কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অকল্পনীয় সুযোগ নাকি অশনিসংকেত

ড. মুহাম্মদ ইব্রাহীম

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কী?
পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় ধরে যা গুটিগুটি নীরবে আসছিলো, সেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গত কয়েক বছরে যেন হুড়মুড় করে এসে আত্মপ্রকাশ করেছে। এসেই মানুষকে বল্ছে তোমাদের দুনিয়াকে, তোমাদের জীবনকে সম্পূর্ণ বদলে দেবো। মেশিন যখন মানুষের মত বুদ্ধিমত্তা দেখায় সেটিই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। কম্পিউটার-বিজ্ঞানের একটি অতি অগ্রসর অংশ হিসেবে এটি সম্ভব হয়েছে। এটি আসছে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজ বুদ্ধিতে চলা যে কোন যন্ত্র, নীতি নির্ধারণ করতে পারার মত উচ্চতর কম্পিউটার, মানুষের মত বা মানুষকে ছাড়িয়ে নানা কাজ করার মত রোবট ইত্যাদি নানা রূপে। মানুষের মতই সে নিজের লক্ষ্য নিজে ঠিক করতে পারে, সেই লক্ষ্যে সফল হবার জন্য অবস’া বুঝে যে কোন ব্যবস’া নিতে পারে, অভিজ্ঞতা থেকে ক্রমাগত শিখতে পারে। ইংরেজি-বাংলার মত আমাদের সাধারণ ভাষার ওপর নিজের দক্ষতা সে গড়ে নিতে পারে; মানুষের চেহারাসহ যে কোন জটিল ইমেজ চিনতে, বুঝতে ও বিশ্লেষণ করতে পারে। যত সূক্ষ্ম কাজ হোক, যত বুদ্ধির কাজ হোক, কিংবা পরিশ্রমের কাজ হোক,সব রকম কাজকে তার লক্ষ্যবস’ করা যাচ্ছে। সত্যিই এরা মানুষের মত চিন্তা করতে পারছে কিনা সে প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক নয়, যেটি প্রাসঙ্গিক তা হলো মানুষ যা করতে পারে তার সব কাজ এরা করতে পারছে কিনা।

বুদ্ধিমান মেশিন বাস্তবে কী করছে, কী করবে?

নানা ভাষার লেখাকে পড়ার, বোঝার, এক ভাষা থেকে আর এক ভাষায় অনুবাদ করার দক্ষতা এখন বুদ্ধিমান মেশিনের পাকাপোক্ত। মৌলিক রচনাও কিছু কিছু লিখছে, মিউজিক সৃষ্টি করছে; রিপোর্ট তৈরি ও উপস’াপনা করছে। জাপানে মানুষ-সাংবাদিকের বদলে শুধু বুদ্ধিমান মেশিন-নির্ভর সংবাদমাধ্যম কোম্পানি চালু হয়েছে ২০০৮ সালেই, অন্য যে কোন সংবাদ সংস’া থেকে আগে সংবাদ দিয়ে সম্প্রতি সবাইকে অবাক করে দিয়েছে। কিছু কিছু দোকানদারিতেও এটি পূর্ণ দায়িত্ব নিয়েছে পরীক্ষামূলকভাবে।এক্সরে’ ইত্যাদি মেডিক্যাল ইমেজ দেখে রোগের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়াসহ বহু স্বাস’্যসেবার ক্ষেত্রেও কথাটি প্রযোজ্য। বেশ কিছু বড় কোম্পানি ফাইন্যান্সসহ তাদের বিভিন্ন বিভাগের নিয়মিত কাজগুলো এখন বেশি বেশি করে বুদ্ধিমান মেশিনের হাতে ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে আছে। ওষুধ উদ্ভাবনের গবেষণায় একে প্রচুর ব্যবহার করা হচ্ছে, অন্য বৈজ্ঞানিক গবেষণায়ও হচ্ছে। একটি ব্যাপার অবশ্য বহুদিন ধরেই ব্যাপকভাবে ঘটেছে- তা হলো শিল্প কারখানার কাজ রোবট শ্রমিকের নিয়ে নেয়া। গত বছরের (২০১৭) দুটি ঘটনা হঠাৎ অপ্রত্যাশিতভাবে এসে কিছুটা নাটকীয়ভাবে বুদ্ধিমান মেশিনের ক্ষমতায় সবাইকে হকচকিয়ে দিয়েছে। এর একটি হলো চালকবিহীন গাড়ি সত্যি সত্যি উৎপাদিত হয়ে রমরমা শহরে যাত্রীসহ ঘুরে বেড়ানো। আরেকটি হলো দাবার চেয়ে অনেক জটিল ও কঠিন অনুরূপ একটি খেলা প্রাচীন চীনের ‘গো’ খেলায় সেরা মানুষ খেলোয়াড়কে পরাজিত করা।
সাম্প্রতিক জরিপে দেখতে পাচ্ছি যে মাত্র পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে ইতোমধ্যে চালু হয়ে যাওয়া অধিকাংশ কাজ মানুষের চেয়ে বুদ্ধিমান মেশিন ভাল করবে, এবং পঞ্চাশ বছরের মধ্যে আজকের গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব কাজ তারা নিয়ে নেবে। আরো সুনির্দিষ্টভাবে বল্লে ২০২৪ এর মধ্যে এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় অনুবাদের কাজ উচ্চাঙ্গের হবে; ২০২৬ সালের মধ্যে প্রাক্বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে যে রচনা লিখতে হয় সে পর্যায়ের মৌলিক রচনা নিখুঁতভাবে লিখবে। জাপানে ইতোমধ্যে বুদ্ধিমান মেশিনের রচিত ছোট উপন্যাস সাহিত্য পুরস্কারের জন্য প্রাথমিকভাবে বিবেচিত হতে পেরেছে। টেলিফোনে যাঁরা গ্রাহকসেবা দেন তাঁদের সব কাজের দায়িত্ব ২০২৪ এর মধ্যে মেশিন নিতে পারবে। বেশ কয়েকটি বড় খাতে আগামী দশ বছরের মধ্যে মেশিনের একচেটিয়াত্ব ভালোভাবে চালু হয়ে যাবে, যেমন ভোক্তা পর্যায়ে বিপণন।
মানুষ ব্যাপক হারে কাজ হারাবে

কারো কারো মতে বুদ্ধিমান মেশিনের কারণে এই নতুন শিল্প-বিপ্লব মানুষের অপছন্দের গতানুগতিক কাজের দীর্ঘ সময়কে কমিয়ে দিয়ে জীবনকে অনেক বেশি উপভোগ্য করবে। অধিকাংশ বোদ্ধা কিন’ এতে সায় দিতে পারছেন না। এর কারণ বুদ্ধিমান মেশিনের হাতে মানুষ ব্যাপকভাবে কাজ হারাবে, এবং ফলে অসম্ভব রকম অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয় দেখা দেবে। বুদ্ধিমান মেশিনের উন্নয়নের কাজ, উচ্চতম স্তরে সিদ্ধান্ত প্রণয়নকারীর কাজ এবং মাঠ পর্যায়ে মানুষের সঙ্গে আন্তরিক মেলামেশা সংক্রান্ত কিছু কাজ ছাড়া বাকি সব কাজ আগেপরে বুদ্ধিমান মেশিনের দখলে চলে যাবে, অনেকগুলো যাওয়া শুরুও হয়েছে। এর মধ্যে বেশি ঝুঁকিতে আছে যাবতীয় কারখানার কাজ এবং বাণিজ্যিক, পেশাগত এবং আমলাতান্ত্রিক কাজ। তথ্য বিশ্লেষণ যাঁদের কাজ তাঁরা সবাই উচ্চ ঝুঁকিতে- একাউন্টিং, আইনি কাজ, ব্যবসা কৌশল ও পরিচালনা, গবেষণা কিছুই বাদ যাবে না। সৃষ্টিশীল কাজগুলো অর্থাৎ সাহিত্য, সঙ্গীত, স’াপত্য, চারু ও কারুশিল্প ইত্যাদির ঝুঁকি ঠিক তার পরেই। অল্প কিছু অগ্রসর কোম্পানীর পক্ষে বুদ্ধিমান মেশিনের সহায়তায় দ্রুত বেড়ে উঠে বিশ্বময় একচেটিয়া ব্যবসা স’াপনে দেরি হবে না।
বোঝাই যাচ্ছে আমাদের দেশও বুদ্ধিমান মেশিনের বিরূপ প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারবেনা; আর সেটি বেশি দ্রুত হবে বিশ্ববাজারের সঙ্গে সংযুক্ত ক্ষেত্রগুলোতে। তৈরি পোশাক শিল্পের মত রপ্তানিমুখী শিল্পের ক্ষেত্রে বর্তমান অবস’া শুধু ততদিনই টিকে থাকবে যতদিন দ্রুত সুলভ হবার আগে পর্যন্ত ওরকম মেশিনের ভিত্তিতে উৎপাদন করার চেয়ে আমাদের সস্তা শ্রম উন্নত দেশের ক্রেতাদের জন্য অধিক লাভজনক থাকবে। এরপর ওরা নিজদেশে ভোক্তার কাছাকাছি স’ানে বুদ্ধিমান যন্ত্রের কাছে পণ্যগুলো তৈরির কাজটিকে নিয়ে যাবে। প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য পরিবর্তনটি কিছু কিছু ক্ষেত্রে আগে আসবে, আবার অন্যগুলোতে বেশি সময় নেবে, যেমন সেবা বা বাগানের কাজে।
দুনিয়ার মানুষের কী হবে?

আসলে ব্যাপক কাজ হারানোর ফলে ওই বিপর্যয় সারা দুনিয়াতেই ঘটবে। সে অবস’ায় মানুষের রুটিরুজির উপায় কী হবে, মানুষ তখন কী করবে, এ রকম প্রশ্নগুলো নিয়ে বিজ্ঞজনেরা খুবই চিন্তিত। অনেকে একে অশনিসংকেত মনে করছেন। আবার কেউ কেউ একে মানব জাতির উন্নয়নের পথে একে দারুণ ইতিবাচক একটি মোড় নেয়া মনে করছেন। বেকারত্বের বিপর্যয়ের মুখে সবাইকে অর্থনৈতিক ন্যূনতম সচ্ছলতা দেয়ার জন্য একটি উপায়ের কথা বিভিন্ন দিক থেকে নানা ভঙ্গিতে আসছে।
এটি হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে যে বিপুল ধন সৃষ্টি হবে তার ওপর যথাযথ ট্যাক্স আরোপ করে তা একটি ‘সার্বজনীন মৌলিক আয়’ হিসেবে সব মানুষের মধ্যে বন্টন করে দেয়া। কিন’ অন্যরা নিষ্কর্মা জীবনের বহুতরো মন্দ দিকের কারণে এর মধ্যে মানবতার জন্য সংকটই দেখতে পাচ্ছেন। রাষ্ট্রপালিত মানুষ তার সহজাত প্রেরণা ও উদ্যমের অভাবে অবক্ষয়ের দিকে চলে যেতে পারে।
অনেক আশাবাদীরা মনে করছেন পরিবর্তিত পরিসি’তিতে কাজ হারানো মানুষদের জন্য বহু বিকল্প কাজ সৃষ্টি হবে।এক ধরনের নতুন কাজের উৎপত্তি আমরা দেখতে পাচ্ছি যেখানে বুদ্ধিমান মেশিন যখন মানুষের মনের আসল কথা জানতে চাইবে বা মানুষের মনের ওপর প্রভাব রাখতে চাইবে, তখন ওই মানুষ ও মেশিনের মাঝখানে মধ্যস’তা করার কাজটি। এটি দেখে আমার মনে হচ্ছে ভবিষ্যতে হয়তো আরো ভালো একটি আমূল পরিবর্তনের সুযোগ আমাদের জীবনে করে দিতে পারে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। যেহেতু আমাদের যাবতীয় সম্পদের চাহিদা তখন বুদ্ধিমান মেশিনই মেটাবে, আমরা তখন শুধু মানবিক চাহিদা মেটাবার কাজেই মনোনিবেশ করতে পারবো। মানুষের মূল্য এখন মাপা হচ্ছে সম্পদ আহরণে তার ভূমিকা দিয়ে, তার ব্যবসায়িক ও কারিগরি ক্ষমতার নিরিখে; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে সেই প্রয়োজন মিটে যাবার পর আমরা হয়তো আশা করতে পারি যে মানুষের মূল্য মাপা হবে মানবিক গুণ ও মূল্যবোধের নিরিখে।
বুদ্ধিমান মেশিনের এনে দেয়া প্রাচুর্যের জগতে ওই মানবিক কাজের চাহিদা প্রচুর বাড়বে বৈ কমবে না। ধন-সম্পদ থাকলেই যে ওই মানবিক চাহিদার প্রয়োজনীয়তা মিটে যায়না, দুনিয়া থেকে সমস্যা চলে যায়না, সে তো আমরা এখনই দেখতে পাচ্ছি।উন্নত দেশে এবং ধনী পরিবারে মাদক সমস্যা, মনোবিপর্যয়ের সমস্যা, সন্তান পালনের সমস্যা, সোশ্যাল মিডিয়ার বিস্ফোরণ সত্ত্বেও মানুষের সঙ্গে মানুষের আত্মিক যোগাযোগের সমস্যা, সহিংসতার সমস্যা, বিষণ্নতার সমস্যা, নিঃসঙ্গ বার্ধক্যের সমস্যা, আন্তরিক ছোঁয়াসহ চিকিৎসা পাওয়ার সমস্যা, পরিবেশের সমস্যা এগুলো কি কিছুমাত্র কম রয়েছে? একমাত্র মানবিক ও মানসিক বোধোদয় কোন কোন ক্ষেত্রে একে সংযত রাখতে পারছে। আমরা সেই বোধোদয় সৃষ্টির কাজের কথা বলছি। এই একটি ধরনের কাজ মেশিন পারবে না, মনের যোগ ঘটিয়ে শুধু মানুষই পারবে। এসব হতে পারবে আগামী নতুন অর্থনীতির খুবই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান- সম্পদ তৈরির সন’ষ্টি নয় (সে কাজ তো মেশিন নিয়ে নেবে); বরং মানবিক অর্জনের সন্তষ্টি হবে যার লক্ষ্য- সেটি হবে আগামী দিনের অন্য রকম ‘সামাজিক ব্যবসা’। যেই প্রেরণাগুলো মানুষের সহজাত- সেই উদ্যোগ, প্রতিযোগিতা, আয় সবই এতে থাকবে, তবে সম্পূর্ণ ভিন্ন লক্ষ্যে।
মানব জাতির অস্তিত্বের সংকটও ঘটতে পারে

বেকারত্বের চেয়ে আরো ভয়ঙ্কর অশনিসংকেত দেখতে পাচ্ছেন অনেক চিন্তাবিদ- সেটি হলো বুদ্ধিমান মেশিনের উত্থানের ফলে ভবিষ্যতে মানব জাতির অস্তিত্ব বিলোপের আশঙ্কা। বুদ্ধিতে মানুষকে ছাড়িয়ে যাবার পর মেশিনের সঙ্গে মানুষের সংঘাত তৈরি হওয়া বা উভয়ের লক্ষ্যের মধ্যে বৈপরীত্য দেখা দেয়া অসম্ভব নয়। সে অবস’ায় মেশিনের হাতে মানব জাতির বিলুপ্তির আশঙ্কাটি খুবই স্বাভাবিক; বিশেষ করে আমাদেরকে টেক্কা দেয়া মারণাস্ত্র সৃষ্টির মাধ্যমে। সদ্য প্রয়াত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিঙের মত গুণী ভবিষ্যৎ-বিশ্লেষক এব্যাপারে কড়া সতর্কবাণী একাধিকবার দিয়েছেন।
দুনিয়ার অনেক চিন্তাবিদ সম্প্রতি এই একই সতর্কবাণী উচ্চারণ করে একটি খোলা চিঠি প্রকাশ করেছেন।
তাঁদের মধ্যে আছেন অগ্রণী প্রযুক্তি ব্যবসায়ী এলোন মাস্ক, ব্রিটিশ জ্যেতির্পদার্থবিদ মার্টিন রীজ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিজ্ঞানী অধ্যাপক নিক বোস্ট্রম, এম আই টি’র মহাবিশ্ব-বিজ্ঞানী ম্যাক্স ট্যাগমার্ক প্রমুখ। তাঁদের সবার কথা এই ভয়ঙ্কর সম্ভাবনাকে অবহেলা করার সুযোগ নেই; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গবেষণাকে সঠিক খাতে প্রবাহিত করার জন্য এখনই বিশ্ব-ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে নিয়ম-নীতি প্রতিষ্ঠিত করা জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন। ইতিহাস বলে প্রযুক্তির প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা কখনো পুরোপুরি সফল হয়নি। কিন’ এক্ষেত্রে চেষ্টা আমাদের করতেই হবে।