কুসুমবালা

মিলন বনিক

কুসুমপুরের কুসুমবালা
নাহ! গ্রামের নামকরণের সাথে কুসুমবালার নামের কোনো যোগসূত্র কখনোই ছিল না। কুসুমপুর গ্রামে কুসুমবালা যখন চৌদ্দ বছর বয়সে হরি ঘোষের বউ হয়ে এসেছিলো তখনও এই গ্রামের নাম কুসুমপুরই ছিল। দুধে আলতা গায়ের রং। ফর্সা, সুন্দর গোলগাল চেহারা। চোখ, নাক সব যেন স্বয়ং বিশ্বকর্মা নিজের হাতে গড়েছেন। একেবারে সাক্ষাৎ দেবী লক্ষ্মীর মতো। দেখতে ভারি মিষ্টি। কুসুমপুর গ্রামের সবাই একবাক্যে মেনে নিলো, এমন লক্ষ্মী প্রতিমার মতো বউ এ গ্রামে আর দ্বিতীয়টি নেই। দু’একজন অবশ্য এমন স্বীকৃতি সহজে মেনে নিতে পারেনি। যাদের রূপ যৌবন, সৌন্দর্য আর দেহের গড়ন কুসুমবালার মতো না হলেও প্রায়ই কাছাকাছি তাদের পক্ষে এমন স্তুতিবাক্য মেনে নেওয়া অসম্ভব। কস্মিনকালেও ঐ গৃহবধূরা কিছুতেই মানবেন না যে, কুসুমবালা তাদের চেয়ে বেশি সুন্দরী।
এখনও কাঁচা বয়েস। উঠতি যৌবনে অমন টানটান রূপ সবারই থাকে। তাই বলে কালকের পুঁচকে ছুড়ি, তার সাথে আপোষ চলবে কেন? যতবারই কুসুমবালা সম্পর্কে এমন কথা কারও মুখে শুনেছে ততবারই মুখ বাঁকিয়ে বলেছে সুখির মা, ‘ও রকম রূপের নিকুচি করি। অমন রূপের দেমাগ আমারও ছিল একসময়। কালে কালে আর কতো? এখনও বা কম কী সে? যাক না দু’চার মাস হরির সংসারে। তারপর দেখা যাবে। অমন সাধের রূপ-যৈবন রোদে পুড়ে তামাটে হয়ে যাবে। তখন ভেসে উঠবে আসল রূপ।’
সেই কুসুমবালা জীবনের শেষ হিসাবটি কষতে বসেছে। উঠোনভর্তি মানুষ। গ্রামের সবাই একে এক উপস্থিত হচ্ছে। আজ জীবিত কুসুমবালার পারলৌকিক ক্রিয়া হবে। নিমন্ত্রণ করে আনা হয়েছে আত্মীয়-স্বজনদের। ভূরিভোজ হবে। তাও কুসুমবালা নিজে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছেলে বুড়ো, আত্মীয়-স্বজন সবাইকে দুপুরে শাকান্ন ভোজনের নিমন্ত্রণ করে এসেছে। আশে-পাশের গ্রাম থেকে উৎসুক অনেকে এসেছে কৌতূহলী হয়ে। সবার একই কথা, ‘মানুষ বেঁচে থাকতে তার পারলৌকিক ক্রিয়া হবে ক্যামনে? ক্রিয়া তো মানুষের মৃত্যুর পরে হয়।’ তবে কি কুসুমবালার কেউ নেই বলে পণ্ডিতজনরা এই বিধি দিয়েছেন? এমন প্রশ্ন কুসুমপুর গ্রামের প্রতিটি মানুষের মুখে মুখে।
উঠোনে লাল কাপড়ের সামিয়ানা টাঙানো হয়েছে। একপাশে রাম ঢুলির দল ঢোল, কাঁসর, জুরি নিয়ে বসেছে। ব্রাহ্মণ পণ্ডিত সবাই উপস্থিত। মৈনাক থেকে সবচেয়ে বড় শাস্ত্র বিশারদ, বিদগ্ধ পণ্ডিত, কাব্যতীর্থ চুনিলাল ভট্টাচার্য্য মহাশয়কে বাড়তি ফি দিয়ে আগাম বায়না করে রেখেছিল কুসুমবালা নিজে। মৃত মানুষের ক্রিয়া-কর্ম পণ্ডিতমশায় ভালোই করেন। বিধির বিধানের কোন ত্রুটি করেন না। তাই জীবিত কুসুমবালার কাজটাও তিনি ভালোভাবে করবেন বলে কুসুমবালাকে কথা দিয়েছেন। তিনিও সকাল সকাল এসে পড়েছেন। এসেই কুসুমবালার কেনা সুদৃশ্য পদ্মাসনে ধ্যানমগ্ন হয়ে বসে আছেন। খালি গায়ে বিশাল ভূড়ির উপর নয়গুণের পৈতাটায় বার বার হাত বুলাচ্ছেন।
কুসুমবালার ইচ্ছা মৃত্যুর পরে ধর্মীয় বিধি মোতাবেক তার পারলৈাকিক ক্রিয়া কর্মের জন্য যা যা করা দরকার তা তার জীবদ্দশায় মৃত্যুর আগে নিজের হাতে করে যাবেন। তাতে করে জীবনের শুরুতে কুসুমবালার রূপ যৌবন নিয়ে সমাজে যেমন একটা বিতর্কের শুরু হয়েছিলো, তেমনি জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও আর একটা নতুন বিতর্কের ঝড় উঠলো। সামাজিক অবস্থানভেদে এখন যারা কুসুমবালার এমন সিদ্ধান্তে মাথা ঘামাচ্ছেন তারাও প্রায় কুসুমবালার সমবয়সী। যৌবনে হিংসা করেছিল বলে তাদের মনে হচ্ছে, এখনও যেন একা কুসুমবালার ইচ্ছাগুলোই সমাজে দাপটের সাথে প্রতিফলিত হচ্ছে।
বয়স বেড়েছে কুসুমবালার। গায়ের সেই কাঁচা হলুদের রঙটা এখনও ঠিক আগের মতোই আছে। একটুও তামাটে হয়নি। শরীরের বলিরেখাগুলো এক এক করে ভেসে উঠেছে। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। ঢেউ খেলানো লম্বা চুলগুলো এখন সাদা ফ্যাসফ্যাসে হয়ে আছে। দু’টো চোয়াল ঢুকে গেছে গালের ভিতর।
পণ্ডিতের সামনে কুশাসনে বসে আছে কুসুমবালা। অপূর্ব সুন্দর এক জ্যোতির্ময় দ্যুতি শরীর থেকে ঠিকরে বের হচ্ছে। গলায় সাদা বেলী ফুলের মালা। কপালে লম্বা চন্দন তিলক। পরনে ধবধবে দুধসাদা নতুন শাড়ি। সামিয়ানার ফাঁক গলে একটুকরো হেমন্তের সোনারোদ এসে পড়েছে কুসুমবালার ভেঙে পড়া শরীরে। গলায় জড়িয়ে আছে গৌরবর্ণের কৃষ্ণ রামাবলি। এই উজ্জ্বল বর্ণের অনিন্দ্য সুন্দর চেহারাটা সূর্যের দিকে চেয়ে যেন মুখ টিপে হাসছে।
এতবড় আয়োজনে বাইরের দিকটা সারাক্ষণ দেখভালো করছে পাঁচির মা। তড়িঘড়ি করে অভ্যাগতদের পান-তামাক দিতে গিয়ে চোখ পড়ল কুসুমবালার উপর। পাঁচির মা কী বুঝলো কে জানে? অপলক তাকিয়েছিল কিছু সময়। চোখ ফেরাতে পারছে না। যেন নতুন এক কুসুমবালার অবয়বের মধ্য দিয়ে দেবী দর্শন করছে। তারপর হাত জোড় করে প্রণাম করে দু’হাত মাথায় ঠেকিয়ে বলল, ‘পোড়ামুখীরে মনে হইতেছে যেন সাক্ষাৎ দেবী দুর্গা। হায় ভগবান, যার তিন কুলে কেউ নাই, তার ভগবান আছে। জিয়ৎকর্ম করতে গিয়া মনে হচ্ছে দেবীর বোধন হচ্ছে। আমাদের কপালে কী আছে তা তিঁনিই জানেন।’
এ পৃথিবীতে কষ্ট ছাড়া মানুষ হয় না। পাঁচির মারও কষ্ট। তিন তিনটে ছেলে। দুই মেয়ে। মেয়েদের বিয়ে হয়েছে। নিজের স্বামী নেই। তিন ছেলের সংসারে মায়ের ঠাঁই হয় না। খাওয়া পরার কষ্ট। জীবনে বেঁচে থাকার কষ্ট। তিনকুলে সবাই আছে। তবুও পাঁচির মার কষ্ট কমে না। দু’বেলা দু’মুঠো খাওয়ার জন্য এই বয়সে পরের বাড়ি কাজ করতে হয়। তবে পাঁচির মার কাছে ভরসার একমাত্র আশ্রয়স্থল হচ্ছে কুসুমবালা। বেশিরভাগ সময় কুসুমবালার কাছেই থেকে যায়। খাওয়া পরার আর ঝামেলা থাকে না। কুসুমবালার একটু ফাইফরমায়েস করে দেয়। একা মানুষ। একা থাকতে গেলে মৃত্যভয়টা তাড়া করে বেশি। কথা বলার জন্যে হলেও তো একজন লোক লাগে। তাই পাঁচির মার কদরও কুসুমবালার কাছে কম নয়।
কুসুমবালার তিনকুলে কেউ নেই। বিশিষ করে শ্বশুরকুলে। মেয়েদেরতো কখনও নিজের বাড়ি হয় না। বাপের বাড়ি ছেড়ে এসে শ্বশুর বাড়ি। তারপর ভাগ্যক্রমে ছেলের বাড়ি নয়তো মেয়ের বাড়ি। কুসুমবালার বাপের বাড়িতে সবাই আছে। ভাই বোন, তাদের ছেলে মেয়ে সবাই। নাই কেবল শ্বশুরকুলে।
সেই চৌদ্দবছর বয়সে এক বাপের এক ছেলে দেখে হরি ঘোষের সাথে বিয়ে দিয়েছিল। ছেলের আয়রোজগারও ভালো। কোনো পারিবারিক ঝামেলা নেই। স্বামী-স্ত্রী মিলে সুখেই থাকবে কুসুম। হ্যাঁ, সুখেই তো ছিল কুসুম। গঞ্জে হরির ছোটখাটো স্যাঁকরার দোকান। সন্ধ্যার পর যখন হরি বাড়ি ফিরতো সেই পুকুর পাড় থেকে ডাক দিতো কুসুমকে। কুসুম সেই ডাক শোনার জন্য সন্ধ্যার পর থেকে অপেক্ষায় থাকতো। হরি ডেকে বলতো, ‘ও কুসুম, একবার বাজারের থলেটা নিয়ে যাও’। কুসুম কেরোসিন তেলের কুপিবাতিটা হাতে নিয়ে মাথায় ঘোমটা টেনে গুটি গুটি পায়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে পুকুরঘাটে চলে আসতো।
বাজারের থলেটা হাতে দিয়ে বলতো, ‘আজ ইলিশ মাছটা ভালো পেয়েছি। শর্ষে বাটা দিয়ে রান্না করো’। কোনো সময় ছোট মাছ আনলে বলতো, ‘তোমার খুব কষ্ট হবে কুসুম। রাত তো কম হলো না, এত রাতে ছোট মাছ কুটে রান্না করতে তোমার কষ্ট হবে’। কুসুমবালা হাসতো।
একেতো ছোট মাছ। শীতের রাত। শীতের সময় সাগরের পাঁচমিশালি মাছগুলো বেশি পাওয়া যায়। হরিরও খুব পছন্দ ছোট মাছগুলো। যত কষ্টই হোক কখনও কুসুমবালা অমত করতো না। বরং ভালোই লাগতো। এই সময়টাই কুসুমবালা হরিকে অন্যভাবে অনুভব করতো। কাছাকাছি বসে থাকতো হরি। এক আধটু সাহায্য করতো কুসুমকে। কোনোসময় কুপিতে তেল ফুরিয়ে গেলে নিভে আসতো। হরি কাঁচের বোতল থেকে কেরোসিন তেল ভরে দিতো কুপিতে। ছোট চিংড়ি আর লইট্ট্যা মাছগুলো আলাদা করে দিতো। কুসুম মাছ কুটতো আর অপলক তাকিয়ে থাকতো হরি। এমন চাঁদের মতো রূপ দেখে হরি বলতো,
‘তোমাকে আমার এই কুঁড়েঘরে ঠিক মানায় না।’
‘কেন? আমি বুঝি মানুষ না?’
‘ আমি জানি কুসুম, তুমি মানুষ। কিন্তু আমার মাঝে মধ্যে মনে হয় ভগবান তোমাকে ভুল করে এই পৃথিবীতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তাও আবার আমার মতো এই গরিবের ঘরে। ভগবানের লীলা বোঝা ভার।’
কুসুমবালা হাসতো। হরির এই অগোছালো কথা শুনে কুসুম ভাবতো, লোকটা কত সহজ সরল। কথার ফাঁকে ফাঁকে এটা সেটা নিয়ে কথা হতো। দোকানের ব্যবসা বাণিজ্য নিয়ে কথা হতো।
বিয়ের কয়েকবছর পরও যখন কুসুম মা হতে পারলো না, তখন একটা দুশ্চিন্তা দু’জনকেই খুঁড়ে খুঁড়ে খাচ্ছিল। দুজনেই সমান অপরাধী। কেউ কাউকে দোষ দিতে পারছে না। দুজন দুজনকে ভালোবাসে। কার দোষে এমনটি হচ্ছে কোন কূলকিনারা পাচ্ছেনা। পাড়ায়ও কথাটা রটতে সময় লাগেনি। শুভাকাঙ্ক্ষীদের অনেকে ফকির বৈদ্যের কাছে যাওয়ার কথা বললেও হরির ওসবে মোটেও বিশ্বাস নেই। হরির এক কথা, ‘হলে ভগবানের ইচ্ছায় হবে। ভণ্ড ফকির, বৈদ্য দিয়ে কী সন্তান লাভ হবে?’
সুখির মা’তো আরও এক ধাপ আগ বাড়িয়ে বলে, ‘বলি কী আর সাধে? অমন ভাঁজা নারীর যৈবন টানটান থাকলে কী হবে, একটা বাইচ্চা বিয়ানোর ক্ষেমতা নাই। ক্ষেমতা থাকলে একটা বিয়াই দেখুক। তখন দেখবো রূপ যৈবন কই যায়।’
হরি মাদুর পেতে বসে কুপির আলোয় দুটো ধনে পাতা বেছে দিতে দিতে বলে, ‘ভগবান আমাদের সে সুখ দিলো না। মরার পর যে কেউ এসে মুখাগ্নি করবে, তাও কপালে জুটবে না।’
দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে কুসুমবালা। বটিতে আঙুলের মাথায় যেন আঁচড় লাগে। কুসুমবালা খেয়াল করেনি। পরে আঙুল বেয়ে রক্ত পড়তে দেখে হরির খেয়াল হলো। তাড়াতাড়ি হাতটা তুলে নিয়ে হরি পরিষ্কার কাপড় দিয়ে বেঁধে দেয়। কুসুম নির্বিকার। মাথা নিচু করে বললো,
‘একবার ডাক্তারের কাছে গেলে কেমন হয়?’
‘এখন আর ডাক্তারের কাছে গিয়ে কী হবে?’
‘না হোক। তবুও তো ডাক্তার কিছু একটা বলবে।’
‘কী আর বলবে? এখন কি সেই চিকিৎসা আছে?’
‘থাকতেও তো পারে।’
‘জন্ম মৃত্য সব ভগবানের হাতে। মানুষের কী সাধ্য?’
‘তা তো জানি। মানুষের মাধ্যমেই তো ভগবান তাঁর কাজ করেন। মানুষ কী তা বুঝতে পারে?’
মাছ কুটা শেষ হয়। হরি কুসুমবালার পিছু পিছু কুপি নিয়ে পুকুর ঘাটে আলো দেখায়। কুসুমবালা মাছ ধোয়। মাছের ঝাঁকার ঝাঁকুনিতে ছলাৎ ছলাৎ করে জলের ঢেউ তুলে। সেই ঢেউ হরির মনেও সুর তোলে। পুকুরঘাটে কামিনী ফুলের গাছ। তাতে লাখো জোনাকির ঝিলিমিলি। সাদা সাদা কামিনী ফুলের পাঁপড়িগুলো ঝরে পড়ছে পানিতে। ফুলের গন্ধে সারা বাড়ি মৌ মৌ করে। বাড়ির পাশে কোথায় যেন হাসনাহেনা ফুটে আছে। অন্ধকারে ঘরের জানালা খোলা রেখে কুসুম সেই ফুলের গন্ধ নেয়। এত কিছু উপভোগ করার মন থাকলেও ঐ একটা দুশ্চিন্তা দুজনের মনকে আরও বেশি সংকুচিত করে রাখে। একসময় কথা দিয়ে নীরবতা ভাঙে হরি। বিড়িটা কুপির আগুনে জ্বালিয়ে লম্বা টান দিয়ে বলে,
‘আচ্ছা আমি যদি তোমার আগে মরে যাই্ত্ত্ত।’
কথা শেষ করতে দেয় না কুসুম। মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে বলে,
‘তা কেন হবে? আমি তোমার আগে মরবো। তুমি আমার মুখে আগুন দেবে। আমার ক্রিয়া-কর্ম তো তোমাকেই করতে হবে।’
‘তুমি বড় স্বার্থপরের মতো কথা বললে কুসুম।’
‘ওমা! স্বার্থপরের মতো হবে কেন। প্রত্যেক স্ত্রী-ই চায়, শাঁখা সিঁদুর নিয়ে স্বামীর পায়ে মাথা রেখে মরতে। আমিও ভগবানের কাছে তাই চাই।’
‘কিন্তু ভগবান রাজি হলে তো? বলা তো যায় না, যদি উল্টোটা হয়?’
‘ওভাবে বলো না। তুমি চলে গেলে আমি বেঁচে থেকে কী করবো?’
‘কিন্তু আমি ভাবছি, তোমার পরে আমি গেলে আমার মুখে আগুন দেবে কে?’
সেই একই প্রসঙ্গ। কষ্টের বোবা কান্না কিছুক্ষণের জন্য দুজনকেই বধির বানিয়ে রাখে। কেউ কোন কথা বলতে পারে না। কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছে না। একটাই সমাধান, একটা সন্তান থাকলে আজ এতো প্রশ্নের জন্ম হতো না। কুসুমবালাও ওভাবে ভেবে দেখেনি। সাধারণ এয়োস্থি ঘরের মেয়েরা যা চায়, স্বামীর পায়ে মাথা রেখে মরতে। কুসুমও তাই চেয়েছিলো। কিন্তু কুসুম চলে গেলে হরির মুখে আগুন দেবে কে? কে তার পারলৌকিক শ্রাদ্ধ-শান্তির কাজগুলো করবে? ছোট বেলায় মা বাবা মারা যাওয়ার পর হরিটা ভীষণ একা হয়ে পড়েছিল। একসময় কুসুমবালা এলো। হরির জীবনটা আবার পূর্ণতা পেলো। হরিও এখন আর একা হতে চায় না। কুসুমের মাথায়ও ব্যাপারটা এভাবে ভাবাচ্ছে। সত্যিইতো কুসুম চলে গেলে মানুষটার কী হবে? কীভাবে চলবে তার দিনগুলো? কেই বা রান্না-বান্না করে দেবে? তার চেয়ে বরং কুসুম বেঁচে থাকলে স্বামীর সেবাটা করতে পারবে। তার অবর্তমানে স্বামীর কষ্ট হোক, তা কুসুম কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না।
এই যখন অবস্থা, দুজনেই যখন যাওয়া না যাওয়ার দোলাচলে দুলছিলো, তখন কুসুমবালার এক দূরসম্পর্কের ভাইপোকে এনে দুধের সাধ ঘোলে মেটানোর চেষ্টা করলো দুজনেই। ভাইপোটির নাম ভবতোষ। সাত আট বছর হবে বয়স। না খেতে পাওয়া হাড় জিরজিরে শরীর। বেঁটেখাটো শরীরে শুধু ফুলে থাকা পেটটাই আছে। মা বাবার আদরে সেই ভবতোষ বড় হচ্ছে। শৈশব কৈশোর ও যৌবনের কোনো চাওয়া পাওয়াই যেন বাকি রাখেনি। বড় হতে হতে ভবতোষ নিজের স্বার্থটাও বুঝতে শিখলো। তারপরও সন্তানহীন বাবা মা একটা শেষ সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারলো যে, জন্ম মৃত্যু ভগবানের হাতে। যেই আগে আর পরে যাক না কেন, অন্তত মুখে আগুন দেওয়ার জন্য ভবতোষ তো আছে। মৃত্যুর পর পারলৌকিক শ্রাদ্ধ-শান্তির কাজগুলো করবে ভবতোষ। এখন দুজনের একমাত্র ভরসা ভবতোষ।
বিয়ের দশ বছরের মাথায়ও কোন ছেলেপুলে হলো না। এদিকে ভবতোষ এলো পালক পুত্র হয়ে। কুসুমপুর গ্রামটা আবার সরগরম হয়ে ওঠলো। বিশেষ করে মহিলা মহলের মৃদু গুঞ্জন হরি ঘোষের কান পর্যন্ত পৌঁছতে বেশি সময় লাগেনি।
প্রতিবেশি রামুর মা তো গলা খাঁকারি দিয়ে বলেই ফেললো,
‘ঐ ভাঁজা মায়া মাইনষের এত রূপ-যৈবন দিয়া কী হবে? দশ বছর হইলো, একটা ছেলেপুলে বিয়ানোর ক্ষেমতা নাই। যে গরু দুধ দেয় না সেই গরুর সোন্দর ধুইয়ে পানি খায় কোনো লাভ আছে? হুঁ, মাগীর দেমাগ কতো? কালে কালে কত দেখলাম, আরো কত কী দেখবো।’
সত্যি বলতে কী? এতসব কথা সহ্য করার ক্ষমতাও আছে কুসুমবালার। তা না হলে সবার ছেলেপুলে হয়, কুসুমবালার হয় না কেন? সেই রাতে কুসুমবালা হরির বুকে মাথা রেখে বলেছিলো,
‘তুমি আর একটা বিয়া করো।’
হরি মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
‘তাইতো, একটা ছেলেপুলের জন্য হলেও বিয়ের কথাটা ভাবতে হবে।’
কুসুমবালার মনে আগুনের ছ্যাঁকা লাগলো। তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিলো। প্রতিউত্তরে কিছুই বলতে পারছিলো না। হরি কি তাহলে দ্বিতীয় বিয়ে করবে? কুসুমবালার কী হবে? সতীনের ঘরে কুসুমবালা নিজেকে কীভাবে মানিয়ে নেবে? মুহূর্তের মধ্যে এতসব ভেবেও কোনো কূলকিনারা করতে পারছিল না।
হরি ঘোষ কী বুঝলো কে জানে? সেই রাতে হঠাৎ বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লো। দোকানে যাওয়ার সবুজ ফতোয়াটা কাঁধে ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়লো। কুসুমবালা তড়িঘড়ি বিছানা ছেড়ে ওঠে জিজ্ঞাসা করলো,
‘কোথায় যাচ্ছো এত রাতে?’ হরির স্পষ্ট জবাব, দেখি একটা বউ পাওয়া যায় কী না। আর কোনো কথা বলেনি। হন হন ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। সে রাতে আর ঘরেও ফিরেনি। না ফেরার মধ্যেই কেটে গেলো সাতদিন। লোকটা এত রাতে কোথায় গেলো কেউ জানে না।
খোঁজাখুঁজি শুরু হলো। সারা গ্রাম রটে গেলো বউয়ের যন্ত্রণায় হরি ঘর ছেড়ে পালিয়েছে। সবাই দোষ খুঁজলো কুসুমবালার। স্বামীখেকো বলে অপবাদ দিল কেও কেও। পাঁচির মা শুধু মনে সাহস দিয়ে বলেছিলো,
‘ভগবানে বিশ্বাস রাখ বইন। সে যদি সত্যিকার অর্থে তোমার হয়ে থাকে তাহলে একদিন না একদিন ফিরে আসবেই। তোমার হরি তোমার বুকে ফিরে আসবে।’ এই ক’দিন যে কুসুমবালার কীভাবে কেটেছে তা একমাত্র ভগবানই জানেন। হরি নতুন বৌ নিয়ে ফিরে আসবে কী না, সেই সংশয়ও মনে দানা বাঁধছে। অবশেষে নয় দিনের দিন উস্কোখুস্কো অবিন্যস্ত চুল দাড়ি, সেই ময়লা ফতুয়া নিয়ে হরি ফিরে এলো। পাড়ার লোকজন নানান কথা জিজ্ঞাসা করছে। ‘কোথায় গিয়েছিলে’? হরি অল্প কথায় দায় সাড়া জবাব দেয়, ‘কাজে গিয়েছিলাম’।
কুসুম রাতে হরির মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। অবোধ কিশোরীর মতো ফুঁপিয়ে কাঁদছে কুসুম। অবোধ ছেলের মতো কুসুমের কোলে মাথা রেখে চোখ বুজে আছে হরি। কুসুম অপরাধীর মতো জিজ্ঞাসা করলো,
‘এমন করে চলে গেলে কেন? আমি তোমাকে খুব কষ্ট দিয়েছি, তাই না?’
‘তাইতো। তুমি আমাকে বিয়ে করতে বললে কেন?’
‘আমি তো একটা ছেলে-পুলের জন্য বলেছিলাম। তুমি এতটা কষ্ট পাবে ভাবিনি।’ ‘আর কখনো এভাবে বলবে না। তাহলে একবারে হারিয়ে যাবো। আর আসবো না। কী হবে? সবার তো ছেলেপুলে থাকে না। যেভাবে হোক আমাদের চলে যাবে।’
‘কিন্তু লোকে যে নানান কথা বলে।’
‘বলুক। আমি কি লোকের খাই না পরি। একবেলা না খেয়ে থাকলে এই সমাজ কখনো খাওয়াতে আসবে না। যারা এসব বলে তারা কখনো আমাদের ভালো চায় না।’ সে রাতটা ছিল পূর্ণিমার রাত। মাটির ঘরের বারান্দায় বসে দুজনে গল্প করতে করতে সারাটা রাত কাটিয়ে দিলো। কুসুমবালার মনে হয়েছে, পৃথিবীতে তার চাইতে সুখী কোন মানুষ নেই। স্বামীর ভালোবাসায় পরিপূর্ণ এক নারী।
বহমান সময়ে একজন নারী স্বামীর আদর, সোহাগ, ভালোবাসা সব জয় করার যে আনন্দ তা আর কিছুতে নেই। একজন নিম্নবিত্ত পরিবারের ক্লাস থ্রি পাশ করা মেয়ে এর চেয়ে বেশি আর কিছু আশা করতে পারে না। স্বামীর সুখই সর্বসুখ। কুসুমবালার জীবনে এর চেয়ে বেশি কিছুই আর চাওয়ার নেই। চলবে

আপনার মন্তব্য লিখুন