কৃত্রিম ফুলের দৌরাত্মে মুখ থুবড়ে কাঁচা ফুল

আজিজুল কদির

কিছুদিন আগে ছোট মেয়ের বিয়ে দিলেন দেব পাহাড়ের বাসিন্দা ব্যাংকার নাজেম উদ্দিন। একটা ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টকে বিয়ে ও গায়ে হলুদের সাজ সজ্বার পুরো দায়িত্ব দেন। তবে অনুষ্ঠানের দিন মঞ্চসহ অন্যান্য সাজানো দেখে তিনি অবাক ও হতাশ। তিনি বলেন, ‘মনে করেছিলাম কাঁচা ফুল দিয়েই পুরো অনুষ্ঠানটি সাজানো হবে। কারণ কাঁচা ফুলের আমেজটাই আলাদা। দুই পর্বের এই অনুষ্ঠান সাজানো হলো প্লাস্টিকের অর্থাৎ কৃত্রিম ফুল দিয়ে। তাদের কৈফিয়ত কাঁচা ফুলের সরবরাহ কম তাই প্লাস্টিকের ফুল দিয়ে করছি’।
সুপ্রভাতকে তিনি আরো বলেন, ইদানীং ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টগুলোকে প্রায়ই প্লাস্টিকের ফুল ব্যবহার করতে দেখা যায়। ফলে কাঁচা ফুলের ব্যবহার কমে যাচ্ছে, এটা সুখকর নয়।’
চেরাগী পাহাড় ফুলের দোকানগুলো ঘুরে দেখা গেল প্রায়ই প্রতিটি দোকানেই প্লাস্টিকের ফুল। দুই-তিন বছর আগেও এখানে কাঁচা ফুলের ব্যবসা ছিল রমরমা। এখন তাতে ধস নেমেছে। এখন চীন ও থাইল্যান্ড থেকে প্লাস্টিকের ফুলে বাজার ছেয়ে গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, আমাদের দেশের কিছু সুবিধাভোগী তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থে ইভেন্ট কোম্পানির রেজিস্ট্রেশন নিয়ে চট্টগ্রামের বড় বড় হোটেল, কমিউনিটি সেন্টার, ক্লাব, অডিটোরিয়ামে কাঁচা ফুলের নামে অর্ডার নিয়ে প্লাস্টিকের ফুল দিয়ে ডেকোরেশন করছে। তাতে প্রাকৃতিক পরিবেশে দেশের হাজার হাজার কৃষক যে ফুল উৎপাদন করছেন তা যথাযথ মূল্যে বিক্রি করতে পারছেন না। ফলে কৃষকের উৎপাদন খরচ উঠছে না। আর তাই ফুল চাষে তাদের অনীহা বেড়ে যাচ্ছে।
পটিয়ার পরিগ্রামের ফুল চাষী আসাদুজ্জামান রুবেল বলেন, ‘১০ বছর আগেও আমরা সারা বছর সব ধরনের ফুল উৎপাদন করতাম। বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় দিনে দিনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছি। লোকসানের কারণে অনেকে আবার ফুল চাষ বন্ধ করে দিয়ে অন্য ব্যবসায় মনোযোগী হচ্ছেন।’ পটিয়া, চকরিয়া, সাতকানিয়া, ফটিকছড়ির ফুলচাষীদের অবস’া প্রায়ই একই।
নগরীর কাঁচা ফুলের সবচেয়ে বড় বাজার চেরাগীর মোড়। এই এলাকায় অর্ধ শতাধিক দোকানে পাইকারি ও খুচরায় কাঁচা ফুল বেচা-কেনা হয়। প্রতিদিন সকালে চট্টগ্রামের আশপাশের এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন স’ান থেকে চাষি ও ব্যবসায়ীরা ফুল নিয়ে আসেন এই বাজারে। বিশেষ করে পটিয়া, সাতকানিয়া, চকরিয়া ও যশোরের ঝিকরগাছার ফুলের জন্য বিখ্যাত এই বাজার। এখানের কয়েকজন ফুল দোকানির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত দেড় দুই বছর ধরে হাতেগোনা কয়েকজন বেপারি দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এখানে কাঁচা ফুল নিয়ে আসেন ।
ফুল ব্যবসায়ী দোকান মালিক সমিতির সভাপতি নাছের গণির দাবি, একটি চক্র ব্যবসার নামে চীন ও থাইল্যান্ড থেকে প্লাস্টিকের ফুল আমদানি করে সম্ভাবনাময় ফুল চাষকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে গত কয়েক বছর ধরে। এই নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে কয়েক দফা স্বারকলিপিও প্রধান করে বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটি।
তাতে উল্লেখ করা হয়েছে- কোন ধরনের আমদানি নীতি ছাড়াই দেশে প্লাস্টিকের ফুলের আমদানি ও ব্যবহার বেড়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে কাঁচা ফুলের ব্যবসায় ধস নামবে ।
আবার পাইকারি বিক্রেতা ফ্লাওয়ার কীং এর স্বত্তাধিকারী শহিদুল ইসলাম জানান, বছরের কিছু সময় আছে যখন কৃষকের ফুল উৎপাদনে খরচ অনেক বেশি হয়। তাতে করে ফুল বেশি মূল্যে বিক্রি করতে হয়। যেমন গ্ল্যাডিউলাস, জারবেরা ফুল বর্ষা ও গরমকালে প্রতিটি ২০-২৫ টাকায় বিক্রি করতে না পারলে তারা দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ঠিক এই সময়ে দেশের ইভেন্ট কোম্পানিগুলো সুযোগ নিয়ে সম্ভাবনাময় ফুল খাতকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তারা গ্রাহকদের কাছ থেকে কাঁচা ফুলের নামে অর্ডার নিয়ে পরে প্লাস্টিকের ফুল দিয়ে ডেকোরেশনের কাজ শেষ করছে।
আরেক ফুল ব্যবসায়ী মফিজুর রহমান বলেন, প্লাস্টিকের ফুল একদিন ক্রয় করলে হয়ত মাসের পর মাস ব্যবহার করা যায়। কিন’ যারা এই প্লাস্টিকের ফুল আমদানি করে লাখ লাখ মানুষকে বেকার বানাতে চায়, দেশের বৃহত্তর স্বার্থের কথা মাথায় রেখে তাদের উচিত ফুল চাষীদের বাঁচিয়ে রাখতে এসব আমদানি বন্ধ রাখা। এখানে সরকারের একটা বড ভূমিকা রাখা খুবই প্রয়োজন।
কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপ-পরিচালক মো. আমিনুল হক চৌধুরী জানান, এই ফুল ব্যবহার করলে পরিবেশ নষ্ট হয়। প্লাস্টিক ফুল থেকে মানুষের দুরারোগ্য ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে। একটি ঘরের মধ্যে প্লাস্টিকের ফুল দীর্ঘদিন শোপিস হিসেবে ব্যবহার করলে ওই ঘরে কোনো দুরারোগ্য ব্যাধিসম্পন্ন মানুষ প্রবেশ করলে তার নিঃশ্বাসে ওই প্লাস্টিকের ফুলের মধ্য থেকে রোগ জায়গা করে নেয় এবং তা পরে অন্য মানুষের দেহে প্রবেশ করতে পারে। তাছাড়া প্লাস্টিকের ফুল পচে না, মাটিতে মিশে উর্বরতা শক্তি নষ্ট করে। খাল-বিল, ডোবা-নালা ভরাট হয়ে পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে। তাই এর ব্যবহারে সাবধান হয়ে বর্জন করা জরুরি।
অন্যদিকে কাঁচা ফুল থেকে বিকল্প পণ্য তৈরি সম্ভব। ফুলের অবশিষ্ট অংশ দিয়ে কম্পোস্ট সার তৈরি হচ্ছে। যে জমিতে ফুল চাষ করা হয়, ওই জমিতে পর্যায়ক্রমে অন্য ফসল করতে সার কম লাগে। জমির উর্বরা শক্তি বৃদ্ধি পায়। ফুলচাষ দেশের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে। পরিবেশের কোনো ক্ষতি হচ্ছে না। ফুলের পাতা গোখাদ্য হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। কাঁচা টাটকা ফুল ফুলদানির শোভাবর্ধনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মন ভালো করে। মনীষীরা খাদ্যের পর ফুলকে প্রাধান্য দিয়েছেন। বিশ্বে অনেক দেশ আছে, যারা ফুল থেকে কোটি কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে। ফুল থেকে তাদের জাতীয় আয়ের সিংহভাগ আসে। যেমন- নেদারল্যান্ডস, কেনিয়া; অথচ সেসব দেশে কিন’ প্লাস্টিকের কোনো ফুল বা পণ্য ব্যবহার করা হয় না।
আমাদের দেশে দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা অনেক পরিশ্রম করে ফুলের একটি সম্ভাবনাময় বাজার গড়ে তুলেছেন। গত কয়েক বছর ধরে প্লাস্টিক ফুলের আমদানি ও ব্যবহারে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন এই খাতটি। এক পরিসংখানে দেখা যায়, কৃষক ফুল উৎপাদন করে এর আগে যেভাবে লাভবান হয়েছেন এখন লাভ দূরে থাক, উৎপাদন খরচ তুলতেও হিমশিম খাচ্ছেন।
এ অবস’ার পরিবর্তন না হলে অচিরেই এই সেক্টরটি মুখ থুবড়ে পড়বে। এখন ফুল খাতটির অতীত সুনাম বজায় রাখতে এ ব্যাপারে সবার মনোযোগী হওয়া জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।