ফ্যাশনকে মাথায় রেখেই পোশাক তৈরি করা হয়েছে। তবে ক্রেতারা পোশাক কিনছেন নিজের পছন্দ অনুযায়ী। কিশোর বয়সী ক্রেতারা ভারতীয় ও পাশ্চাত্য ডিজাইনের পোশাকেই বেশ আগ্রহ দেখাচ্ছে। তরুণীরা কিনছেন ভারতীয় বিভিন্ন নাটক ও সিনেমার নামানুকরণে বাজারে আসা পোশাক। তরুণরা পাঞ্জাবী ও বিভিন্ন ব্র্যান্ডের শার্ট-প্যান্ট, টি শার্ট। কেউ কেউ গরমে আবহাওয়া উপযোগী পোশাকই বেছে নিচ্ছেন ঈদে। আর মধ্যবয়সী ও বৃদ্ধরা হালকা ডিজাইনে আরামদায়ক পোশাকটিই বেছে নিচ্ছেন নিজের জন্য।

সানমারে চলছে বাহুবলী-২
নগরীর সানমার ওশ্যান সিটিতে বেশ রমরমাভাবে চলছে বাহুবলী-২। না, এটি ভারতীয় সিনেমা বাহুবলীর পার্ট ২ নয়। ভারত থেকে আমদানি করা একটি পোশাকের নামকরণ করা হয়েছে সিনেমাটির নামানুসারে। নগরীর এই বহুতল বিপণিকেন্দ্রের প্রায় সবকটি পোশাকের দোকানেই দেখা মিললো এই পোশাকের।
স্কার্টের ওপর লম্বা বা মাঝারি সাইজের একটি কামিজ। তাতে দুইটি বা তিনটি লম্বা ঝুল দেয়া কাটা। মটকা সিল্ক বা পেপার সিল্কের কাপড় দিয়ে তৈরি পুরো পোশাক। উপরের কামিজটি পাথর ও সুতা দিয়ে এমব্রয়ডারির কারুকাজ করা। নামে সিল্ক হলেও দুইটি কাপড় দিয়ে আস্তর দেয়ায় বেশ পুরু ও ভারী নতুন ডিজাইনের এই পোশাকটি।
বাহুবলী-২ এর পাশাপাশি অনেকে আবার পোশাকটিকে ‘ভারতীয় লাসা’ও বলছেন। দেখতে গাউনের মতো মনে হলেও গাউন থেকে একে আলাদা করে তুলেছে এর ডিজাইন। ডান দিকে বা মাঝখানে কয়েকটি বোতাম নিচ পর্যন্ত দেয়া, আর ঠিক তার নিচেই লম্বা ঝুল দেওয়া। গাউন একই কাপড়ের একটি সম্পূর্ণ পোশাক হলেও এই পোশাকের নিচের অংশে স্কার্ট ব্যবহার করতে হয়।
ঈদ উপলক্ষেই বাহুবলী-২ বাজারে এসেছে বলে জানালেন বিক্রেতারা। সানমারের ওমেন্স ওয়ার্ল্ড দোকানের স্বত্তাধিকারী আব্দুল মাজেদ বলেন, প্রতিবছরই ঈদুল ফিতরে নিত্য নতুন ডিজাইনের পোশাক বাজারে আসে। এবার নতুন একটি ডিজাইনের নাম দেয়া হয়েছে বাহুবলী-২। এবছর ভারতীয় এই সিনেমাটি বেশ জনপ্রিয় হওয়ায় এই নাম দেয়া। পোশাকের তো নিজস্ব কোনো নাম থাকে না। তবে ক্রেতারা চায়, নতুন পোশাক, নতুন নাম। তাই যখন যার চল, বিক্রেতারাও সেই নামেই পোশাকের নাম দিয়ে দেয়। ক্রেতারাও সেই পোশাকেই বেশি আগ্রহ দেখায়।
সানমারের ক্রেতাদের মধ্যেও পোশাকটি নিয়ে আগ্রহ দেখা গেছে। একই ডিজাইনের পোশাক অন্য দোকানেও থাকায় দামে পার্থক্য হলেই চলে যাচ্ছেন সেখানে। ডিজাইনভেদে বিভিন্ন দোকানে বাহুবলী-২ বা লাসা নামের এই পোশাকটি পাওয়া যাচ্ছে চার থেকে আট হাজার টাকায়। কোনো কোনো দোকানে ১৬ থেকে ১৮ হাজার টাকা পর্যন্ত দামেও এই পোশাক দেখা গেছে।
ঠিক একই রকম আরেকটি পোশাক কোনো কোনো দোকানে দেখা গেছে। একই সিল্কের কাপড়ে স্কার্টের ওপর লম্বা কামিজ দেয়া। বুকের কাছে সামান্য কারুকাজ করা কামিজ উজ্জ্বল রংয়ের। গিরিঙ্গী নামের এই পোশাকটিও ভারতীয়। লাসার দামেই পাওয়া যাচ্ছে পোশাকটি।
মার্কেটজুড়ে যেখানে বাহুবলী-২ এর আধিপত্য, সেখানে অন্যান্য ডিজাইনের পোশাকও পছন্দ করছেন ক্রেতারা। নতুন নতুন ডিজাইনের পোশাকগুলো ডিসপ্লে থেকে মন কাড়ছে ক্রেতাদের। ক্যাপ সিস্টেম নতুন এক ধরনের পোশাক চলছে অন্যান্য মার্কেটের মতো। থ্রি কোয়ার্টার হাতের গাউনের ওপর ওড়নায় পাথর ও সুতার কারুকাজ করে পোশাকের গলার মাপে কেটে বসিয়ে দেয়া হয়েছে। এতে সুবিধা হলো, বারবার ওড়না ঠিক করতে হয় না আবার সেফটি পিন দিয়েও কাপড়ের সাথে আটকাতে হয় না।
থ্রি পিসের ক্রেতাও কম নয়। মার্কেট ঘুরে দেখা গেলো গাউন ও বাহুবলী-২ এর আধিপত্য বেশি হলেও অনেকেই থ্রি পিস কিনছেন। ডিজাইনভেদে সানমার ওশান সিটিতে থ্রি পিস পাওয়া যাচ্ছে ১,৮০০ থেকে শুরু হয়ে চার হাজার টাকার মধ্যে।

আফমি প্লাজায় পাশ্চাত্য পোশাকের বাহার
নগরীর অন্যান্য মার্কেটে দেশীয় ডিজাইনার ও ভারতীয় পোশাকের রমরমা বাজার হলেও আফমি প্লাজা এর এক ধাপ এগিয়ে। অভিজাত এই মার্কেটটিতে পাশ্চাত্য ডিজাইনের পোশাকে ছেয়ে আছে বেশিরভাগ দোকান। নামি দামি ব্র্যান্ডগুলোর শোরুম ও দোকানগুলোতে নিত্য নতুন ডিজাইনের পোশাক।
বাংলায় নাম শেকড় হলেও আফমি’র একটি দোকানে দেখা গেলো, স্লিভলেস অসংখ্য পোশাক। পাশ্চাত্য ডিজাইনের পোশাকগুলোতে গলা থেকে ঝুলে আছে পাথর বা চেইনের ছোটখাট হার। কোনোটা একেবারে লম্বা, কোনোটা হাটু পর্যন্ত সিল্ক, জর্জেট বা সুতি কাপড়। এসব পোশাকই ভারত থেকে আনা হয়েছে বলে জানালেন দোকানের কর্মচারীরা।
শুধু শেকড় নয়। আফমি’র বেশিরভাগ দোকানেই দেখা গেলো এমন সব পোশাক। দেশীয় ব্র্যান্ড প্রাইড এর দোকানেও দেখা গেছে পাশ্চাত্য ঘরানার পোশাকের আধিক্য। কোটি সিস্টেম, স্কার্ট, লম্বা ঢোলা প্যান্ট বা বাহারি ডিজাইন। সবই আছে এখানে।
তবে ছেলেদের পোশাকের মধ্যে পাঞ্জাবী বেশি দেখা গেছে এ মার্কেটে। বিক্রেতাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এবার ঈদে ভারতীয় কাপড়ের পাঞ্জাবীই বেশি। ক্রেতাদের মাঝেও এধরনের পাঞ্জাবীর চাহিদা বেশি। পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের নিজস্ব কারখানায় তৈরি পাঞ্জাবীও আছে। যেগুলো বাংলাদেশের আবহাওয়া অনুযায়ী সুতি কাপড় দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। শেরওয়ানি, কাবলী ও সাধারণ পাঞ্জাবী এ তিন ধরনের মধ্যে হালকা কাজ করা সাধারণ পাঞ্জাবীই বেশি বিক্রি হচ্ছে। মান ও ডিজাইনভেদে আফমিতে পাঞ্জাবী বিক্রি হচ্ছে ১২’শ থেকে তিন হাজার টাকা দামে।
এদিকে ছেলেদের পোশাকেও আধুনিক ডিজাইন ও মান দেখে কিনছেন ক্রেতারা। আর্ট সি, এক্স আই, স্মার্ট পয়েন্ট, ক্যাটস আইসহ বিভিন্ন দোকানে মানভেদে শার্ট বিক্রি হচ্ছে ১,৭০০ থেকে ২,৫০০ টাকা, জিন্স প্যান্ট ১,৯০০ থেকে ২,৪০০ টাকা, গাবার্ডিং প্যান্ট ১,২০০ থেকে ২ হাজার টাকা, টি- শার্ট ৭০০ থেকে ১,৯০০ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে। ক্যাটস আই এর হিসাব ব্যবস্থাপক মোঃ আরমান জানান, ছেলেদের গাবার্ডিং প্যান্ট আর শার্ট এর চাহিদা বেশি। তবে আবহাওয়া গরম থাকায় টি- শার্টও কিনছেন ক্রেতারা।

আভিজাত্যের ছোয়া মিমি সুপার মার্কেটে
বরাবরের মতই অভিজাতদের ঈদ শপিংয়ের কেন্দ্রস্থল নগরীর মিমি সুপার মার্কেট। নতুন নতুন নামে গাউন, থ্রি পিস বিক্রি হয় বলে খ্যাত এই মার্কেটটি। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। টিভি সিরিয়াল ‘সুলতান সোলায়মান’ এর নারী চরিত্র হুররাম আর বাংলাদেশীদের কাছে জনপ্রিয় ভারতীয় চলচ্চিত্র বাহুবলী-২ বা লাসা নামে এবারও ক্রেতাদের জন্য নতুন পোশাক এসেছে।
মিমি সুপার মার্কেটের ইয়াং লেডি, আকর্ষণসহ নামি দামি দোকানগুলোতে এবারো ভারী থ্রি পিস ও গাউন দেখা গেছে। ভারী সিল্কের কাপড়, জর্জেটে ভারী ও ঘন সুতার এমব্রয়ডারি, পাথর বসানো কাজগুলো পোশাককে আরো ভারী ও কারুকার্যময় করে তুলেছে।
মার্কেটটিতে মেয়েদের গাউন বিক্রি হচ্ছে তিন থেকে আট হাজার টাকা, কোনো কোনো দোকানে ১৪ বা ১৮ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে। ভারতীয় লাসা ও হুররাম চার হাজার থেকে শুরু হয়ে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত আর থ্রি পিস বিক্রি হচ্ছে দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকার মধ্যে।